Homeমহাকাশ বিজ্ঞানমহাবিশ্বে আমরা কি সত্যিই একা?

মহাবিশ্বে আমরা কি সত্যিই একা?

রাতের আকাশে তাকালে নক্ষত্রগুলোকে অসংখ্য আলোর বিন্দু বলে মনে হয়। কিন্তু প্রতিটি বিন্দুর পেছনে রয়েছে এক একটি সূর্য, আর তার চারদিকে ঘুরতে পারে একাধিক গ্রহ। সেই গ্রহগুলোর কোনো একটিতে হয়তো রয়েছে সমুদ্র, বায়ুমণ্ডল কিংবা জীবনের উপযোগী পরিবেশ।

আরও এক ধাপ এগিয়ে প্রশ্ন করা যায়- সেখানে কি শুধু ব্যাকটেরিয়ার মতো সরল প্রাণ আছে? নাকি এমন কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীও আছে, যারা প্রযুক্তি তৈরি করেছে, মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করছে এবং আমাদের মতোই ভাবছে, এই মহাবিশ্বে তারা কি একা?

এর কোনো নিশ্চিত উত্তর এখনো বিজ্ঞানের কাছে নেই। তবে বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, পৃথিবীর বাইরে সাধারণ প্রাণের অস্তিত্ব থাকা বেশ সম্ভাব্য। কিন্তু বুদ্ধিমান ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রাণের অস্তিত্ব আছে কি না, সেই হিসাব অনেক বেশি জটিল।

প্রাণের জন্য পৃথিবী কি একমাত্র উপযুক্ত স্থান?

একসময় মনে করা হতো, আমাদের সৌরজগত সম্ভবত মহাবিশ্বের একটি বিরল ব্যবস্থা। সূর্যের চারদিকে গ্রহ ঘুরছে, এমন ঘটনা হয়তো খুব বেশি ঘটে না। এই ধারণা এখন আর টেকে না।

১৯৯০ এর দশক থেকে অন্য নক্ষত্রের চারদিকে ঘুরতে থাকা গ্রহ নিয়মিত আবিষ্কৃত হচ্ছে। এদের বলা হয় বহির্গ্রহ বা এক্সোপ্ল্যানেট। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত নাসার এক্সোপ্ল্যানেট আর্কাইভে ছয় হাজারের বেশি নিশ্চিত বহির্গ্রহ তালিকাভুক্ত হয়েছে। আবিষ্কারের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

এই গ্রহগুলোর মধ্যে রয়েছে বৃহস্পতির চেয়েও বড় উত্তপ্ত গ্যাসীয় গ্রহ। রয়েছে পৃথিবীর কাছাকাছি আকারের পাথুরে গ্রহ। আবার এমন গ্রহও আছে, যেগুলো তাদের  নক্ষত্রের বাসযোগ্য অঞ্চলে ঘুরছে।

বাসযোগ্য অঞ্চল বলতে নক্ষত্র থেকে এমন দূরত্বকে বোঝায়, যেখানে একটি গ্রহের পৃষ্ঠে উপযুক্ত বায়ুমণ্ডল থাকলে তরল পানি টিকে থাকতে পারে।

তবে কোনো গ্রহ বাসযোগ্য অঞ্চলে থাকলেই সেখানে প্রাণ থাকবে, এমন নয়। শুক্র ও মঙ্গল তার ভালো উদাহরণ। অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটাই যথেষ্ট নয়। বায়ুমণ্ডল, তাপমাত্রা, পানি, চৌম্বকক্ষেত্র, ভূতাত্ত্বিক সক্রিয়তা এবং নক্ষত্রের বিকিরণ – সবকিছুর মধ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী ভারসাম্য দরকার।

প্রাণ তৈরির উপাদান মহাবিশ্বে বিরল নয়

পৃথিবীর প্রাণ মূলত কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও সালফারের মতো উপাদান দিয়ে তৈরি। এগুলো শুধু পৃথিবীতেই পাওয়া যায় না। নক্ষত্র, নীহারিকা, ধূমকেতু, গ্রহাণু ও আন্তনাক্ষত্রিক গ্যাসের মেঘেও এসব উপাদান রয়েছে।

মহাকাশে বিভিন্ন জৈব অণুও শনাক্ত হয়েছে। এখানে “জৈব” শব্দের অর্থ এই নয় যে অণুগুলো অবশ্যই কোনো প্রাণ তৈরি করেছে। এর অর্থ হলো, প্রাণ তৈরির রসায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক উপাদান মহাবিশ্বের বিভিন্ন স্থানে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হতে পারে। সুতরাং মহাবিশ্বে প্রাণের কাঁচামালের অভাব নেই। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো, এসব নির্জীব পদার্থ কীভাবে একত্রিত হয়ে প্রথম স্বয়ংপ্রতিলিপি তৈরি করতে সক্ষম জীবন্ত ব্যবস্থায় পরিণত হয়।

পৃথিবীতে সেই ঘটনা অন্তত একবার ঘটেছে। কিন্তু এটি সহজ ও সাধারণ ঘটনা, নাকি প্রায় অসম্ভব এক রাসায়নিক দুর্ঘটনা, সেটা আমরা এখনো জানি না।

পৃথিবীর চরম পরিবেশ আমাদের নতুন শিক্ষা দিয়েছে

একসময় বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, প্রাণের জন্য নরম তাপমাত্রা, সূর্যের আলো এবং শান্ত পরিবেশ দরকার।
পরে দেখা গেল, পৃথিবীর প্রাণ এত সহজে হার মানে না।

গভীর সমুদ্রের অন্ধকারে, আগ্নেয় উষ্ণ প্রস্রবণের পাশে, বরফের নিচে, অত্যন্ত লবণাক্ত পানিতে, তীব্র অম্লীয় পরিবেশে এবং প্রচণ্ড বিকিরণের মধ্যেও অণুজীব বেঁচে থাকতে পারে। এসব প্রাণীকে বলা হয়, এক্সট্রিমোফাইল।

তাদের আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের প্রাণের সংজ্ঞা ও বাসযোগ্যতার ধারণা বদলে দিয়েছে। এখন আর শুধু পৃথিবীর মতো সুন্দর নীল গ্রহের মধ্যেই প্রাণ খোঁজা হয় না। মঙ্গলের মাটির নিচে, বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপার বরফের তলায় কিংবা শনির উপগ্রহ এনসেলাডাসের অভ্যন্তরীণ সমুদ্রেও প্রাণের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে।

অর্থাৎ, পৃথিবীর মতো পরিবেশ না থাকলেও সাধারণ প্রাণ টিকে থাকতে পারে।

প্রাণ আর বুদ্ধিমান প্রাণ এক বিষয় নয়

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি আসে। কোনো গ্রহে ব্যাকটেরিয়ার মতো প্রাণ জন্ম নেওয়া আর সেই প্রাণ থেকে প্রযুক্তি নির্মাণে সক্ষম বুদ্ধিমান প্রজাতির উদ্ভব হওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘটনা।

পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর। প্রাচীনতম প্রাণের চিহ্ন পাওয়া যায় পৃথিবীর ইতিহাসের একেবারে প্রথম দিকেই। কিন্তু এরপর কয়েক বিলিয়ন বছর ধরে পৃথিবীতে মূলত এককোষী প্রাণেরই আধিপত্য ছিল।

জটিল বহুকোষী প্রাণ এসেছে অনেক পরে। ডাইনোসর পৃথিবীতে টিকে ছিল প্রায় ১৬৫ মিলিয়ন বছর। কিন্তু তারা রেডিও টেলিস্কোপ বানায়নি, মহাকাশযান পাঠায়নি কিংবা পদার্থবিজ্ঞানের সমীকরণ লেখেনি।

আধুনিক মানুষ এসেছে মাত্র কয়েক লাখ বছর আগে। আর রেডিও সংকেত পাঠাতে সক্ষম প্রযুক্তিগত সভ্যতার বয়স মাত্র এক শতাব্দীর কিছু বেশি।

পৃথিবীর ইতিহাস তাই আমাদের একটি কঠিন শিক্ষা দেয় – প্রাণের উদ্ভব ঘটলেও বুদ্ধিমান প্রাণের আবির্ভাব নিশ্চিত নয়।

বিবর্তনের লক্ষ্য কি বুদ্ধিমান প্রাণ সৃষ্টি করা?

বিবর্তন কোনো পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে না। প্রকৃতি এমন পরিকল্পনা করেনি যে একদিন মানুষ তৈরি করবে। বিবর্তনের মূল চালিকা শক্তি হলো পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে টিকে থাকা এবং বংশবিস্তার করা। ব্যাকটেরিয়া এই কাজে অত্যন্ত সফল। পিঁপড়া, কুমির বা হাঙরও সফল। প্রযুক্তি তৈরি না করেও তারা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে টিকে আছে।

মানুষের মতো বুদ্ধিমত্তা তাই বিবর্তনের অবধারিত শেষ ধাপ নয়। এটি বিশেষ কিছু পরিবেশগত চাপ, দৈব পরিবর্তন, শারীরিক গঠন এবং ঐতিহাসিক ঘটনার ফল হতে পারে।

পৃথিবীতে ডাইনোসর বিলুপ্ত না হলে স্তন্যপায়ীদের দ্রুত বিকাশ ঘটত কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়। সেই গ্রহাণু সংঘর্ষ না ঘটলে মানুষ হয়তো কখনোই আসত না।

তাই অন্য কোনো গ্রহে প্রাণ থাকলেও তার বিবর্তনের পথ সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। সেখানে বিশাল সমুদ্রজীব থাকতে পারে, কিন্তু আগুন ব্যবহার করার মতো হাত নাও থাকতে পারে। বুদ্ধিমান প্রাণ থাকতে পারে, কিন্তু স্থলভাগে না ওঠার কারণে প্রযুক্তিগত সভ্যতা গড়ে তুলতে না-ও পারে।

ড্রেক সমীকরণ: অজানাকে হিসাবের মধ্যে আনা

১৯৬১ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্র্যাঙ্ক ড্রেক একটি সমীকরণ প্রস্তাব করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে কতটি যোগাযোগক্ষম সভ্যতা থাকতে পারে, তার সম্ভাব্য সংখ্যা নিয়ে একটি বৈজ্ঞানিক আলোচনা শুরু করা।

এটি সরাসরি কোনো উত্তর বের করার সমীকরণ নয়। বরং বড় প্রশ্নটিকে কয়েকটি ছোট প্রশ্নে ভাগ করে।

যেমন, গ্যালাক্সিতে কত দ্রুত নতুন নক্ষত্র তৈরি হচ্ছে? কতটি নক্ষত্রের চারদিকে গ্রহ আছে? কতটি গ্রহে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ আছে? সেখানে প্রাণ কতবার জন্ম নেয়? প্রাণ থেকে বুদ্ধিমত্তা কতবার বিকশিত হয়? কতটি বুদ্ধিমান প্রজাতি যোগাযোগ প্রযুক্তি তৈরি করে? এবং সেই প্রযুক্তিগত সভ্যতা কত দিন টিকে থাকে?

এই মানগুলো একসঙ্গে গুণ করলে যোগাযোগ করা সম্ভব, এমন সভ্যতার একটি আনুমানিক সংখ্যা পাওয়া যায়।

সমস্যা হলো, সমীকরণের প্রথম কয়েকটি মান সম্পর্কে আমাদের ধারণা আগের চেয়ে পরিষ্কার হলেও শেষের মানগুলো প্রায় সম্পূর্ণ অজানা।

আমরা এখন জানি, নক্ষত্রের চারপাশে গ্রহ খুবই সাধারণ ঘটনা। কিন্তু প্রাণ কত সহজে শুরু হয়, বুদ্ধিমত্তা কতবার আসে এবং প্রযুক্তিগত সভ্যতা কত দিন বেঁচে থাকে, সেসব সম্পর্কে আমাদের কাছে মাত্র একটি উদাহরণ আছে। সেটি হচ্ছে পৃথিবী। মাত্র একটি উদাহরণ দিয়ে মহাজাগতিক পরিসংখ্যান তৈরি করা কঠিন।

বুদ্ধিমান সভ্যতার আয়ু কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ধরা যাক, মিল্কিওয়েতে বিভিন্ন সময়ে হাজার হাজার প্রযুক্তিগত সভ্যতার জন্ম হয়েছে। তবু তাদের সঙ্গে আমাদের দেখা নাও হতে পারে। কারণ মহাজাগতিক দূরত্ব শুধু স্থান দিয়ে নয়, সময় দিয়েও সভ্যতাগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে।
একটি সভ্যতা হয়তো দশ লাখ বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আরেকটির জন্ম হবে দশ লাখ বছর পরে। দুটির অস্তিত্বই সত্য, কিন্তু একই সময়ে নয়।

মানুষের রেডিও যুগের বয়স মাত্র শত বছরের কিছু বেশি। মহাজাগতিক হিসাবে এটি চোখের পলকের চেয়েও ছোট। কোনো সভ্যতা যদি প্রযুক্তি আবিষ্কারের কয়েকশ বছরের মধ্যেই যুদ্ধ, পরিবেশগত বিপর্যয়, মহামারি, নিয়ন্ত্রণহীন প্রযুক্তি কিংবা অন্য কোনো কারণে ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে দুই সভ্যতার একই সময়ে সক্রিয় থাকার সম্ভাবনা খুব কমে যায়। ড্রেক সমীকরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অজানা মানটি তাই হয়তো সভ্যতার সংখ্যা নয়, বরং তার আয়ু।

ফার্মি প্যারাডক্স: তাহলে সবাই কোথায়?

১৯৫০ সালে পদার্থবিদ এনরিকো ফার্মি একটি সাধারণ কিন্তু গভীর প্রশ্ন তুলেছিলেন, “তারা সবাই কোথায়?”

মিল্কিওয়ের বয়স প্রায় ১৩ বিলিয়ন বছর। সূর্যের চেয়ে অনেক পুরোনো নক্ষত্রও এখানে আছে। যদি কোনো প্রযুক্তিগত সভ্যতা মানুষের চেয়ে কয়েক মিলিয়ন বছর আগে তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে তারা পুরো গ্যালাক্সিতে ছড়িয়ে পড়ার জন্য বিপুল সময় পেয়েছে।

তাহলে তাদের মহাকাশযান কোথায়? তাদের রেডিও সংকেত কোথায়? তাদের তৈরি বিশাল কাঠামো কোথায়? তাদের প্রযুক্তির কোনো চিহ্ন আমরা দেখতে পাচ্ছি না কেন?

মহাবিশ্বে প্রাণের সম্ভাবনা বেশি মনে হলেও তার কোনো নিশ্চিত প্রমাণ না পাওয়ার এই কূটভাসকে বলা হয়, ফার্মি প্যারাডক্স। তবে SETI ইনস্টিটিউট সতর্ক করে বলেছে, আমরা এখনো মহাকাশের অত্যন্ত সামান্য অংশ অনুসন্ধান করেছি। তাই বর্তমান নীরবতাকে অনুপস্থিতির চূড়ান্ত প্রমাণ মনে করা ঠিক হবে না।

গ্রেট ফিল্টার: কোথাও কি একটি অদৃশ্য বাধা আছে?

ফার্মি প্যারাডক্সের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো গ্রেট ফিল্টার বা মহাছাঁকনি। এই ধারণা অনুযায়ী, নির্জীব পদার্থ থেকে নক্ষত্রভ্রমণকারী সভ্যতায় পৌঁছানোর পথে এমন একটি বা একাধিক অত্যন্ত কঠিন ধাপ রয়েছে, যেটা অধিকাংশ প্রাণই অতিক্রম করতে পারে না।

সেই কঠিন ধাপ কোনটি? প্রথম জীবনের জন্ম? জটিল কোষের সৃষ্টি? বহুকোষী প্রাণের বিকাশ? বুদ্ধিমত্তার আবির্ভাব? প্রযুক্তির উদ্ভব? নাকি প্রযুক্তি পাওয়ার পর দীর্ঘ সময় আত্মবিনাশ এড়িয়ে টিকে থাকা?

গ্রেট ফিল্টার যদি আমাদের অতীতে থাকে, তাহলে সেটি স্বস্তির খবর। এর অর্থ, জীবন বা জটিল প্রাণের উদ্ভব এতই বিরল যে আমরা ইতিমধ্যে সবচেয়ে কঠিন বাধাটি পার হয়ে এসেছি।

কিন্তু গ্রেট ফিল্টার যদি আমাদের সামনে থাকে, তাহলে বিষয়টি উদ্বেগজনক। এর অর্থ হতে পারে, প্রযুক্তিগত সভ্যতাগুলো একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছে নিজেদের ধ্বংস করে ফেলে।

অন্য গ্রহে সাধারণ প্রাণ আবিষ্কার তাই একই সঙ্গে আনন্দের এবং চিন্তার খবর হতে পারে। মঙ্গলে স্বাধীনভাবে জন্ম নেওয়া প্রাণ পাওয়া গেলে বোঝা যাবে, প্রাণের উৎপত্তি খুব বিরল নয়। ইউরোপা ও এনসেলাডাসেও আলাদা প্রাণ পাওয়া গেলে বোঝা যাবে, সৌরজগতে জীবন বারবার জন্ম নিতে পারে।

তখন প্রশ্ন উঠবে, প্রাণ যদি এত সাধারণ হয়, বুদ্ধিমান সভ্যতাগুলো গেল কোথায়? আমরা হয়তো ঠিকভাবে খুঁজছি না

মানুষ সাধারণত ধরে নেয়, ভিনগ্রহের সভ্যতাও রেডিও সংকেত ব্যবহার করবে। কিন্তু প্রযুক্তি কয়েক শতাব্দীতেই আমূল বদলে যেতে পারে। আমরা নিজেরাই এখন শক্তিশালী বেতার সম্প্রচারের বদলে ফাইবার অপটিক, দিকনির্দেশিত সংকেত এবং কম শক্তির ডিজিটাল যোগাযোগের দিকে যাচ্ছি। ফলে পৃথিবীও দূর থেকে আগের তুলনায় কম “কোলাহলপূর্ণ” হয়ে যেতে পারে।

আমাদের চেয়ে হাজার বা দশ লাখ বছর এগিয়ে থাকা সভ্যতা এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে, যা আমরা কল্পনাই করতে পারি না।
তারা হয়তো রেডিও ব্যবহার করে না। হয়তো তাদের যোগাযোগের সংকেত আমরা প্রাকৃতিক ঘটনা বলে ভুল করছি। হয়তো তারা জৈবদেহ ছেড়ে যন্ত্রনির্ভর বুদ্ধিমত্তায় রূপান্তরিত হয়েছে। হয়তো তারা গ্রহের পৃষ্ঠে নয়, মহাকাশে কিংবা কৃত্রিম কাঠামোতে বাস করে। আবার এমনও হতে পারে, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের উপস্থিতি প্রকাশ করছে না। এসব ধারণা আকর্ষণীয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত এগুলোর পক্ষে প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই।

মহাকাশ এত বিশাল যে কথোপকথনও কঠিন

আমাদের নিকটতম নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টরি প্রায় ৪.২৪ আলোকবর্ষ দূরে। সেখানে কোনো সভ্যতা থাকলে এবং আমরা আজ একটি বার্তা পাঠালে, আলোর গতিতে সেটি পৌঁছাতে চার বছরের বেশি সময় লাগবে। তারা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেও সেই উত্তর পেতে মোটামুটি সাড়ে আট বছর অপেক্ষা করতে হবে।

এক হাজার আলোকবর্ষ দূরের সভ্যতার সঙ্গে একবার প্রশ্ন ও উত্তর আদান-প্রদানে দুই হাজার বছর লেগে যাবে। তাই মহাজাগতিক যোগাযোগ পৃথিবীর টেলিফোন কথোপকথনের মতো হবে না। এটি হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলতে থাকা ধীর সংলাপ।

আর কোনো সংকেত আমাদের কাছে পৌঁছালে সেটি বর্তমানের বার্তা নাও হতে পারে। আমরা হয়তো এমন একটি সভ্যতার পুরোনো সম্প্রচার শুনব, যারা বহু আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

জেমস ওয়েব কী খুঁজছে?

জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীন সরাসরি কোনো ভিনগ্রহবাসীর ছবি তোলার জন্য তৈরি হয়নি। তবে এটি দূরবর্তী গ্রহের বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ করতে পারে। কোনো গ্রহ তার নক্ষত্রের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় নক্ষত্রের কিছু আলো গ্রহটির বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে আসে।বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন গ্যাস আলোর নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষণ করে। সেই আলোর বর্ণালি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা মিথেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড, জলীয় বাষ্প কিংবা অন্য অণুর উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পান।

এভাবেই জেমস ওয়েব K2-18 b নামের একটি বহির্গ্রহের বায়ুমণ্ডলে মিথেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড শনাক্ত করেছে। গ্রহটি পৃথিবীর চেয়ে অনেক বড় এবং এটিকে সম্ভাব্য হাইসিয়ান জগত, অর্থাৎ হাইড্রোজেনসমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডল ও সম্ভাব্য গভীর সমুদ্রবিশিষ্ট গ্রহ—হিসেবে আলোচনা করা হয়েছে।

২০২৫ সালে K2-18 b-এর বায়ুমণ্ডলে ডাইমিথাইল সালফাইড বা তার কাছাকাছি আরেকটি অণুর সম্ভাব্য সংকেত নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। পৃথিবীতে ডাইমিথাইল সালফাইডের বড় অংশ সামুদ্রিক অণুজীব থেকে আসে। প্রথম বিশ্লেষণটি তাই অত্যন্ত আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু পরবর্তী স্বাধীন গবেষণাগুলো বলেছে, সংকেতটি এখনো নিশ্চিত নয় এবং যন্ত্রগত গোলমাল বা অন্য অণুও একই ধরনের বর্ণালি তৈরি করতে পারে। বর্তমানে K2-18 b-তে প্রাণের কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই।

এটি বিজ্ঞানের একটি ভালো দৃষ্টান্ত। আকর্ষণীয় সংকেত পাওয়া গেলেই বিজ্ঞানীরা “প্রাণ আবিষ্কার” ঘোষণা করেন না। একই তথ্য বারবার পরীক্ষা করা হয়। বিকল্প ব্যাখ্যা বাদ দেওয়া হয়। অন্য যন্ত্র ও অন্য গবেষক দলের ফলাফলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়।

প্রাণের চিহ্ন শনাক্ত করা এত কঠিন কেন?

অক্সিজেন দেখলেই কি প্রাণ নিশ্চিত? না। মিথেন দেখলেই? তাও নয়। কোনো কোনো ভূতাত্ত্বিক ও রাসায়নিক প্রক্রিয়াও অক্সিজেন বা মিথেন তৈরি করতে পারে। আবার কোনো জীবন্ত গ্রহে এমন বায়ুমণ্ডল থাকতে পারে, যা আমাদের পরিচিত জীবনের সংকেতের সঙ্গে মেলে না। তাই বিজ্ঞানীরা একটি গ্যাস নয়, গ্যাসের অস্বাভাবিক সমন্বয় খোঁজেন।

উদাহরণ হিসেবে অক্সিজেন ও মিথেন একসঙ্গে দীর্ঘ সময় উপস্থিত থাকলে সেটা আকর্ষণীয় হতে পারে। কারণ দুটি গ্যাস পরস্পরের সঙ্গে বিক্রিয়া করে ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। এগুলো যদি ক্রমাগত থেকে যায়, তাহলে কোনো প্রক্রিয়া নিয়মিতভাবে সেগুলো তৈরি করছে।

সেই প্রক্রিয়াটি প্রাণ হতে পারে। আবার অন্য কোনো অজানা ভূতাত্ত্বিক ব্যবস্থাও হতে পারে।
একটি সম্ভাব্য জীবচিহ্ন তাই চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। গ্রহটির নক্ষত্র, তাপমাত্রা, বায়ুমণ্ডল, মেঘ, ভর, অভ্যন্তরীণ গঠন ও রাসায়নিক পরিবেশ সব একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।

বুদ্ধিমান প্রাণের চিহ্ন আলাদা

সাধারণ প্রাণ খোঁজার সময় বিজ্ঞানীরা বায়োসিগনেচার বা জীবচিহ্ন খোঁজেন। বুদ্ধিমান প্রাণ খোঁজার সময় খোঁজা হয় টেকনোসিগনেচার বা প্রযুক্তির চিহ্ন। এটি হতে পারে অস্বাভাবিক রেডিও সংকেত, অত্যন্ত শক্তিশালী লেজার, গ্রহের বায়ুমণ্ডলে শিল্পজাত রাসায়নিক, কৃত্রিম আলোকসজ্জা অথবা নক্ষত্রের শক্তি সংগ্রহের জন্য নির্মিত বিশাল কাঠামোর চিহ্ন।

SETI কর্মসূচিগুলো দীর্ঘদিন ধরে মহাকাশ থেকে আসা সংকীর্ণ তরঙ্গের রেডিও সংকেত খুঁজছে। প্রাকৃতিক উৎস সাধারণত বিস্তৃত তরঙ্গমালায় বিকিরণ করে। খুব সংকীর্ণ ও নিয়মিত সংকেত প্রযুক্তির সম্ভাব্য ইঙ্গিত হতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো সংকেত পাওয়া যায়নি, যা স্বাধীনভাবে পুনরায় শনাক্ত হয়েছে এবং যার কৃত্রিম উৎস নিশ্চিত করা গেছে।

“ওয়াও!” সংকেত কি ভিনগ্রহবাসীর বার্তা ছিল?

১৯৭৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিগ ইয়ার রেডিও টেলিস্কোপ একটি অস্বাভাবিক শক্তিশালী সংকেত শনাক্ত করেছিল। সংকেতটি ৭২ সেকেন্ড স্থায়ী হয়েছিল। জ্যোতির্বিজ্ঞানী জেরি এহম্যান কম্পিউটার প্রিন্টআউটে সেটির পাশে “Wow!” লিখেছিলেন। সেই থেকে এটি “ওয়াও! সংকেত” নামে পরিচিত।

সংকেতটি এমন একটি কম্পাঙ্কের কাছাকাছি ছিল, যেটা মহাজাগতিক যোগাযোগের জন্য যুক্তিসংগত বলে মনে করা হতো।
কিন্তু সেটি আর কখনো একইভাবে ধরা পড়েনি।

তাই এটি ভিনগ্রহের সভ্যতার সংকেত ছিল, এ কথা বলা যায় না। আবার এর উৎস পুরোপুরি নিশ্চিতভাবে ব্যাখ্যাও করা যায়নি।
বিজ্ঞানে একবারের ঘটনা যথেষ্ট নয়। একটি দাবিকে বিশ্বাসযোগ্য হতে হলে সেটি পুনরায় পর্যবেক্ষণযোগ্য হতে হয়।

ইউএফও কি বুদ্ধিমান ভিনগ্রহবাসীর প্রমাণ?

আকাশে কোনো বস্তু শনাক্ত করা না গেলে তাকে অজ্ঞাত উড়ন্ত বস্তু বলা যায়। বর্তমানে “অজ্ঞাত অস্বাভাবিক ঘটনা” কথাটিও ব্যবহার করা হয়। কিন্তু “অজ্ঞাত” মানেই “ভিনগ্রহের” নয়।

অজ্ঞাত কোনো ঘটনার কারণ হতে পারে আবহাওয়া বেলুন, ড্রোন, বিমান, উপগ্রহ, ক্যামেরার ত্রুটি, বায়ুমণ্ডলীয় ঘটনা কিংবা অসম্পূর্ণ তথ্য।

কোনো ঘটনার ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি‌ – এটি শুধু আমাদের অজ্ঞতার প্রমাণ। সেটিকে ভিনগ্রহবাসীর মহাকাশযান বলে ঘোষণা করার প্রমাণ নয়। এ পর্যন্ত পৃথিবীতে ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণী এসেছে, এমন কোনো যাচাইযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি।

উন্নত সভ্যতা কি আমাদের এড়িয়ে চলছে?

ফার্মি প্যারাডক্সের একটি কল্পনাপ্রবণ ব্যাখ্যার নাম, জু হাইপোথিসিস  (Zoo hypothesis)। এই ধারণা অনুযায়ী, উন্নত সভ্যতাগুলো হয়তো পৃথিবীর অস্তিত্ব জানে। কিন্তু আমাদের স্বাভাবিক সামাজিক ও প্রযুক্তিগত বিকাশে হস্তক্ষেপ না করার জন্য দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করছে। যেমন মানুষ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের প্রাণীদের জীবন যথাসম্ভব অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করে, তারাও হয়তো পৃথিবীকে একটি সংরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে দেখছে। ধারণাটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির জন্য চমৎকার। কিন্তু একে পরীক্ষা করার সহজ উপায় নেই। এর কোনো প্রমাণও নেই।

“তারা এত দক্ষতার সঙ্গে লুকিয়ে আছে যে তাদের দেখা যাচ্ছে না”, এমন যুক্তিকে ভুল প্রমাণ করাও কঠিন। তাই এটি সম্ভাবনা হিসেবে আলোচনা করা গেলেও বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।

আমাদের অনুসন্ধান আসলে কতটুকু?

মানুষ প্রায়ই বলে, এতদিন খুঁজেও তো কাউকে পাওয়া গেল না।  কিন্তু আমরা কতটুকু খুঁজেছি? মহাকাশের সম্ভাব্য সব দিক, সব কম্পাঙ্ক, সব সময় এবং সব ধরনের সংকেত একসঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হয়নি। অনেক নক্ষত্রকে মাত্র কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টা দেখা হয়েছে।

একটি সভ্যতা হয়তো শত বছরে একবার শক্তিশালী সংকেত পাঠায়। আমরা হয়তো মাঝের নীরব সময়ে সেখানে কান পেতেছি। একটি উপমা দেওয়া যায়। কেউ যদি সমুদ্র থেকে এক গ্লাস পানি তুলে দেখে সেখানে কোনো মাছ নেই, সে বলতে পারে না যে পুরো সমুদ্রে মাছ নেই। আমাদের বর্তমান অনুসন্ধান অনেকটা সেই এক গ্লাস পানির মতো।

প্রাণ কি আমাদের মতোই হতে হবে?

ভিনগ্রহের প্রাণ নিয়ে ভাবলেই আমরা সাধারণত চোখ, মাথা, হাত-পা ও মানুষের মতো শরীর কল্পনা করি। এর বড় কারণ বিজ্ঞান কল্পকাহিনি।

কিন্তু ভিন্ন মাধ্যাকর্ষণ, ভিন্ন আলো, ভিন্ন বায়ুমণ্ডল ও ভিন্ন রাসায়নিক পরিবেশে প্রাণের গঠন সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে। অন্ধকার সমুদ্রের নিচে বিবর্তিত প্রাণের চোখ নাও থাকতে পারে। উচ্চ মাধ্যাকর্ষণের গ্রহে প্রাণী খাটো ও শক্ত গঠনের হতে পারে। ঘন বায়ুমণ্ডলে প্রাণী ভেসে থাকতে পারে।

লাল বামন নক্ষত্রের গ্রহে উদ্ভিদ আমাদের পরিচিত সবুজ না হয়ে গাঢ় বেগুনি বা কালোও হতে পারে। তবে এসবই বৈজ্ঞানিক অনুমান। পৃথিবীর বাইরের প্রাণের একটিও নিশ্চিত নমুনা না পাওয়া পর্যন্ত আমরা জানি না, জীবনের কত রকম রূপ সম্ভব।

সাধারণ প্রাণ থাকার সম্ভাবনা বেশি

মহাবিশ্বের বিশালতা, গ্রহের বিপুল সংখ্যা, জৈব উপাদানের সাধারণ উপস্থিতি এবং পৃথিবীতে প্রাণের অভিযোজন ক্ষমতা বিবেচনা করলে মনে হয়, পৃথিবীর বাইরে কোথাও না কোথাও সাধারণ প্রাণ থাকার সম্ভাবনা যথেষ্ট বেশি।

সেটি হয়তো মঙ্গল গ্রহের মাটির গভীরে ঘুমিয়ে থাকা অণুজীব। হয়তো ইউরোপার বরফের নিচের সমুদ্রে। হয়তো এনসেলাডাসের উষ্ণ জলীয় পরিবেশে। অথবা শত আলোকবর্ষ দূরের কোনো বহির্গ্রহে।

এমনকি আমাদের গ্যালাক্সিতে প্রাণের অসংখ্য ক্ষুদ্র কেন্দ্র থাকতে পারে। কিন্তু দূরত্ব ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা এখনো তাদের কোনোটি শনাক্ত করতে পারিনি।

বুদ্ধিমান প্রাণের ব্যাপারে উত্তর অনেক বেশি অনিশ্চিত

বুদ্ধিমান প্রাণের সম্ভাবনা  অস্বীকার করা যায় না। মহাবিশ্ব এত বড় যে শুধু পৃথিবীতেই বুদ্ধিমত্তা তৈরি হয়েছে, এ দাবিও খুব শক্ত প্রমাণ ছাড়া করা যায় না।

তবে বুদ্ধিমান প্রাণের সংখ্যা সাধারণ অণুজীবের তুলনায় অনেক কম হতে পারে। কারণ প্রাণ থেকে জটিল প্রাণ, জটিল প্রাণ থেকে বুদ্ধিমত্তা, বুদ্ধিমত্তা থেকে প্রযুক্তি এবং প্রযুক্তি থেকে দীর্ঘস্থায়ী সভ্যতা, প্রতিটি ধাপেই বাধা রয়েছে।

কোনো গ্রহে ডলফিনের মতো বুদ্ধিমান প্রাণ থাকতে পারে, কিন্তু আগুন বা যন্ত্র ব্যবহার না করায় তারা রেডিও তৈরি করতে পারছে না।

হয়তো কোনো সভ্যতা রেডিও আবিষ্কার করেছে, কিন্তু মহাজাগতিক দূরত্ব অতিক্রমের আগেই বিলুপ্ত হয়েছে। আবার এমনও হতে পারে, বুদ্ধিমান সভ্যতা আছে, কিন্তু আমাদের কাছাকাছি নয়। অথবা একই সময়ে নয়।

নিশ্চিতভাবে আমরা কী বলতে পারি?

এখন পর্যন্ত তিনটি কথাই সবচেয়ে সৎ বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত।

প্রথমত, পৃথিবীর বাইরে প্রাণের কোনো নিশ্চিত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

দ্বিতীয়ত, প্রাণ শুধু পৃথিবীতেই থাকতে পারে, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণও নেই।

তৃতীয়ত, আমাদের অনুসন্ধান এখনো একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

একসময় আমরা জানতাম না অন্য নক্ষত্রের গ্রহ আদৌ আছে কি না। এখন ছয় হাজারের বেশি নিশ্চিত গ্রহের সন্ধান পেয়েছি। পরবর্তী বড় আবিষ্কার হতে পারে কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডলে শক্তিশালী জীবচিহ্ন। এরপর হয়তো আসবে প্রযুক্তির চিহ্ন।

কিন্তু সেটি আগামীকাল ঘটবে, নাকি এক হাজার বছর পর কেউ জানে না।

শেষ কথা

মহাবিশ্বে আমরা একা কি না, তার উত্তর এখনো অন্ধকারে ঢাকা। হয়তো প্রাণ মহাবিশ্বের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। উপযুক্ত পরিবেশ পেলেই প্রাণ  জন্ম নেয়। হয়তো প্রাণ সাধারণ, কিন্তু বুদ্ধিমত্তা বিরল। হয়তো বুদ্ধিমান সভ্যতাও অনেক আছে, কিন্তু মহাকাশের বিশাল দূরত্ব ও সময়ের ব্যবধান আমাদের পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। আবার এমনও হতে পারে, পৃথিবী সত্যিই এক মহাজাগতিক ব্যতিক্রম। অসংখ্য নক্ষত্র ও গ্রহের মধ্যে শুধু এই ক্ষুদ্র নীল গ্রহেই মহাবিশ্ব নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছে। দুটো সম্ভাবনাই বিস্ময়কর।

আমরা যদি একা না হই, তাহলে মহাবিশ্বে আমাদের প্রতিবেশী আছে। আর যদি সত্যিই একা হই, তাহলে পৃথিবীর প্রাণ আরও বেশি মূল্যবান। কারণ সে ক্ষেত্রে এই ছোট্ট গ্রহটিই হয়তো বিশাল মহাবিশ্বের একমাত্র স্থান, যেখানে পদার্থ চোখ মেলে নক্ষত্রের দিকে তাকায়, প্রশ্ন করে এবং নিজের উৎস বোঝার চেষ্টা করে।

হয়তো বহু আলোকবর্ষ দূরে কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী এখন তাদের নিজস্ব আকাশের দিকে তাকিয়ে একই প্রশ্ন করছে, এই মহাবিশ্বে আমরা কি সত্যিই একা?

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular