দুই অসাধারণ মানুষ
উনিশ শতকের লন্ডন। শিল্পবিপ্লবের ধোঁয়ায় ঢেকে যাচ্ছে আকাশ। কারখানার চাকা ঘুরছে, স্টিম ইঞ্জিন বদলে দিচ্ছে সভ্যতার গতি। কিন্তু সেই সময়েই নীরবে জন্ম নিচ্ছিল আরেক বিপ্লব – বিদ্যুৎ ও চৌম্বকত্বের বিপ্লব। আর এই বিপ্লবের কেন্দ্রে ছিলেন দুই অসাধারণ মানুষ- মাইকেল ফ্যারাডে এবং জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল।
ফ্যারাডে ছিলেন স্বশিক্ষিত, পরীক্ষাগারের জাদুকর। আর ম্যাক্সওয়েল ছিলেন অসামান্য এক গাণিতিক প্রতিভা। একজন প্রকৃতির রহস্য “দেখতে” পারতেন পরীক্ষার মাধ্যমে, আর অন্যজন সেই রহস্যকে “বন্দি” করেছিলেন সমীকরণের ভাষায়। আধুনিক বৈদ্যুতিক সভ্যতার ভিত গড়ে উঠেছে মূলত এই দুই মানুষের হাত ধরেই।
পরীক্ষাগারের জাদুকর
মাইকেল ফ্যারাডের জন্ম হয়েছিল অত্যন্ত দরিদ্র এক পরিবারে। ছোটবেলায় তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষাও ছিল খুব সীমিত। জীবিকার জন্য তিনি কাজ নেন এক বই বাঁধানোর দোকানে। কিন্তু ভাগ্যের অদ্ভুত খেলায় সেই দোকানই হয়ে ওঠে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়। বই বাঁধাই করতে করতেই তিনি পড়তে শুরু করেন বিজ্ঞান বিষয়ক বই। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও রসায়নের জগৎ তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল।
একদিন তিনি বিখ্যাত রসায়নবিদ স্যার হামফ্রি ডেভির বক্তৃতা শুনতে যান। সেই বক্তৃতার নোট এত সুন্দর করে লিখেছিলেন যে ডেভি মুগ্ধ হয়ে তাঁকে নিজের সহকারী হিসেবে রয়্যাল ইনস্টিটিউশনে কাজের সুযোগ দেন। সেখান থেকেই শুরু হয় বিজ্ঞানের ইতিহাসের এক বিস্ময়কর যাত্রা।
ফ্যারাডের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর কল্পনা। তিনি প্রকৃতিকে জীবন্ত এক প্রবাহ হিসেবে অনুভব করতেন। সেই সময় বিজ্ঞানীরা বিদ্যুৎ ও চৌম্বকত্বকে আলাদা দুটি বিষয় হিসেবে দেখতেন। কিন্তু ফ্যারাডে বুঝতে পারলেন, এদের মধ্যে গভীর কোনো সম্পর্ক আছে।
১৮৩১ সালে তিনি দেখালেন, একটি চুম্বককে যদি তারের কুণ্ডলীর কাছে নাড়ানো হয়, তাহলে তারের ভেতর বিদ্যুৎ প্রবাহ তৈরি হয়। এটাই পরে, “ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ইনডাকশন” নামে পরিচিত হয়। আধুনিক জেনারেটর, ট্রান্সফরমার, বিদ্যুৎ কেন্দ্র – সবকিছুর ভিত্তি লুকিয়ে আছে এই অসামান্য আবিষ্কারের ভেতরে।
ফ্যারাডে গণিতে খুব একটা দক্ষ ছিলেন না। তাই তিনি “ফিল্ড” বা ক্ষেত্রের ধারণা ব্যবহার করতেন। তিনি কল্পনা করতেন, চুম্বকের চারপাশে অদৃশ্য বলরেখা ছড়িয়ে আছে। আজকে এটা আমাদের কাছে খুব স্বাভাবিক মনে হলেও তখনকার যুগে ধারণাটি ছিল একেবারে বিপ্লবী।
সমীকরণের মানুষ
আর ঠিক এখানেই মঞ্চে আসেন জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল।স্কটল্যান্ডের এই তরুণ পদার্থবিদ ছিলেন অসাধারণ এক গাণিতিক প্রতিভা। তিনি ফ্যারাডের ধারণাগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন। তারপর সেই অদৃশ্য বলরেখাগুলোকে গাণিতিক সমীকরণের ভাষায় প্রকাশ করলেন। জন্ম নিল বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিখ্যাত চারটি, “ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ”।
এই সমীকরণগুলো বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ম্যাক্সওয়েল একটি অবিশ্বাস্য সত্য আবিষ্কার করেন। তিনি দেখলেন, বিদ্যুৎ ও চৌম্বক ক্ষেত্র একে অপরকে জন্ম দিতে গিয়ে তরঙ্গ আকারে ছড়িয়ে যেতে পারে। আর সেই তরঙ্গের গতি হিসেব করে তিনি পেলেন – আলোর গতি!
তখনই তাঁর মনে হলো, আলো নিজেই আসলে একটি তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ। এই উপলব্ধি ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম বড় বৈজ্ঞানিক বিপ্লব। হঠাৎ করেই আলো, বিদ্যুৎ, চৌম্বকত্ব -সবকিছু এক সুতোয় গাঁথা হয়ে গেল।
আজ আমরা যে রেডিও ব্যবহার করি, টেলিভিশন দেখি, মোবাইল ফোনে কথা বলি, Wi-Fi ব্যবহার করি, কিংবা মহাকাশযানের সাথে যোগাযোগ করি – এ সবকিছুর পেছনে কাজ করছে ফ্যারাডে ও ম্যাক্সওয়েলের সেই আবিষ্কার।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর সভ্যতার ভিত্তি নির্মাণ
মজার ব্যাপার হলো, ফ্যারাডে ছিলেন পরীক্ষার মানুষ, আর ম্যাক্সওয়েল ছিলেন সমীকরণের মানুষ। একজন যেন প্রকৃতির ভাষা শুনতেন, আর অন্যজন সেটাকে গণিতের ভাষায় অনুবাদ করতেন। কিন্তু তাদের কাজ একে অপরকে এমনভাবে পূর্ণতা দিয়েছে যে, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে এই দুই নামকে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব।
পরবর্তীতে আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতাও অনেকাংশে দাঁড়িয়েছিল ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণের ওপর। কারণ আলোর গতি সবার জন্য একই – এই ধারণাটিই শেষ পর্যন্ত বদলে দিয়েছিল স্থান ও কাল সম্পর্কে মানুষের ধারণা।
ফ্যারাডে ও ম্যাক্সওয়েল শুধু বিদ্যুত আর চৌম্বকত্বের রহস্য উন্মোচন করেননি। তাঁরা আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর সভ্যতার ভিত্তি নির্মাণ করে দিয়েছিলেন।
