Homeপ্রকৃতি ও পরিবেশরেইনবো কর্ন: প্রকৃতির এক অদ্ভুত রঙিন সৃষ্টি

রেইনবো কর্ন: প্রকৃতির এক অদ্ভুত রঙিন সৃষ্টি

কর্ন বা ভুট্টা মানেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে হলুদ দানার পরিচিত ছবি। কিন্তু প্রকৃতির ভাণ্ডারে ভুট্টার গল্প এতটা একরঙা নয়। পৃথিবীর নানা প্রান্তে এমন সব ভুট্টা দেখা যায়, যেগুলো যেন রঙের উৎসব – নীল, বেগুনি, লাল, কমলা, এমনকি স্বচ্ছ কাঁচের মতো ঝকঝকে দানা। এই অসাধারণ ভুট্টাগুলোকে অনেক সময় বলা হয় “রেইনবো কর্ন” বা “গ্লাস জেম কর্ন”। এসব রঙিন ভুট্টা কোনো কৃত্রিম রঙের খেলা নয়; নয় কোন জেনেটিক্যালি মডিফাইড অর্গানিজম বা জিএমও। এগুলো প্রকৃতির ভেতরে লুকিয়ে থাকা জিনগত বৈচিত্র্যের এক জীবন্ত উদাহরণ।

রঙের রহস্য কোথায়?

ভুট্টার দানার রং নির্ভর করে মূলত কিছু প্রাকৃতিক রঞ্জকের ওপর। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অ্যান্থোসায়ানিন– যে রঞ্জকটি বেগুনি, নীল বা লাল রং তৈরি করে। আবার ক্যারোটিনয়েড নামের আরেকটি রঞ্জক দেয় হলুদ ও কমলা রং। মজার ব্যাপার হলো, ভুট্টার প্রতিটি দানা আসলে একটি স্বতন্ত্র বীজ। ফলে একই ভুট্টার প্রতিটি দানার জিনগত গঠন একটু একটু করে আলাদা হতে পারে। সেই কারণেই একই ভুট্টার ভেতরে এত রঙের বৈচিত্র্য দেখা যায়, যেন প্রতিটি দানা যেন নিজস্ব পরিচয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

কীভাবে তৈরি হলো এত রঙিন ভুট্টা?

এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের নিয়ে যায় উদ্ভিদ প্রজননের এক চমৎকার জগতে। প্রাচীনকাল থেকেই আমেরিকার আদিবাসীরা ভুট্টার বিভিন্ন রঙের জাত সংরক্ষণ করে আসছিল। তারা লক্ষ্য করেছিল, কিছু ভুট্টার দানা লাল, কিছু নীল, কিছু আবার মিশ্র রঙের। এরপর শুরু হয় বেছে বেছে বীজ রাখা। যেসব ভুট্টার রং সুন্দর বা আলাদা, তার বীজ পরের মৌসুমে রোপণ করা। এই পদ্ধতিকে বলা হয়, সিলেক্টিভ ব্রিডিং বা নির্বাচিত প্রজনন। সময়ের সাথে সাথে কৃষকেরা এমন ভুট্টাগুলোকে একে অপরের সাথে ক্রস করাতে থাকেন। অর্থাৎ এক রঙের ভুট্টার পরাগরেণু অন্য রঙের ভুট্টার স্ত্রী-কেশরে ছড়িয়ে দেয়া হয়। এতে নতুন প্রজন্মে জিনের মিশ্রণ ঘটে। ধীরে ধীরে এমন প্রজন্ম তৈরি হয়, যেখানে একই জাতের মধ্যে নানা রঙের দানা দেখা যায়। আধুনিক সময়ে এই প্রক্রিয়াকে আরও সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। প্ল্যান্ট ব্রিডাররা জানেন কোন জিন কোন রং তৈরি করে। সেই অনুযায়ী তারা নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য ধরে রেখে নতুন জাত তৈরি করেন।

জিনের খেলায় রঙের মেলা

ভুট্টার রঙ আসলে একাধিক জিনের যৌথ প্রভাবের ফল। কোনো জিন রঙ তৈরি করে, আবার কোনো জিন সেই রঙকে দৃশ্যমান হতে দেয় বা বাধা দেয়। এই জটিল সমন্বয়ের কারণে কখনো একই ভুট্টার মধ্যে দেখা যায়, একটি দানা গাঢ় বেগুনি, পাশেরটি হালকা গোলাপি, আবার আরেকটি পুরো স্বচ্ছ। দেখে মনে হয়, জিনগুলো একসাথে মিলেমিশে নানান রঙের বিশাল এক ক্যানভাস তৈরি করেছে।

জাম্পিং জিনের প্রভাব

রঙিন ভুট্টার পেছনে আরেকটি চমৎকার বৈজ্ঞানিক বিষয় কাজ করে, যাকে বলা হয়, “জাম্পিং জিন”। এই ধারণাটি প্রথম তুলে ধরেন, মার্কিন বিজ্ঞানী বারবারা ম্যাকক্লিনটক। ভুট্টা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তিনি দেখিয়েছিলেন, এর জিনোমের ভেতরে এমন কিছু ডিএনএর অংশ আছে, যেগুলো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরে যেতে পারে। এই চলমান জিনগুলো কখনো কোনো রঙ তৈরির জিনের কাজ বন্ধ করে দেয়, আবার কখনো সরে গিয়ে সেই কাজ আবার চালু করে। ফলে একই ভুট্টার দানার ভেতরেই তৈরি হয় অদ্ভুত সব নকশা।কোথাও রঙ আছে, আবার কোথাও নেই, কোথাও গাঢ়, কোথাও বা হালকা। এই মোজাইক প্যাটার্নই অনেক সময় রঙিন ভুট্টাকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তোলে। অর্থাৎ, শুধু জিনের উপস্থিতিই নয়, তাদের এই “লাফিয়ে বেড়ানো” স্বভাবও রঙের খেলাকে আরও জটিল ও সুন্দর করে তোলে।

ঐতিহ্যবাহী বীজ সংরক্ষণ

রঙিন ভুট্টা শুধু চোখের শান্তির জন্য নয়। এর পেছনে রয়েছে হাজার বছরের কৃষি ঐতিহ্য। দক্ষিণ ও উত্তর আমেরিকার আদিবাসীরা ভুট্টার এই বৈচিত্র্য সংরক্ষণ করেছেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। আজকের দিনে “গ্লাস জেম কর্ন” আবার জনপ্রিয় হয়েছে মূলত ঐতিহ্যবাহী বীজ সংরক্ষণ আন্দোলনের মাধ্যমে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতির ভেতরে কত অসীম বৈচিত্র্য লুকিয়ে আছে, যেটা আমরা অনেক সময় ভুলে যাই বা হারিয়ে ফেলি।

উপসংহার

রঙিন ভুট্টার ইতিহাস আমাদের শেখায়, উদ্ভিদ প্রজনন শুধুই খাদ্য উৎপাদনের বিষয় নয়। এটি এক ধরনের শিল্পও। মানুষের ধৈর্য, পর্যবেক্ষণ আর প্রজন্মের পর প্রজন্মের চর্চা মিলেই তৈরি হয়েছে এই রঙের বিস্ময়। একটি রঙিন ভুট্টা হাতে নিলে তাই মনে হয়, এটা শুধু খাদ্য নয়, বরং প্রকৃতি আর মানুষের যৌথ প্রযোজনায় সৃষ্টির এক জীবন্ত ছবি।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular