মঙ্গল গ্রহ বা ‘লাল গ্রহ’ নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। কোটি কোটি বছর আগে সেখানে কি কোনো প্রাণের অস্তিত্ব ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ২০২১ সালে মঙ্গলের বুকে পা রেখেছিল নাসার অত্যাধুনিক রোভার ‘পারসিভের্যান্স‘ (Perseverance)। আর সম্প্রতি এই রোভারটি এমন কিছু খুঁজে পেয়েছে, যা বিজ্ঞানীদের রীতিমতো চমকে দিয়েছে!
প্রাচীন নদীর বুকে প্রাণের খোঁজ
পারসিভের্যান্স রোভারটি মঙ্গলের ‘জিজেরো খাদ‘ (Jezero crater) নামক একটি বিশাল গর্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোটি কোটি বছর আগে এই গর্তটি ছিল একটি টইটম্বুর হ্রদ। সম্প্রতি রোভারটি এই হ্রদের সাথে যুক্ত একটি প্রাচীন নদীর খাত বা চ্যানেলে এসে পৌঁছায়, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘নেরেতভা ভ্যালিস‘ (Neretva Vallis)।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, আজ থেকে প্রায় ৩০০ কোটি বছর আগে এই নদীটি দিয়ে প্রবল বেগে পানি এসে পড়ত জিজেরো হ্রদে। এই প্রাচীন নদীর বুকেই রোভারটি এমন কিছু পাললিক শিলার সন্ধান পেয়েছে, যা পৃথিবীর বুকে থাকা জীবাণুদের তৈরি করা পাথরের সাথে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়!
কী আছে সেই পাথরে?
রোভারের গায়ে লাগানো লেজার, ইনফ্রারেড এবং এক্স-রে স্পেকট্রোমিটার ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা ১২৬টি শিলার নমুনা এবং ৮টি পাথরের উপরিভাগ নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করেন। এই গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার কমিউনিকেশনস’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
পরীক্ষায় দেখা যায়, অন্তত ৩২টি নমুনায় প্রচুর পরিমাণে ‘নিকেল‘ (Nickel) রয়েছে। কিছু পাথরে নিকেলের পরিমাণ ছিল পাথরের মোট ওজনের ১.১ শতাংশ! বিজ্ঞানীরা বলছেন, মঙ্গলের বুকে সরাসরি পরীক্ষা করে এর আগে কখনোই এত বেশি নিকেল পাওয়া যায়নি। শুধু নিকেলই নয়, এর সাথে মিলেছে আয়রন সালফাইড এবং সালফেটের মতো কিছু খনিজ উপাদানও।
পৃথিবীর সাথে অদ্ভুত মিল!
এই উপাদানগুলোই বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলেছে। কারণ, আমাদের পৃথিবীতে ঠিক এই ধরনের নিকেল এবং আয়রন সালফাইড সমৃদ্ধ পাথর তৈরি হয় ক্ষুদ্র অণুজীব বা মাইক্রোবদের মাধ্যমে! পৃথিবীতে থাকা ব্যাকটেরিয়ারা যখন খনিজ পদার্থ ভাঙে, তখন ঠিক এভাবেই তারা পাথরের গায়ে তাদের অস্তিত্বের ছাপ রেখে যায়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, মঙ্গলে পাওয়া এই শিলাগুলোর রাসায়নিক গঠন এবং কাঠামোর সাথে পৃথিবীর সেই ‘জীবন্ত’ পাথরগুলোর এক চমৎকার মিল রয়েছে। তাই এই আবিষ্কারটিকে তারা একটি “বায়োসিগনেচার” বা ‘প্রাণের সম্ভাব্য চিহ্ন’ হিসেবে দেখছেন।
বিজ্ঞানের সতর্কতা: সত্যিই কি প্রাণ, নাকি শুধুই রাসায়নিক বিক্রিয়া?
তবে বিজ্ঞানীরা এখনই নিশ্চিত করে বলছেন না যে মঙ্গলে এলিয়েন বা প্রাণের সন্ধান পাওয়া গেছে। তারা বেশ সতর্ক। তারা জানিয়েছেন, পৃথিবীতে অণুজীবরা এই ধরনের পাথর তৈরি করলেও, কোনো রকম প্রাণের অস্তিত্ব ছাড়াই কেবল রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমেও এমনটা ঘটা সম্ভব। যেমন, ‘সার্পেন্টিনাইজেশন’ নামক প্রক্রিয়ায় হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি হওয়ার সময়ও এমন রাসায়নিক গঠন তৈরি হতে পারে।
তবে কারণ যাই হোক না কেন, এই আবিষ্কার মঙ্গলের আদিম পরিবেশ এবং সেখানে প্রাণের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
পরবর্তী পদক্ষেপ: পৃথিবীতে আসছে মঙ্গলের পাথর
বিজ্ঞানীরা বলছেন, মঙ্গলের এই রহস্যের একদম ১০০ ভাগ সঠিক উত্তর পেতে হলে শুধু রোভারের পাঠানো ছবি আর তথ্য দিয়ে হবে না। এই নিকেল আর সালফারের উৎস এবং এর সাথে জৈব পদার্থের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা জানতে হলে উন্নত ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
আর এই কারণেই নেরেতভা ভ্যালিসের ‘স্যাফায়ার ক্যানিয়ন’ থেকে রোভারটি ইতোমধ্যে একটি বিশেষ নমুনা সংগ্রহ করে সযতনে প্যাক করে রেখেছে। নাসা এবং ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি (ESA) মিলে ‘মার্স স্যাম্পল রিটার্ন’ (Mars Sample Return) নামের একটি মহাকাশ অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই অভিযানের মূল লক্ষ্যই হলো মঙ্গলের বুক থেকে এই পাথরগুলো কুড়িয়ে পৃথিবীতে নিয়ে আসা। এই বছরই অভিযানটির ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার কথা রয়েছে।
হয়তো সেই পাথরগুলো পৃথিবীতে আসার পরই আমরা চিরকালের সেই বহুকাঙ্ক্ষিত উত্তরটি পেয়ে যাব—মঙ্গল গ্রহে কি সত্যিই একদিন প্রাণ ছিল?
