আমাদের বাসভূমি পৃথিবীর বয়স প্রায় সাড়ে চার বিলিয়ন বছর। এই সংখ্যা এতই বিশাল যে মানুষের পক্ষে সেটা কল্পনা করাই কঠিন। যদি আমরা পৃথিবীর পুরো ইতিহাসকে একটি বিশাল বইয়ের সঙ্গে তুলনা করি, তবে সেখানে মানুষের ইতিহাস হবে শেষ পাতার এক কোণায় লেখা কয়েকটি বাক্য মাত্র। হিসেব করে দেখা যায়, মানুষের উপস্থিতি পৃথিবীর সমগ্র ইতিহাসের মাত্র ০.০০০৪ ভাগ সময় জুড়ে, অর্থাৎ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।
অগ্নিগর্ভ সূচনা
আমাদের এই গ্রহের গল্প শুরু হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পৃথিবী দিয়ে। একটি অগ্নিগর্ভ, অস্থির এবং বিপজ্জনক জগত দিয়ে। প্রায় ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর আগে সৌরজগতের জন্মের সময় সূর্যের চারপাশে ঘুরতে থাকা ধূলিকণা, গ্যাস এবং শিলাখণ্ড ধীরে ধীরে একত্রিত হতে থাকে। অসংখ্য সংঘর্ষ আর মহাকর্ষীয় আকর্ষণের মাধ্যমে তৈরি হয় নবীন পৃথিবী।
এই সময় পৃথিবীর পৃষ্ঠ ছিল গলিত শিলায় ভরা এক উত্তপ্ত গোলক। চারদিকে আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ, উল্কাপিণ্ডের বৃষ্টি, আর বিষাক্ত গ্যাসে ভরা বায়ুমণ্ডল। আজকের শান্ত নীল পৃথিবীর সঙ্গে সেই পৃথিবীর কোনো মিল ছিল না।
প্রায় ৪.৪ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর পৃষ্ঠ ধীরে ধীরে ঠান্ডা হতে শুরু করে। বাষ্প ঘনীভূত হয়ে তৈরি হয় প্রথম মেঘ, আর অগণিত বছর ধরে চলা বৃষ্টিতে জন্ম নেয় পৃথিবীর প্রথম মহাসাগর। এই মহাসাগরই ছিল জীবনের প্রথম আশ্রয়।
জীবনের প্রথম আলো
প্রায় ৩.৫ থেকে ৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর মহাসাগরের গভীরে জন্ম নেয় প্রথম জীব – ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এককোষী জীব বা মাইক্রোব। এরা ছিল অত্যন্ত সরল জীব, কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে এদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
এদের মধ্যে কিছু কিছু জীব সূর্যের আলো ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদন করতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা ধীরে ধীরে বাতাসে অক্সিজেন ছাড়তে থাকে। কোটি কোটি বছর ধরে সেই অক্সিজেন জমে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে বদলে দেয়। এই ঘটনাকে বিজ্ঞানীরা বলেন, “গ্রেট অক্সিজেনেশন ইভেন্ট”।
এই পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর আকাশে তৈরি হয় ওজোন স্তর, যেটা সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে জীবজগতকে রক্ষা করতে শুরু করে। ফলে জটিল জীবনের বিকাশের পথ খুলে যায়।
বহুকোষী জীবের উত্থান
জীবনের পরবর্তী বড় ধাপ আসে অনেক পরে। প্রায় ৬০০ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে দেখা যায় জটিল বহুকোষী জীবের বিস্তার। প্রাচীন সমুদ্র ভরে ওঠে অদ্ভুত সব নরমদেহী প্রাণীতে। এরপর প্রায় ৫৪০ মিলিয়ন বছর আগে আসে এক নাটকীয় পরিবর্তন। একে বলা হয়, “ক্যামব্রিয়ান বিস্ফোরণ”। এই সময় পৃথিবীতে হঠাৎ করেই নানা ধরনের জটিল প্রাণীর আবির্ভাব ঘটে। জীবজগতের বৈচিত্র্য দ্রুত বেড়ে যায়। এই সময়েই দেখা যায় ট্রাইলোবাইটসহ অনেক পরিচিত সামুদ্রিক প্রাণীর পূর্বপুরুষ। পরে উদ্ভিদ ও প্রাণীরা ধীরে ধীরে স্থলভাগে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। পৃথিবীতে বনভূমি জন্ম নেয়, পোকামাকড়, উভচর প্রাণী এবং পরে সরীসৃপদের আবির্ভাব ঘটে।
ডাইনোসরদের রাজত্ব
প্রায় ২৩ কোটি বছর আগে পৃথিবীর ইতিহাসে শুরু হয় ডাইনোসরদের যুগ। এই বিশাল প্রাণীরা স্থলভাগের প্রধান শাসক হয়ে ওঠে এবং প্রায় ১৬ কোটি বছর ধরে তারা পৃথিবী জুড়ে রাজত্ব করে। এই সময়েই প্রথম পাখির উদ্ভব ঘটে এবং প্রাথমিক স্তন্যপায়ী প্রাণীরাও আবির্ভূত হয়। তবে তারা তখনও ছিল ছোট এবং গুরুত্বহীন।
মহাবিপর্যয় ও নতুন যুগ
প্রায় ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপের কাছে এক বিশাল উল্কাপিণ্ড পৃথিবীতে আঘাত হানে। এর ফলে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়- বিশাল অগ্নিকাণ্ড, ধূলিকণায় আচ্ছন্ন আকাশ, এবং দীর্ঘস্থায়ী শীতলতা। এই বিপর্যয়ের ফলেই পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায় ডাইনোসরদের অধিকাংশ প্রজাতি। ডাইনোসরদের পতনের পর স্তন্যপায়ী প্রাণীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়। ধীরে ধীরে তারা পৃথিবীর নানা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন রূপে বিবর্তিত হয়।
মানুষের আবির্ভাব
ডাইনোসরদের বিলুপ্তির বহু পরে, মাত্র প্রায় দুই লক্ষ বছর আগে, আফ্রিকার কোনো এক সাভানা অঞ্চলে আবির্ভূত হয় আধুনিক মানুষ – হোমো স্যাপিয়েন্স। ভূতাত্ত্বিক সময়ের হিসেবে এটি প্রায় এক মুহূর্ত আগের ঘটনা।
মানুষ কৃষি আবিষ্কার করেছে মাত্র ১০ হাজার বছর আগে। শিল্পবিপ্লব শুরু হয়েছে মাত্র দুইশো বছর আগে। আর মহাকাশে মানুষের পদচিহ্ন পড়েছে মাত্র অর্ধশতাব্দী আগে। অর্থাৎ মানবসভ্যতার প্রযুক্তিগত বিস্ফোরণ ঘটেছে পৃথিবীর ইতিহাসের একেবারে শেষ মুহূর্তে।
পৃথিবীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
যদি পৃথিবীর পুরো ৪.৫৪ বিলিয়ন বছরের ইতিহাসকে ক্যালেন্ডারের এক বছর হিসেবে ধরা হয়, যেখানে ১ জানুয়ারি পৃথিবীর জন্ম এবং ৩১ ডিসেম্বর বর্তমান সময়, তাহলে এই ঘটনাগুলো এমনভাবে কল্পনা করা যায় –
• ১ জানুয়ারি: পৃথিবীর জন্ম
• মার্চের মাঝামাঝি: প্রথম জীবের আবির্ভাব
• জুন–জুলাই: বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন জমা হতে শুরু
• নভেম্বরের মাঝামাঝি: জটিল বহুকোষী জীবের বিস্তার
• ডিসেম্বরের শুরু: স্থলভাগে উদ্ভিদ ও প্রাণীর বিস্তার
• ডিসেম্বরের মাঝামাঝি: ডাইনোসরদের আবির্ভাব
• ২৫ ডিসেম্বর: ডাইনোসরদের বিলুপ্তি
• ৩১ ডিসেম্বর রাত ১১টা ৫২ মিনিট: মানুষের আবির্ভাব
• ৩১ ডিসেম্বর রাত ১১টা ৫৯ মিনিট: কৃষি, সভ্যতা এবং আধুনিক মানবসমাজের সূচনা
অর্থাৎ পৃথিবীর পুরো বছরের ইতিহাসে মানুষ এসেছে একেবারে শেষ কয়েক মিনিটে, আর আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতা এসেছে শেষ কয়েক সেকেন্ডে।
ক্ষণিকের অতিথি
পৃথিবীর দীর্ঘ ইতিহাসে আমরা শেষ মুহূর্তের অতিথি। তবু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই অতি ক্ষুদ্র সময়ের মধ্যেই মানুষ পৃথিবীকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে, যেটা অন্য কোনো প্রজাতি কখনো পারেনি। মানুষ মহাসাগর পাড়ি দিয়েছে, পর্বত জয় করেছে, মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠিয়েছে, এমনকি অন্য গ্রহেও রোবট পাঠিয়েছে। একই সঙ্গে মানুষের কর্মকাণ্ড পৃথিবীর পরিবেশ, জলবায়ু এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।
পৃথিবীর দীর্ঘ ইতিহাসের তুলনায় আমরা সত্যিই ক্ষণিকের অতিথি। কিন্তু সেই ক্ষণিক উপস্থিতিই আজ এই গ্রহটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে। আর এই কারণেই পৃথিবীর ইতিহাসের শেষ মুহূর্তে মানুষের আগমন – পুরো গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠেছে।
