Homeমহাকাশ বিজ্ঞানঅ্যাপোলো ১৩ : ব্যর্থতার মাঝেও সাফল্যের ইতিহাস

অ্যাপোলো ১৩ : ব্যর্থতার মাঝেও সাফল্যের ইতিহাস

উনিশশো সত্তরের এপ্রিল মাস। মহাকাশ অভিযানের এক উত্তেজনাপূর্ণ অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে সময় এগিয়ে চলেছে। এর আগের বছরেই অ্যাপোলো ১১ এর অভিযানে মানুষ প্রথমবারের মতো চাঁদের মাটিতে পা রেখেছে। তারপর দ্বিতীয়বার অ্যাপোলো ১২ চন্দ্রাভিযানও সফল হয়েছে। দুই ঐতিহাসিক সাফল্যের পর নাসা আবারো মানুষকে চাঁদে পাঠানোর প্রস্তুতি নিল। এই নতুন অভিযানের নাম, অ্যাপোলো ১৩।

১১ এপ্রিল, উনিশশো সত্তর। বিশাল স্যাটার্ন ফাইভ রকেটের গর্জনে কেনেডি স্পেস সেন্টার আবারো কেঁপে উঠল। আগুনের লেলিহান শিখা আর ধোঁয়ার মেঘ ভেদ করে মহাকাশের দিকে উড়ে গেল অ্যাপোলো ১৩। এর ভেতরে ছিলেন তিন নভোচারী – জিম লাভেল, জ্যাক সুইগার্ট এবং ফ্রেড হেইস। তাঁদের লক্ষ্য ছিল চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণ করে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো।

যাত্রার প্রথম কয়েকদিন সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল। মহাকাশযান ধীরে ধীরে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল, সামনে এগিয়ে আসছিল চাঁদের রহস্যময় জগৎ। তিন নভোচারীও ছিলেন আত্মবিশ্বাসী ও উৎফুল্ল। কিন্তু মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে কখনো কখনো এমন মুহূর্ত আসে, যখন একটি ছোট ত্রুটি মুহূর্তেই সব পরিকল্পনা বদলে দেয়।

১৩  এপ্রিল উনিশশো সত্তর। পৃথিবী থেকে প্রায় তিন লাখ কিলোমিটার দূরে অ্যাপোলো ১৩  তখন চাঁদের পথে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। এর মধ্যে হঠাৎ করেই মহাকাশযানের ভেতরে এক তীব্র শব্দ শোনা গেল – একটি বিস্ফোরণ হলো। মুহূর্তের মধ্যে সতর্কবার্তার আলো জ্বলে উঠল। অক্সিজেনের একটি ট্যাংক ভয়াবহভাবে বিস্ফোরিত হয়েছে। এর ফলে মহাকাশযানের বিদ্যুৎ ও জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থাগুলো দ্রুত অচল হয়ে পড়তে শুরু করল। এই সংকটময় মুহূর্তে কমান্ডার জিম লাভেল পৃথিবীতে বার্তা পাঠালেন,‌ “হিউস্টন, উই হ্যাভ এ প্রবলেম”।

এই সংক্ষিপ্ত বাক্যটি পরে মহাকাশ ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত উক্তি হয়ে যায়। বিস্ফোরণের পর খুব দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে গেল, চাঁদে অবতরণের পরিকল্পনা আর সম্ভব নয়। এখন একটাই লক্ষ্য: তিন নভোচারীকে জীবিত অবস্থায় পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা।

মহাকাশযানের কমান্ড মডিউল  ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নভোচারীরা আশ্রয় নিলেন চাঁদে অবতরণের জন্য তৈরি করা ছোট লুনার মডিউলের ভেতরে। সেটিই হয়ে উঠল তাদের অস্থায়ী জীবনরক্ষাকারী লাইফবোট। অন্যদিকে হিউস্টনের নিয়ন্ত্রণকক্ষে বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা এক মুহূর্তের জন্যও বিশ্রাম নিলেন না। সীমিত বিদ্যুৎ, অল্প অক্সিজেন এবং কমে আসা পানির মজুত নিয়ে কীভাবে এই মহাকাশযানকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা যায় সেই হিসেব চলতে লাগল দিনরাত।

এই সময়টাই ছিল সবচেয়ে নাটকীয়। মহাকাশযানের ভেতরে তাপমাত্রা ক্রমে কমে যাচ্ছিল। পানি ও বিদ্যুতের ব্যবহার কঠোরভাবে সীমিত করা হয়েছিল। একই সঙ্গে আরেকটি বিপদ দেখা দিল। লুনার মডিউলের ভেতরে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যেতে শুরু করল। সমস্যাটা ছিল অদ্ভুত। লুনার মডিউলের বায়ু পরিশোধন যন্ত্রে গোল ফিল্টার লাগে, অথচ নভোচারীদের হাতে ছিল কমান্ড মডিউলের চৌকো ফিল্টার। তখন নিয়ন্ত্রণকক্ষের প্রকৌশলীদের পরামর্শে নভোচারীরা প্লাস্টিকের ব্যাগ, কাগজ আর আঠালো টেপ দিয়ে তৈরি করলেন একটি অস্থায়ী ফিল্টার ব্যবস্থা। এই সহজ কিন্তু বুদ্ধিদীপ্ত সমাধানই শেষ পর্যন্ত লুনার মডিউলের ভেতরের বাতাসকে নিরাপদ রাখে এবং নভোচারীদের বাঁচিয়ে দেয়।

একই সময়ে চাঁদের মহাকর্ষকে কাজে লাগিয়ে মহাকাশযানকে পৃথিবীর দিকে ফিরিয়ে আনার একটি বিশেষ কক্ষপথ নির্ধারণ করা হয়। এর নাম, ফ্রি রিটার্ন ট্রেজেক্টরি। এটা এমন একটি পথ, যেখানে চাঁদের পাশ ঘুরে মহাকাশযান স্বাভাবিকভাবেই আবার পৃথিবীর টানে ফিরে আসে।

টানা কয়েকদিনের উত্তেজনা আর অনিশ্চয়তার পর অবশেষে ১৭ এপ্রিল, উনিশশো সত্তর মহাকাশযানটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করল। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ নিঃশ্বাস বন্ধ করে সেই মুহূর্তের অপেক্ষায় ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্যারাসুটের মাধ্যমে ক্যাপসুলটি প্রশান্ত মহাসাগরের পানিতে নিরাপদে অবতরণ করল।
তিন নভোচারী জীবিত অবস্থায় পৃথিবীতে ফিরে এলেন।

পৃথিবীতে ফেরার শেষ মুহূর্তে নভোচারীদের সামনে ছিল একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বিস্ফোরণের পর লুনার মডিউলই তাদের ‘লাইফবোট’ হয়ে উঠেছিল, কিন্তু নিরাপদে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করতে পারে শুধু কমান্ড মডিউল, কারণ সেখানেই রয়েছে তাপরোধী ঢাল। তাই তারা আবার কমান্ড মডিউলে ফিরে আসেন এবং চারদিনের আশ্রয় লুনার মডিউলটিকে মহাকাশেই ছেড়ে দেন।

তবে এর সঙ্গে ছিল আরেকটি ঝুঁকি। কমান্ড মডিউলের বেশিরভাগ সিস্টেম দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল, যাতে অক্সিজেন ও বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করা যায়। ফলে ফিরে এসে সেটিকে ধীরে ধীরে পুনরায় চালু করতে হয়, অত্যন্ত সতর্কভাবে সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে, পুনঃপ্রবেশের জন্য নভোচারীদের প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সেখানে যথেষ্ট ছিল, আর সেই সূক্ষ্ম পরিকল্পনাই শেষ পর্যন্ত প্রচণ্ড তাপ ও চাপ পেরিয়ে তিন নভোচারীকে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনে।

অ্যাপোলো ১৩  চাঁদে অবতরণ করতে পারেনি। তাই কাগজে-কলমে এটি একটি ব্যর্থ অভিযান। কিন্তু মানব ইতিহাসে এটি এক অসাধারণ সাফল্যের গল্প। কারণ ভয়াবহ বিপদের মধ্যেও মানুষ তার বুদ্ধি, সাহস, সহযোগিতা দিয়ে এবং মাথা ঠান্ডা রেখে অসম্ভবকে সম্ভব করেছিল।

এই কারণেই মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে অ্যাপোলো ১৩ কে বলা হয়, ব্যর্থতার মধ্যেও সাফল্যের গল্প।
Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular