‘পরিবার’ শব্দটি শুনলে আপনার চোখের সামনে কাদের ছবি ভেসে ওঠে? হয়তো আপনার বাবা-মা, ভাই-বোন, দাদা-দাদি, নানা-নানি এবং খুব কাছের কয়েকজন চাচা-মামা বা খালা-ফুপু। একটু গভীরে গেলে হয়তো আপনি আপনার পরদাদা বা পরনানির নাম পর্যন্ত বলতে পারবেন। কিন্তু এর বাইরে? তার আগের প্রজন্মের মানুষদের কথা আমরা কয়জনই বা জানি? আমাদের কাছে আমাদের পরিবার মানে হলো বর্তমান সময়ে বেঁচে থাকা অথবা খুব সম্প্রতি মারা যাওয়া গুটি কয়েক মানুষের একটি ছোট বৃত্ত।
কিন্তু আপনি যদি এই বৃত্তের বাইরে বেরিয়ে গণিত এবং ইতিহাসের চশমা পরে আপনার পরিবারের দিকে তাকান, তবে এমন এক বিস্ময়কর জগৎ দেখতে পাবেন যা আপনার চিন্তার জগতেই বিশাল এক ধাক্কা দেবে। জনপ্রিয় ব্লগ ‘Wait But Why’-এর প্রতিষ্ঠাতা টিম আরবান ঠিক এই কাজটিই করেছেন। তিনি আমাদের বংশলতিকা বা ‘ফ্যামিলি ট্রি‘ (Family Tree)-এর অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের এক অকল্পনীয় গাণিতিক হিসাব কষে দেখিয়েছেন।
আসুন, সময়ের টাইম মেশিনে চড়ে আমাদের অস্তিত্বের এই বিশাল, জটিল এবং রোমাঞ্চকর গাণিতিক যাত্রায় বেরিয়ে পড়ি।
পর্ব ১: অতীত (আপনার হাজারো পূর্বপুরুষের কথা)
কল্পনা করুন, একটি বিশাল গাছের একদম নিচের দিকের একটি ছোট পাতা হচ্ছেন আপনি। আপনার থেকে এই গাছের শেকড় ধীরে ধীরে মাটির অনেক গভীরে, অর্থাৎ অতীতের দিকে চলে গেছে। এবার আসুন একটু পেছনের দিকে হাঁটা শুরু করি।
আপনার অস্তিত্বের একদম গোড়ায় আছেন দুজন মানুষ, আপনার বাবা এবং মা। তাদের ছাড়া আপনার এই পৃথিবীতে আসার কোনো উপায়ই ছিল না। অর্থাৎ, আপনার ঠিক আগের প্রজন্মে আপনার পূর্বপুরুষের সংখ্যা ২।
এবার তার আগের প্রজন্মের কথা ভাবুন। আপনার বাবার আছেন দুজন বাবা-মা (আপনার দাদা-দাদি) এবং আপনার মায়ের আছেন দুজন বাবা-মা (আপনার নানা-নানি)। অর্থাৎ, আপনার ২ প্রজন্ম আগের পূর্বপুরুষের সংখ্যা ৪ জন। তার আগের প্রজন্মে, এই ৪ জনের প্রত্যেকের আবার দুজন করে বাবা-মা আছেন। অর্থাৎ আপনার ৩ প্রজন্ম আগের পূর্বপুরুষের সংখ্যা ৮ জন (যাদের আমরা পরদাদা-পরদাদি বা পরনানা-পরনানি বলি)।
অঙ্কটা খুব সোজা। প্রতিটি প্রজন্মে, আপনি যত অতীতে যাবেন, আপনার পূর্বপুরুষের সংখ্যা ঠিক দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। আসুন হিসাবটা একটু সামনে এগিয়ে নিই:
- ১ প্রজন্ম আগে: ২ জন (বাবা-মা)
- ২ প্রজন্ম আগে: ৪ জন (দাদা-দাদি, নানা-নানি)
- ৩ প্রজন্ম আগে: ৮ জন (পরদাদা-পরদাদি পর্যায়)
- ৪ প্রজন্ম আগে: ১৬ জন
- ৫ প্রজন্ম আগে: ৩২ জন
এভাবে এগোতে থাকলে, আমরা যদি মাত্র ১২ প্রজন্ম বা মোটামুটি ৩০০ বছর আগে (ধরা যাক, ১৭০০ সালের দিকে) ফিরে যাই, গাণিতিক হিসাব বলছে আপনার পূর্বপুরুষের সংখ্যা ছিল ঠিক ৪,০৯৬ জন!
একটু ভেবে দেখুন তো বিষয়টা! আজ থেকে মাত্র ৩০০ বছর আগে, পৃথিবীর বুকে এমন ৪,০৯৬ জন সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ হেঁটে বেড়াচ্ছিলেন, যাদের সবার রক্ত একটু একটু করে মিশে আজ ‘আপনি’ তৈরি হয়েছেন। এই ৪,০৯৬ জনের মধ্যে হয়তো কেউ ছিলেন কৃষক, কেউ রাজা, কেউ দাস, কেউ বিজ্ঞানী, আবার কেউ হয়তো সাধারণ কোনো নাবিক। এই ৪,০৯৬ জনের মধ্যে যদি একজন মানুষও সেদিন শৈশবে মারা যেতেন, বা অন্য কাউকে বিয়ে করতেন, বা তাদের সন্তান জন্ম নেওয়ার সময় কোনো দুর্ঘটনা ঘটত, তবে ইতিহাসের টাইমলাইন বদলে যেত এবং আজকের এই ‘আপনি’ আর কোনোদিনই পৃথিবীতে আসতেন না!
মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া গাণিতিক প্যারাডক্স!
দ্বিগুণ হওয়ার এই অঙ্কটা শুনে হয়তো খুব সাধারণ মনে হচ্ছে। কিন্তু আপনি যদি এই হিসাবটা আরও পেছনের দিকে চালিয়ে যান, তবে আপনি এক ভয়ংকর গাণিতিক প্যারাডক্স বা ধাঁধার মুখোমুখি হবেন। চলুন আমরা একটু লম্বা লাফ দিই এবং দেখি অতীতে আপনার পূর্বপুরুষের সংখ্যা কত দাঁড়ায়:
- ১৫ প্রজন্ম আগে (প্রায় ৪০০ বছর): ৩২,৭৬৮ জন
- ২০ প্রজন্ম আগে (প্রায় ৫০০ বছর): ১০ লাখ ৪৮ হাজার জন!
- ২৫ প্রজন্ম আগে (প্রায় ৬৫০ বছর): ৩ কোটি ৩৩ লাখের বেশি!
- ৩০ প্রজন্ম আগে (প্রায় ৮০০ বছর, ১২০০ সালের দিকে): ১,০৭,৩৭,৪১,৮২৪ জন (অর্থাৎ ১০০ কোটিরও বেশি)!
- ৪০ প্রজন্ম আগে (প্রায় ১০০০ বছর, ১০০০ সালের দিকে): ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ কোটি মানুষ!
কিন্তু এখানেই বাঁধে সবচেয়ে বড় বিপত্তি। ইতিহাসবিদদের মতে, ১২০০ সালে পুরো পৃথিবীর মোট জনসংখ্যাই ছিল মাত্র ৪০ থেকে ৫০ কোটির মতো। আর ১০০০ সালের দিকে তো পৃথিবীর জনসংখ্যা আরও কম ছিল। তাহলে আপনার একারই ১ লাখ কোটি পূর্বপুরুষ এল কোথা থেকে? পৃথিবীতে তো তখন এত মানুষই ছিল না! গাণিতিক হিসাব তো আর মিথ্যা হতে পারে না, তাহলে সমস্যাটা কোথায়?
ধাঁধার উত্তর: ‘পেডিগ্রি কলাপস‘ (Pedigree Collapse)
এই বিশাল গাণিতিক ধাঁধার একটি চমৎকার বৈজ্ঞানিক উত্তর রয়েছে, যাকে বলা হয় ‘পেডিগ্রি কলাপস’ বা বংশলতিকার সংকোচন।
এর মানে হলো, আপনার ফ্যামিলি ট্রি আসলে ওপরের দিকে গিয়ে শুধু ছড়াতেই থাকে না, বরং একপর্যায়ে গিয়ে তার শাখা-প্রশাখাগুলো আবার নিজেদের মধ্যে মিশে যায় এবং হীরা বা ডায়মন্ডের মতো গুটিয়ে আসে। সহজ কথায়, আপনার পূর্বপুরুষদের মধ্যে অনেকেই আসলে একে অপরের দূরসম্পর্কের আত্মীয় ছিলেন এবং তাদের মধ্যেই বিয়ে হয়েছিল।
ব্যাপারটা একটু ভেঙে বলা যাক। ধরা যাক, আজ থেকে ২০০ বছর আগের আপনার একজন পূর্বপুরুষের নাম ‘রহিম’ এবং আরেকজন পূর্বপুরুষের নাম ‘করিমা’। আপনার ফ্যামিলি ট্রিতে তারা দুজন সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই শাখায় অবস্থান করছেন বলে মনে হলেও, খোঁজ নিলে হয়তো দেখা যেত রহিম এবং করিমা আসলে থার্ড কাজিন (৩য় চাচাতো ভাইবোন) ছিলেন। এর মানে হলো, রহিম এবং করিমার পূর্বপুরুষ আসলে একই ব্যক্তি! ফলে, আপনি যখন আরও অতীতে যাবেন, আপনার ফ্যামিলি ট্রির শাখাগুলো আর দ্বিগুণ হবে না, বরং একই মানুষ আপনার ফ্যামিলি ট্রিতে বারবার ফিরে আসবেন।
পুরো মানব ইতিহাসে এই ঘটনাটি অহরহ ঘটেছে। কয়েকশ বছর আগেও মানুষ খুব বেশি দূরে যাতায়াত করতে পারত না। তারা তাদের নিজ গ্রাম বা গোত্রের ৫-১০ মাইলের আশেপাশেই জীবন কাটাত এবং বিয়ে করত। ফলে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে মানুষ বাধ্য হয়েই নিজের দূরসম্পর্কের আত্মীয়দের বিয়ে করত (যেটা তারা নিজেরাও হয়তো জানত না)। এই পেডিগ্রি কলাপসের কারণেই আমরা যখন হাজার বছর অতীতে যাই, তখন আমাদের পূর্বপুরুষের সংখ্যা ১০০ কোটিতে পৌঁছায় না, বরং সংকুচিত হয়ে পৃথিবীর তৎকালীন আসল জনসংখ্যার সমান হয়ে যায়।
আইডেন্টিক্যাল অ্যানসেস্টর পয়েন্ট (Identical Ancestors Point)
এর সবচেয়ে বড় এবং বিস্ময়কর অর্থ হলো, আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগের কথা চিন্তা করুন। বিজ্ঞানীদের মতে, আপনি যদি মানব ইতিহাসে মোটামুটি ৩ থেকে ৪ হাজার বছর পেছনে যান, তবে এমন একটি বিন্দু পাবেন যাকে বলা হয় ‘Identical Ancestors Point’ বা IAP।
এর মানে হলো, সেই সময় পৃথিবীতে বেঁচে থাকা যেসব মানুষের বংশধর আজ পর্যন্ত টিকে আছে, তারা প্রত্যেকেই বর্তমানে বেঁচে থাকা ৮০০ কোটি মানুষের পূর্বপুরুষ!
অর্থাৎ, প্রাচীন মিশরের ফারাও তুতেনখামেন বা ক্লিওপেট্রা, কিংবা প্রাচীন রোমের জুলিয়াস সিজার, তারা যদি কোনো বংশধর রেখে গিয়ে থাকেন, তবে গাণিতিকভাবে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই আজ তাদের বংশধর। আপনি, আপনার পাশের বাড়ির অচেনা মানুষটি, এমনকি পৃথিবীর অন্য প্রান্তের একজন এস্কিমো, আমরা সবাই একই পূর্বপুরুষের বংশধর।
পর্ব ২: বর্তমান (আপনার কাজিনদের গোলকধাঁধা)
অতীতের হিসাব তো অনেক হলো, এবার আসুন বর্তমানের কথায়। আমাদের কাজিন বা চাচাতো/মামাতো/খালাতো/ফুপাতো ভাইবোনদের হিসাবটা কীভাবে কাজ করে, সেটা we আমরা অনেকেই ঠিকমতো জানি না। টিম আরবান এই বিষয়টিকে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
ইংরেজিতে ‘Cousin’ শব্দটি দিয়ে অনেক ধরনের সম্পর্ক বোঝানো হয়। আসুন এর স্তরগুলো একটু বুঝে নিই:
- ফার্স্ট কাজিন (১ম কাজিন): যাদের সাথে আপনার দাদা-দাদি বা নানা-নানি একই ব্যক্তি। অর্থাৎ আপনার বাবা-মায়ের ভাইবোনের সন্তানরা।
- সেকেন্ড কাজিন (২য় কাজিন): যাদের সাথে আপনার পরদাদা-পরদাদি একই। অর্থাৎ আপনার বাবা-মায়ের ফার্স্ট কাজিনদের সন্তানরা।
- থার্ড কাজিন (৩য় কাজিন): যাদের সাথে আপনার তারও আগের প্রজন্মের (Great-great-grandparents) পূর্বপুরুষ একই।
ইংরেজিতে আরেকটি অদ্ভুত শব্দ ব্যবহার করা হয়, সেটি হলো “Once Removed” বা “একবার অপসারিত”। এর মানে হলো প্রজন্মের পার্থক্য।
ধরা যাক, আপনার ফার্স্ট কাজিনের নাম রতন। রতন আপনার ফার্স্ট কাজিন। এখন রতনের যদি একটি সন্তান হয়, সে কি আপনার সেকেন্ড কাজিন হবে? না! সে হবে আপনার “First cousin once removed” (কারণ সে আপনার ফার্স্ট কাজিনের সন্তান, কিন্তু আপনার চেয়ে এক প্রজন্ম নিচে)। একইভাবে, রতনের সন্তানের যখন সন্তান হবে, সে হবে আপনার “First cousin twice removed”। সেকেন্ড কাজিন তৈরি হবে যখন আপনার সন্তান এবং রতনের সন্তান একে অপরের সাথে খেলবে।
কাজিনদের চমকপ্রদ গণিত: আপনার কতজন কাজিন আছে?
এবার আসুন একটু হিসাব কষে দেখি পৃথিবীতে বর্তমানে আপনার কতজন কাজিন বেঁচে আছে। হিসাবের সুবিধার্থে আমরা ধরে নিই, ঐতিহাসিকভাবে প্রতিটি পরিবারে গড়ে ২ থেকে ৩ জন করে সন্তান বড় হয়ে বিয়ে করেছে এবং তাদের সন্তান হয়েছে।
- ফার্স্ট কাজিন: ৫ থেকে ১৫ জনের মধ্যে।
- সেকেন্ড কাজিন: ২৮ থেকে ৪০ জন।
- থার্ড কাজিন: ২০০ জনের কাছাকাছি।
- ফোর্থ কাজিন: ১,০০০ এর বেশি।
- ফিফথ কাজিন: ৪,৭০০ জন।
- সিক্সথ কাজিন: ৩০,০০০ বা তারও বেশি!
এর মানে কী দাঁড়াচ্ছে?
এর মানে হলো, আপনি যখন প্রতিদিন রাস্তা দিয়ে হাঁটেন, বাসে-ট্রেনে যাতায়াত করেন, কোনো বিশাল কনসার্টে যান বা কোনো বড় শপিংমলে কেনাকাটা করেন, আপনি প্রতিনিয়ত আপনার কোনো না কোনো থার্ড, ফোর্থ বা ফিফথ কাজিনের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন।
টিম আরবান মজার একটি উদাহরণ দিয়েছেন। ধরুন আপনি আপনার পছন্দের মানুষের সাথে ডেটে গেছেন। আপনাদের মনে হচ্ছে আপনারা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি পরিবার থেকে এসেছেন। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, আপনাদের মধ্যে থার্ড বা ফোর্থ কাজিন হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল! আপনারা হয়তো জানেনও না যে, আজ থেকে ১৫০ বা ২০০ বছর আগে আপনাদের দুজনেরই একজন সাধারণ পূর্বপুরুষ ছিলেন।
আমরা সবাই আসলে একটি বিশাল পরিবারের সদস্য, যারা কেবল নিজেদের সম্পর্ক ভুলে গিয়ে একে অপরকে “অচেনা” বলে দাবি করছি। পৃথিবীতে আসলে ‘অচেনা মানুষ’ বলে কেউ নেই, সবাই বড়জোর আমাদের ১৫তম বা ২০তম কাজিন!
পর্ব ৩: ভবিষ্যৎ (আপনার বংশধর এবং ডিএনএ-এর খেলা)
এতক্ষণ আপনি আপনার ফ্যামিলি ট্রির একদম নিচে দাঁড়িয়ে ওপরের দিকে তাকাচ্ছিলেন। এবার আপনি ফ্যামিলি ট্রির একদম চূড়ায় দাঁড়ান এবং নিচের দিকে, অর্থাৎ ভবিষ্যতের দিকে তাকান।
ধরা যাক, আপনি বিয়ে করলেন এবং আপনার ৩ জন সন্তান হলো। আপনি তাদের বড় করলেন, তারা আপনার চোখের সামনে ঘুরে বেড়ায়। এই ৩ জন আপনার খুব কাছের মানুষ। এবার ধরুন, আপনার এই ৩ সন্তানের প্রত্যেকের আবার ৩ জন করে সন্তান হলো। অর্থাৎ আপনার নাতি-নাতনি হলো ৯ জন। আপনি হয়তো আপনার বৃদ্ধ বয়সে এই ৯ জনকে দেখে যেতে পারবেন।
কিন্তু এরপর কী হবে? আপনি মারা যাওয়ার পর এই গুণিতক হারে আপনার বংশধররা বাড়তে থাকবে।
- আপনার প্রপৌত্র (Great-grandchildren) হবে: ২৭ জন।
- তার পরের প্রজন্মে: ৮১ জন।
- তার পরের প্রজন্মে: ২৪৩ জন।
এভাবে যদি মাত্র কয়েকশ বছর পার হয়ে যায়, তবে পৃথিবীতে আপনার বংশধরের সংখ্যা কী দাঁড়াবে জানেন? ৪০০ বা ৫০০ বছর পর, পৃথিবীতে এমন হাজার হাজার বা লাখ লাখ মানুষ ঘুরে বেড়াবে, যারা আপনারই বংশধর!
জিনের (DNA) বিভাজন এবং এক নির্মম সত্য
ভবিষ্যতের কথা ভাবলে মনে অদ্ভুত এক প্রশান্তি আসে যে, আমি মারা গেলেও আমার বংশধররা পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে। কিন্তু টিম আরবান এখানে বিজ্ঞানের এক নির্মম সত্য তুলে ধরেছেন।
আমরা জানি যে, একজন মানুষ তার বাবা এবং মা দুজনের কাছ থেকেই ৫০% করে ডিএনএ (DNA) বা জিন পায়। এবার হিসাবটা দেখুন:
- আপনার সন্তান: ৫০% ডিএনএ বহন করছে।
- আপনার নাতি-নাতনি: ২৫% ডিএনএ বহন করছে।
- আপনার প্রপৌত্র: ১২.৫% ডিএনএ বহন করছে।
- দশম প্রজন্ম: ০.০৯% ডিএনএ!
এর মানে কী? এর মানে হলো, আজ থেকে মাত্র ৩০০ বছর পর পৃথিবীতে আপনার যে হাজার হাজার বংশধর ঘুরে বেড়াবে, তারা আপনার সরাসরি বংশধর হলেও তাদের শরীরে আপনার বলতে আর প্রায় কিছুই অবশিষ্ট থাকবে ভগ্নাংশটুকু ছাড়া। আপনার জিনগত অস্তিত্ব সেই বিশাল জনসমুদ্রে এক ফোঁটা পানির মতো বিলীন হয়ে যাবে।
ভবিষ্যতের সেই লাখো বংশধরের কাছে আপনি হবেন তাদের হাজারো প্রাচীন পূর্বপুরুষের মধ্যে কেবলই একজন অচেনা নাম (অথবা হয়তো তারা আপনার নামটিও জানবে না)। আজ আপনি যেমন ১৭০০ সালের আপনার সেই ৪,০৯৬ জন পূর্বপুরুষের কারো নামই জানেন না, ভবিষ্যতের কাছে আপনিও ঠিক তেমনি একজন হয়ে যাবেন। আমাদের জীবন আসলে জিনের (Gene) প্রবাহের একটি অস্থায়ী বাহক বা ট্রানজিট পয়েন্ট ছাড়া আর কিছুই নয়।
টিম আরবানের এই দীর্ঘ ও বিস্তারিত প্রবন্ধটি শুধু নিছক কিছু অঙ্ক বা পরিসংখ্যানের খেলা নয়। এটি মানবজাতির অস্তিত্বের এক গভীর এবং সুন্দর দর্শন।
আমরা মানুষরা যুগে যুগে নিজেদের ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, জাতি এবং ভৌগোলিক সীমানায় বিভক্ত করেছি। আমরা একে অপরের সাথে যুদ্ধ করেছি, অন্যকে “ভিনদেশী” বা “অচেনা” ভেবে দূরে ঠেলে দিয়েছি। কিন্তু গণিত এবং বিজ্ঞান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, এই সব বিভেদ আসলে আমাদের নিজেদের তৈরি করা এক মিথ্যা মায়া।
রক্তের সম্পর্কের দিক থেকে আমরা কেউ আলাদা নই। সমগ্র মানবজাতি আসলে এক বিশাল, জট পাকানো, প্রাচীন এবং অদ্ভুত সুন্দর এক পরিবারেরই অংশ। আমাদের সবার শেকড় একই জায়গায় গাঁথা এবং আমাদের সবার ভবিষ্যৎ একই ডালে বিকশিত হচ্ছে।
তাই পরের বার যখন রাস্তায়, বাসে বা অন্য কোনো দেশে সম্পূর্ণ অচেনা কোনো মানুষের চোখের দিকে তাকাবেন, মনে মনে একবার ভাবতেই পারেন, “কেমন আছ, আমার দূরসম্পর্কের কাজিন?”
