মূল কন্টেন্টে যান
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতামহাকাশ বিজ্ঞানঅ্যাপোফিস: আকাশের আগন্তুক

অ্যাপোফিস: আকাশের আগন্তুক

২১ মে, ২০২৬

⏱ ৩ মিনিট পড়ার সময়

👁 ২১৪ 💬 ০
অ্যাপোফিস: আকাশের আগন্তুক

ডুমসডে অ্যাস্টেরয়েড

২০০৪ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মহাকাশে একটি অদ্ভুত আকারের শিলাখণ্ড খুঁজে পান।  এর নাম দেওয়া হয়, “অ্যাপোফিস”। এটি আসলে পৃথিবীর কাছাকাছি অবস্থিত একটি গ্রহাণু, যাদের বিজ্ঞানীরা বলেন, “নিয়ার আর্থ অবজেক্ট” বা নিও। প্রাচীন মিশরের অন্ধকার ও ধ্বংসের দেবতা অ্যাপোফিসের নামে নামকরণ করা এই গ্রহাণুটি একসময় পৃথিবীর জন্য বড় হুমকি বলে মনে করা হয়েছিল। প্রথম দিকের হিসেব বলছিল, ২০২৯ সালে এটি পৃথিবীর সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠতে পারে। সংবাদমাধ্যমে তখন ব্যাপক আলোড়ন শুরু হয়। অনেকেই একে “ডুমসডে অ্যাস্টেরয়েড” বলতে শুরু করেছিল।

কাছ আসবে কিন্তু আঘাত হানবে না

পরে আরও নিখুঁত পর্যবেক্ষণে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন, অন্তত আগামী একশ বছরের মধ্যে অ্যাপোফিস পৃথিবীতে আঘাত হানবে না। কিন্তু তাতেও এর গুরুত্ব কমেনি। কারণ ২০২৯ সালের ১৩ এপ্রিল এটি পৃথিবীর খুব কাছ দিয়ে উড়ে যাবে। মহাজাগতিক হিসেবে অবিশ্বাস্য রকম কাছ দিয়ে। অ্যাপোফিস এতটাই কাছে আসবে যে, পৃথিবীর অনেক জায়গা থেকেই খালি চোখে দেখা যেতে পারে। এর দূরত্ব হবে প্রায় ৩২ হাজার কিলোমিটার। অর্থাৎ পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে থাকা অনেক কৃত্রিম উপগ্রহের কক্ষপথেরও ভেতর দিয়ে এটি অতিক্রম করবে।
অ্যাপোফিসের আকার প্রায় ৩৭০ মিটার। পুরো একটা পাহাড়ের মতো বিশাল পাথুরে বস্তু, ঘণ্টায় প্রায় তিরিশ হাজার কিলোমিটার বেগে ছুটে চলেছে মহাশূন্যে। এটি পৃথিবীতে আঘাত করলে ডাইনোসরের বিলুপ্তির মতো কোনো বৈশ্বিক বিপর্যয় ঘটবে না ঠিকই, কিন্তু একটি বড় শহর বা অঞ্চলকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার মতো শক্তি এর আছে।

বিরল ঘটনা

তবে ভয়ের চেয়ে এখানে বিস্ময়ের ব্যাপারটি বড়। কারণ পৃথিবীর এত কাছ দিয়ে এত বড় কোনো গ্রহাণুর অতিক্রম করার ঘটনা মানবসভ্যতা খুব কমই দেখেছে। বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যেই পরিকল্পনা করছেন, কীভাবে এই সুযোগে গ্রহাণুটিকে বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়। এর গঠন, কক্ষপথ, এমনকি পৃথিবীর মহাকর্ষের কারণে এর গতিপথ কতটা বদলে যায়, সেসবও জানা যাবে। অ্যাপোফিস এত কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় পৃথিবীর মহাকর্ষ গ্রহাণুটিকে সামান্য “টেনে” এর গতিপথ বদলে দিতে পারে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, আমরা হয়তো প্রথমবারের মতো একটি গ্রহাণুকে পৃথিবীর মহাকর্ষের প্রভাবে রিয়েল টাইমে পরিবর্তিত হতে দেখবো।

রামসেস মিশন

এই ঘটনাকে ঘিরে ইতোমধ্যেই নতুন মহাকাশ মিশনের পরিকল্পনাও হচ্ছে। ইউরোপীয়ান স্পেস এজেন্সি (ESA) “ রামসেস ” নামে একটি মিশন নিয়ে কাজ শুরু করছে। এই মিশনের লক্ষ্য হবে গ্রহাণুটির গঠন, ঘূর্ণন এবং পৃথিবীর মহাকর্ষীয় প্রভাব খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করা। মহাবিশ্ব মাঝে মাঝে আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা একটি শান্ত, স্থির পৃথিবীতে বাস করলেও চারপাশের মহাশূন্য মোটেও নিস্তব্ধ নয়। সেখানে এখনো ছুটে চলেছে অসংখ্য মহাজাগতিক বস্তু। অতীতে এরকম অনেক মহাজাগতিক আগন্তুক পৃথিবীতে আঘাত হেনেছে এবং ভবিষ্যতেও আঘাত হানার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আশার কথা হচ্ছে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে মানুষ এখন আগেভাগেই এদের গতিপ্রকৃতি জানতে পারছে।
ভবিষ্যতে পৃথিবীর সাথে কোনো গ্রহাণুর সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠলে তার গতিপথ বদলে দেওয়ার মতো প্রযুক্তিও মানুষ ধীরে ধীরে আয়ত্ত করার চেষ্টা করছে। একসময় যে মহাজাগতিক শিলাখণ্ডকে মানুষ ভয়ের চোখে দেখেছিল, ভবিষ্যতে সেই অ্যাপোফিসই হয়তো পৃথিবী রক্ষা করার প্রযুক্তি শেখার এক বিশাল পরীক্ষাগারে পরিণত হবে।
ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির রামসেস মিশন সম্বন্ধে জানতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন
https://www.esa.int/Space_Safety/Planetary_Defence/Ramses_ESA_s_mission_to_asteroid_Apophis

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।