Homeপদার্থ বিজ্ঞানহীরার চেয়েও শক্ত হীরা

হীরার চেয়েও শক্ত হীরা

“হীরা” বা ডায়মন্ড—শব্দটা শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্ত, মূল্যবান আর ঝলমলে এক পাথরের ছবি। গয়না হিসেবে এর কদরের কথা তো সবাই জানে, কিন্তু শিল্পের জগতেও এর প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কাঠিন্যের দিক থেকে প্রাকৃতিক হীরার ধারেকাছে কেউ নেই, এটাই ছিল এতদিনকার জানা কথা। কিন্তু বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের তো কোনো শেষ নেই! তারা অনেক দিন ধরেই ভাবছিলেন, প্রাকৃতিক হীরার চেয়েও শক্ত কিছু কি গবেষণাগারে তৈরি করা সম্ভব?

বিরল ষড়ভুজাকার হীরার উদ্ভাবন

অবশেষে পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সেই অসাধ্য সাধন করেছেন চীনের একদল বিজ্ঞানী। তারা ল্যাবরেটরিতে তৈরি করেছেন এক অত্যন্ত বিরল ‘ষড়ভুজাকার হীরা’ (Hexagonal Diamond), যা খনি থেকে পাওয়া প্রাকৃতিক হীরার চেয়েও অনেক বেশি শক্ত!

ষড়ভুজাকার হীরা আসলে কী?

খনি থেকে আমরা যে সাধারণ হীরা পাই, তার ভেতরে কার্বন পরমাণুগুলো ‘কিউবিক’ বা ঘনক আকৃতিতে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে সাজানো থাকে। এই বিশেষ জ্যামিতিক গঠনের কারণেই হীরা এত শক্ত হয়।

লন্সডেলাইট বা হেক্সাগোনাল ডাইমন্ড

কিন্তু বিজ্ঞানীরা হিসাব কষে দেখেছিলেন, কার্বন পরমাণুগুলোকে যদি ঘনকের বদলে ‘হেক্সাগোনাল’ বা ষড়ভুজ (ছয় কোণবিশিষ্ট) আকারে সাজানো যায়, তবে তা সাধারণ হীরার চেয়েও অনেক বেশি শক্ত হবে। প্রকৃতিতে এই ষড়ভুজাকার হীরা খুবই বিরল। বিজ্ঞানীদের কাছে এর আরেক নাম ‘লন্সডেলাইট’ (Lonsdaleite)। সাধারণত মহাকাশ থেকে ছুটে আসা বিশাল গ্রাফাইট-সমৃদ্ধ উল্কাপিণ্ড যখন প্রচণ্ড গতিতে পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে, তখন সেই অকল্পনীয় তাপ ও চাপে খুব সামান্য পরিমাণে এই ধরনের হীরা তৈরি হয়।

ল্যাবরেটরিতে তৈরির চরম সংগ্রাম

মহাকাশের এই বিরল বস্তুকে পৃথিবীর ল্যাবরেটরিতে তৈরি করাটা মোটেও সহজ কাজ ছিল না। বিজ্ঞানীরা জানতেন তত্ত্বগতভাবে এটি সম্ভব, কিন্তু বাস্তবে রূপ দিতে গিয়ে বারবার হোঁচট খাচ্ছিলেন তারা। ল্যাবরেটরিতে এটি তৈরি করা গেলেও তা এতই ক্ষুদ্র বা ক্ষণস্থায়ী হতো যে, এর কাঠিন্য মাপা কিছুতেই সম্ভব হচ্ছিল না।

শক কমপ্রেশন ও সুপার-ডায়মন্ডের জন্ম

অবশেষে সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটালেন চীনের বিজ্ঞানীরা। তারা গবেষণাগারে অত্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে এমন এক চরম তাপ ও চাপের পরিবেশ তৈরি করলেন, যা ঠিক একটি উল্কাপাতের সময়কার ধ্বংসাত্মক অবস্থার মতো। এই কাজে তারা ব্যবহার করেছেন প্রচণ্ড শক্তিশালী গ্যাস-গান বা বিশেষ ধরনের কামান। এই কামানের সাহায্যে কার্বনের তৈরি একটি ছোট চাকতির ওপর প্রচণ্ড বেগে একটি প্রজেক্টাইল বা গোলা নিক্ষেপ করা হয়। এর ফলে সেখানে তৈরি হয় অকল্পনীয় তাপ ও চাপ (Shock compression)। এই প্রচণ্ড ধাক্কায় মুহূর্তের জন্য কার্বনের পরমাণুগুলো নিজেদের গঠন পরিবর্তন করে ষড়ভুজাকার কাঠামোতে রূপ নেয়। জন্ম নেয় কাঙ্ক্ষিত সেই সুপার-ডায়মন্ড বা অতি-শক্তশালী হীরা!

কীভাবে মাপা হলো এর কাঠিন্য?

এখানেই রয়েছে সবচেয়ে বড় চমক। ল্যাবরেটরিতে তৈরি এই ষড়ভুজাকার হীরা টিকে ছিল মাত্র কয়েক ন্যানোসেকেন্ড (অর্থাৎ, এক সেকেন্ডের ১০০ কোটি ভাগের এক ভাগ সময়)! এরপরই প্রচণ্ড চাপে তা ধ্বংস হয়ে যায়. এত অল্প সময়ের ভেতর সাধারণ কোনো উপায়ে এর কাঠিন্য মাপা তো দূরের কথা, এটি দেখাই সম্ভব নয়। তাহলে বিজ্ঞানীরা বুঝলেন কীভাবে যে এটি হীরার চেয়েও শক্ত? উত্তর হলো—শব্দ তরঙ্গের সাহায্যে।

লেজার রশ্মি ও ন্যানোসেকেন্ডের গবেষণা

আমরা জানি, কোনো পদার্থ যত বেশি শক্ত বা দৃঢ় (Stiff) হয়, তার ভেতর দিয়ে শব্দ তত দ্রুত চলাচল করতে পারে। বিজ্ঞানীরা লেজার রশ্মি ব্যবহার করে ঐ ক্ষণস্থায়ী হীরার ভেতর দিয়ে শব্দ তরঙ্গ পাঠিয়েছিলেন। ফলাফলে দেখা যায়, সাধারণ হীরার চেয়ে এই নতুন ষড়ভুজাকার হীরার ভেতর দিয়ে শব্দ অনেক বেশি দ্রুত ছুটছে। এর থেকেই বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন যে, এটি প্রাকৃতিক হীরার চেয়েও অনেক বেশি শক্ত। ষড়ভুজাকার কাঠামোর কারণে এটি চাপ এবং কাটার বল (Shear force) অনেক বেশি ভালোভাবে সহ্য করতে পারে।

ভবিষ্যতে কী কাজে লাগবে এই সুপার-ডায়মন্ড?

হয়তো ভাবছেন, এই হীরা দিয়ে নিশ্চয়ই খুব সুন্দর গয়না বানানো হবে! আসলে, বিজ্ঞানীদের মূল লক্ষ্য গয়না নয়, বরং শিল্প ও প্রযুক্তির উন্নয়ন। যেহেতু এই নতুন ষড়ভুজাকার হীরা প্রাকৃতিক হীরার চেয়েও শক্ত, তাই কারখানায় লোহা বা ইস্পাত কাটার যন্ত্র, খনিতে পাথর ছিদ্র করার ড্রিল মেশিন কিংবা মহাকাশযানের অতি-টেকসই যন্ত্রাংশ তৈরিতে এটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। সাধারণ হীরার ব্লেড দিয়ে যা কাটতে কষ্ট হতো, এই নতুন হীরা দিয়ে তা মাখনের মতো অনায়াসেই কাটা সম্ভব হবে। যদিও এটি আপাতত ল্যাবরেটরিতে খুব অল্প সময়ের জন্য তৈরি করা সম্ভব হয়েছে, কিন্তু বিজ্ঞানীরা আশা করছেন ভবিষ্যতে এটি স্থায়ীভাবে এবং বেশি পরিমাণে উৎপাদন করার প্রযুক্তিও আবিষ্কৃত হবে।

বিজ্ঞানের জাদুকরী সাফল্য

চীনা বিজ্ঞানীদের এই সাফল্য প্রমাণ করে দিল, মানুষের চেষ্টা আর বিজ্ঞানের জাদুতে অসম্ভব বলে কিছু নেই। যে জিনিসটি একসময় শুধু মহাকাশের উল্কাপিণ্ডেই জুটত, আজ তা মানুষের ল্যাবরেটরিতে তৈরি হচ্ছে। পদার্থবিজ্ঞানের এই যুগান্তকারী আবিষ্কার আগামী দিনে আমাদের প্রযুক্তিকে যে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

Raisul Sohan
Raisul Sohan
বিজ্ঞান অনুরাগী। শখের বিজ্ঞান লেখক।
RELATED ARTICLES

Most Popular