Homeমহাকাশ বিজ্ঞানব্ল্যাক হোলের ঝলক!

ব্ল্যাক হোলের ঝলক!

মহাকাশ বিজ্ঞানের একটি অলিখিত নিয়ম হলো, ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর থেকে কোনো আলো বের হতে পারে না। এর মহাকর্ষ এতই প্রচণ্ড যে, আলো একবার এর ভেতরে ঢুকে গেলে আর কখনোই ফিরে আসতে পারে না। আর যদি মহাকাশে দুটি ব্ল্যাক হোলের মধ্যে সংঘর্ষ হয়, তবে সেটি হয় মহাবিশ্বের অন্যতম চরম আর ধ্বংসাত্মক একটি ঘটনা। কিন্তু সেই প্রলয়ংকরী ঘটনাটিও ঘটে চরম অন্ধকারে, কোনো রকম আলোর ঝলকানি ছাড়াই।

কিন্তু সম্প্রতি এই চিরচেনা নিয়মে এক বিশাল ধাক্কা লেগেছে। পৃথিবীর টেলিস্কোপগুলোতে হঠাৎ করেই ধরা পড়েছে ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষ থেকে আসা এক তীব্র আলোর ঝলক! বিজ্ঞানীরা রীতিমতো বিস্ময়ে হতবাক। নিকষ কালো দুটি দানবের মিলনে কীভাবে জন্ম নিল এই তীব্র আলো? এই রহস্যের জট খুলতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন মহাকাশের এক অদ্ভুত ও জটিল পরিবেশের কথা। আসুন, একটি বৈজ্ঞানিক গোয়েন্দা গল্পের মতো করে এই আবিষ্কারের আদ্যোপান্ত জেনে নিই।

অন্ধকারের বুকে মহাকর্ষের ঢেউ

পুরো ঘটনাটি বুঝতে হলে আমাদের প্রথমে জানতে হবে বিজ্ঞানীরা কীভাবে এই সংঘর্ষের কথা জানতে পারেন। ২০১৫ সালের আগে মানুষের মহাকাশ দেখার একমাত্র উপায় ছিল আলো বা বিভিন্ন ধরনের তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ (যেমন রেডিও ওয়েব, এক্স-রে)। কিন্তু ব্ল্যাক হোল তো আলো ছড়ায় না! তাহলে তাদের সংঘর্ষ বিজ্ঞানীরা দেখবেন কীভাবে?

এখানেই কাজে লাগে আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব। তিনি বলেছিলেন, মহাকাশে যদি খুব ভারী দুটি বস্তু একে অপরের চারপাশে প্রবল বেগে ঘুরতে থাকে এবং শেষে ধাক্কা খায়, তবে তারা মহাকাশের বুননে (Space-time) এক ধরনের ঢেউ বা তরঙ্গের সৃষ্টি করে। ঠিক যেমন পুকুরে ঢিল ছুঁড়লে ঢেউ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই ঢেউগুলোকে বলা হয় ‘মহাকর্ষীয় তরঙ্গ‘ (Gravitational wave)।

২০১৫ সালে ‘লাইগো‘ (LIGO) মানমন্দির প্রথমবারের মতো এই তরঙ্গ শনাক্ত করে ইতিহাস গড়েছিল। এরপর থেকে লাইগো, ভার্গো (Virgo) এবং কাগরা (KAGRA) মানমন্দির মিলে এমন শত শত মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সন্ধান পেয়েছে। এগুলোর প্রায় সবই ছিল দুটি ব্ল্যাক হোলের অন্ধকার সংঘর্ষের গল্প। বিজ্ঞানীরা অনেক চেষ্টা করেছেন এই তরঙ্গগুলোর সাথে কোনো আলোর ঝলক বা ‘ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক কাউন্টারপার্ট’ খুঁজে পেতে। কিন্তু প্রতিবারই তারা হতাশ হয়েছেন। ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষ মানেই যেন শুধু অন্ধকার আর মহাকর্ষের কাঁপুনি।

গ্যালাক্সির কেন্দ্রের সেই ‘মরণ-ফাঁদ’

এই রহস্যের গভীরে যাওয়ার আগে আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্র সম্পর্কে একটু জানতে হবে। আমাদের গ্যালাক্সি বা ছায়াপথসহ মহাবিশ্বের প্রায় প্রতিটি বড় গ্যালাক্সির কেন্দ্রেই একটি ‘সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল‘ বা অতিভরের কৃষ্ণগহ্বর থাকে। এগুলো সূর্যের চেয়ে কয়েক মিলিয়ন বা বিলিয়ন গুণ ভারী হতে পারে। এই দৈত্যাকার ব্ল্যাক হোলগুলোর চারপাশে গ্যাস, ধুলাবালি এবং নক্ষত্রের ধ্বংসাবশেষের একটি বিশাল এবং ঘন চাকতি প্রচণ্ড বেগে ঘুরতে থাকে। এই ঘূর্ণায়মান চাকতিটিকে বলা হয় ‘অ্যাক্রিশন ডিস্ক‘ (Accretion disk)।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই অ্যাক্রিশন ডিস্কটি আসলে ছোট ছোট ব্ল্যাক হোলদের জন্য এক ধরনের ‘মরণ-ফাঁদ’ বা মাইগ্রেশন ট্র্যাপ (Migration Trap)। এই চাকতির গ্যাস এবং ধুলার ঘনত্ব এতই বেশি যে তা অনেকটা আঠালো মধুর মতো কাজ করে। যখন কোনো ছোট বা মাঝারি ব্ল্যাক হোল এই চাকতির ভেতর দিয়ে ঘোরে, তখন গ্যাসের প্রচণ্ড বাধায় (Gas drag) তার গতি ধীরে ধীরে কমতে থাকে এবং সে ক্রমশ সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের কেন্দ্রের দিকে এগোতে থাকে।

এভাবে চাকতির একটি নির্দিষ্ট জায়গায় (যেখানে মহাকর্ষ এবং গ্যাসের বাধা সমান হয়ে যায়) এসে অনেকগুলো ছোট ব্ল্যাক হোল জড়ো হয়ে যায়। একে বলা যায় ব্ল্যাক হোলদের ‘ট্রাফিক জ্যাম’! আর এতগুলো দানব যখন এক জায়গায় জড়ো হয়, তখন একে অপরের সাথে ধাক্কা খাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়।

LIGO–Virgo–KAGRA দ্বারা শনাক্ত মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সংকেতের ত্রিভুজীকরণ এবং গামা-রে বিস্ফোরণের অবস্থান। (Zhang, Astrophysical Journal Letters*, ২০২৬)

নভেম্বর ২০২৪: নিয়ম ভাঙার সেই দিনটি

সব হিসাব বদলে গেল ২৫ নভেম্বর ২০২৪ সালে. সেদিন পৃথিবী থেকে প্রায় ৪২০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে ঘটা এক ভয়ংকর সংঘর্ষের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ল লাইগো এবং ভার্গো ডিটেক্টরে। বিজ্ঞানীরা এই ঘটনার নাম দিলেন ‘S241125n’

তরঙ্গটি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারলেন, এটি ছিল দুটি মাঝারি আকারের ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষ। ধাক্কা খেয়ে এরা সূর্যের চেয়ে প্রায় ১৫০ গুণ বেশি ভারী একটি নতুন এবং অতিকায় ব্ল্যাক হোলে পরিণত হয়েছে। এ পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। কিন্তু আসল চমকটি এল ঠিক ১১ সেকেন্ড পর!

মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সংকেত আসার ঠিক ১১ সেকেন্ড পরই পৃথিবীর এক্স-রে এবং গামা-রশ্মি টেলিস্কোপগুলোতে ধরা পড়ল এক তীব্র আলোর ঝলক। আলোর উৎসটি ছিল মহাকাশের ঠিক সেই জায়গায়, যেখান থেকে ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষের ঢেউটি এসেছিল। বিজ্ঞানীরা অঙ্ক কষে দেখলেন, মহাকাশের এত বিশাল বিস্তৃতির মধ্যে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘটনা ঠিক একই জায়গায় এবং একই সময়ে কাকতালীয়ভাবে ঘটার সম্ভাবনা ৩০ বছরে মাত্র একবার! অর্থাৎ, কোনো সন্দেহ নেই, ব্ল্যাক হোল দুটো এক হওয়ার কারণেই এই বিপুল আলোর বিস্ফোরণ ঘটেছে।

‘নেটাল কিক’ বা জন্মকালীন ধাক্কা

চীনের ‘ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’-এর জ্যোতির্বিজ্ঞানী শু-রুই ঝাং এবং তার দল এই রহস্যের এক চমৎকার সমাধান দিয়েছেন। তারা বলছেন, আলো এল কোথা থেকে—এর উত্তর লুকিয়ে আছে পদার্থবিজ্ঞানের একটি অদ্ভুত নিয়মে, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘নেটাল কিক’ (Natal kick) বা জন্মকালীন ধাক্কা।

যখন দুটি অসমান ভর বা গতির ব্ল্যাক হোল ধাক্কা খায়, তখন তাদের মিলনের ফলে যে নতুন ব্ল্যাক হোলটি তৈরি হয়, সেটি একদম স্থির থাকে না। ভরবেগের সংরক্ষণশীলতার কারণে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ একদিকে প্রচণ্ড বেগে বেরিয়ে যায় এবং তার ধাক্কায় নতুন জন্ম নেওয়া ব্ল্যাক হোলটি বন্দুকের গুলির মতো উল্টো দিকে ছিটকে যায়। একেই বলা হয় নেটাল কিক।

অন্ধকারের বুকে আলোর ফোয়ারা

একটু কল্পনা করুন। বিশাল গ্যাসীয় চাকতির (অ্যাক্রিশন ডিস্ক) ভেতরে দুটি ব্ল্যাক হোলের মিলন হলো। জন্ম নিল নতুন একটি ব্ল্যাক হোল, আর জন্মের সাথে সাথেই ‘নেটাল কিক’ খেয়ে সেটি প্রচণ্ড বেগে ছিটকে গেল।

ছিটকে যাওয়ার সময় এই নতুন ব্ল্যাক হোলটি গিয়ে পড়ল সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের চারপাশের সেই ঘন গ্যাস এবং ধুলার মেঘের ভেতরে। একে তো প্রচণ্ড গতি, তার ওপর চারদিকে অফুরন্ত খাবার (গ্যাস)! ব্ল্যাক হোলটি তখন পাগলের মতো এই গ্যাস গিলতে শুরু করল।

যেকোনো জিনিস যখন ব্ল্যাক হোলের ভেতরে প্রবল বেগে প্রবেশ করে, তখন প্রচণ্ড মহাকর্ষ এবং বস্তুগুলোর নিজেদের মধ্যকার ঘর্ষণে তা অকল্পনীয় মাত্রায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এই তাপ এতই বেশি যে তা থেকে এক্স-রে এবং গামা রশ্মির মতো উচ্চ শক্তির বিকিরণ তৈরি হয়। শুধু তাই নয়, ব্ল্যাক হোল একসাথে খুব বেশি খাবার গিলতে পারে না। ফলে কিছু গ্যাস ব্ল্যাক হোলের দুই মেরু দিয়ে প্রচণ্ড বেগে আলোর ফোয়ারা বা ‘অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জেট’ (Astrophysical jet) হিসেবে মহাকাশে ছুটে বেরিয়ে আসে।

ঠিক এই ঘটনাটিই ঘটেছিল সেদিন! নতুন ব্ল্যাক হোলটি যখন ঘন গ্যাসের ভেতর দিয়ে ছুটে যাচ্ছিল এবং গ্যাস গিলছিল, তখন তার মেরু থেকে ছিটকে বের হওয়া সেই গামা রশ্মির তীব্র আলোর ঝলকটিই ৪২০ কোটি বছর পাড়ি দিয়ে আমাদের পৃথিবীর টেলিস্কোপে এসে ধরা পড়ে।

গল্পের শেষ এখানেই নয়: ভবিষ্যতের পুনরাবৃত্তি

সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ব্যাপার কী জানেন? বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই গল্পের শেষ এখানেই নয়। ধাক্কা খেয়ে তৈরি হওয়া নতুন ব্ল্যাক হোলটি এখনো সেই সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের বিশাল মহাকর্ষের বাঁধনেই আটকে আছে। এটি এখনো সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলটিকে কেন্দ্র করে ঘুরছে।

এর কক্ষপথটি এমন হতে পারে যে, এটি গ্যাসীয় চাকতিটি থেকে কিছুটা বেরিয়ে গিয়ে কয়েক বছর পর আবারও সেই গ্যাসীয় চাকতির ভেতর দিয়ে প্রবল বেগে ভেদ করে যাবে। আর যখনই এমনটা ঘটবে, এটি আবারও প্রচুর গ্যাস গিলবে এবং আমরা হয়তো টেলিস্কোপে আবারও নতুন কোনো আলোর ঝলক বা ফ্লেয়ার (Flare) দেখতে পাব! বিজ্ঞানীরা এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন সেই ‘দ্বিতীয় ঝলক’-এর জন্য, যা তাদের এই তত্ত্বকে ১০০ ভাগ নিখুঁতভাবে প্রমাণ করবে।

মহাকাশ গবেষণায় এক নতুন যুগের সূচনা

এই আবিষ্কারটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের জগতে রীতিমতো হইচই ফেলে দিয়েছে। একে বলা হচ্ছে ‘মাল্টি-ম্যাসেঞ্জার অ্যাস্ট্রোনমি’ (Multi-messenger astronomy)-এর এক বিশাল সাফল্য। এর মানে হলো, আমরা এখন মহাকাশের কোনো ঘটনাকে শুধু আলো দিয়ে দেখছি না, বরং মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মাধ্যমে সেটি ‘শুনতেও’ পাচ্ছি।

এতদিন বিজ্ঞানীরা ভাবতেন ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষ কেবলই একটি নীরব, অন্ধকার ঘটনা। কিন্তু এখন তারা জানতে পারলেন, গ্যালাক্সির কেন্দ্রের এই চরম বিশৃঙ্খল পরিবেশে যখন এমন ঘটনা ঘটে, তখন মহাবিশ্ব তার নিজস্ব উপায়ে আলোর আতশবাজি তৈরি করে।

এই গবেষণা শুধু একটি রহস্যেরই সমাধান করেনি, বরং ভবিষ্যতের বিজ্ঞানীদের জন্য নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। এখন থেকে যখনই মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সংকেত আসবে, বিজ্ঞানীরা সাথে সাথেই টেলিস্কোপ ঘুরিয়ে খুঁজবেন সেই অদ্ভুত আলোর ঝলক, যা হয়তো লুকিয়ে আছে দূরের কোনো গ্যালাক্সির অন্ধকার হৃদয়ে। মহাবিশ্ব যে আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি অদ্ভুত এবং রোমাঞ্চকর, এই ঘটনাটি তারই এক জ্বলন্ত প্রমাণ।

Raisul Sohan
Raisul Sohan
বিজ্ঞান অনুরাগী। শখের বিজ্ঞান লেখক।
RELATED ARTICLES

Most Popular