Homeপদার্থ বিজ্ঞানআইনস্টাইন বনাম বোর: মহাবিশ্বের স্বরূপ নিয়ে এক মহাকাব্যিক লড়াই

আইনস্টাইন বনাম বোর: মহাবিশ্বের স্বরূপ নিয়ে এক মহাকাব্যিক লড়াই

অক্টোবর মাস, ১৯২৭ সাল। বেলজিয়ামের ব্রাসেলস শহরের বাতাসে এক অদ্ভুত উত্তেজনা। শহরের একটি ভবনে জড়ো হয়েছেন সেকালের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কের মানুষেরা। মাদাম কুরি, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক, শ্রোডিঙ্গার, হাইজেনবার্গ—কে নেই সেখানে! পঞ্চম সলভে সম্মেলন নামের এই জমায়েতটি ছিল বিজ্ঞানীদের এক মিলনমেলা। কিন্তু এই মহা-সম্মেলনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠলেন দুজন মানুষ, যাদের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই বিজ্ঞানের ইতিহাস তো বটেই, পালটে দিয়েছিল আমাদের ভবিষ্যৎ সভ্যতাকেও।

তাদের একজন হলেন আলবার্ট আইনস্টাইন, যিনি ততদিনে আপেক্ষিকতা তত্ত্ব দিয়ে দুনিয়া কাঁপিয়ে দিয়েছেন। আর অন্যজন হলেন ডেনমার্কের উজ্জ্বল নক্ষত্র, নীলস বোর। তাদের এই লড়াই কোনো সম্পত্তি বা ক্ষমতার জন্য ছিল না; এই লড়াই ছিল খোদ মহাবিশ্বের “চরিত্র” বা স্বরূপ নিয়ে।

ঘড়ির কাঁটা বনাম জুয়াড়ির পাশা

আইনস্টাইনের কাছে মহাবিশ্ব ছিল একটি নিখুঁত, সুশৃঙ্খল ঘড়ির মতো। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃতির প্রতিটি ঘটনার পেছনে একটা সুনির্দিষ্ট কারণ থাকে (Determinism)। আপনি যদি বর্তমানের প্রতিটি ধূলিকণার অবস্থান এবং গতি জানেন, তবে মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ ঠিক কেমন হবে তা নিখুঁতভাবে বলে দেওয়া সম্ভব। এখানে কোনো জাদু নেই, নেই কোনো ভোজবাজি।

অন্যদিকে, নীলস বোর এবং তার তরুণ অনুসারীরা শোনালেন এক অদ্ভুত, প্রায় পাগলাটে কথা। তারা পরমাণুর ভেতরের ক্ষুদ্র জগৎ (কোয়ান্টাম জগৎ) নিয়ে কাজ করছিলেন। বোর বললেন, এই ক্ষুদ্র জগতে আমাদের চেনা পৃথিবীর কোনো নিয়মই খাটে না। একটি ইলেকট্রন একই সাথে এখানে, ওখানে এবং সব জায়গায় থাকতে পারে—যতক্ষণ না আপনি তাকে দেখছেন বা পরিমাপ করছেন। সোজা কথায়, প্রকৃতির গভীরে লুকিয়ে আছে নিছক সম্ভাবনা এবং চরম অনিশ্চয়তা।

আইনস্টাইন এই “অনিশ্চয়তা” মেনে নিতে পারলেন না। তার কাছে মনে হলো, বোর মহাবিশ্বকে একটি জুয়াড়ির বোর্ডে পরিণত করছেন। বিরক্ত আইনস্টাইন তার সেই জগদ্বিখ্যাত উক্তিটি ছুঁড়ে দিলেন— “ঈশ্বর নিশ্চয়ই মহাবিশ্ব নিয়ে পাশা খেলেন না!”

বোরও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ছিলেন না। তিনি মৃদু হেসে জবাব দিলেন— “ঈশ্বরকে বলে দেবেন না তাঁর কী করতে হবে!”

ব্রেকফাস্ট টেবিলের সেই বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ

সলভে সম্মেলনের দিনগুলোতে হোটেলের ডাইনিং রুম হয়ে উঠেছিল তাদের যুদ্ধক্ষেত্র। প্রতিদিন সকালে ব্রেকফাস্টের টেবিলে আইনস্টাইন তার স্বভাবসুলভ মুচকি হাসি নিয়ে হাজির হতেন। তার মাথায় থাকতো নতুন কোনো ‘চিন্তন পরীক্ষা’ (Thought experiment)—এমন এক কাল্পনিক ধাঁধা যা বোরের কোয়ান্টাম তত্ত্বকে একেবারে ভুল প্রমাণ করে দেবে।

আইনস্টাইনের ধাঁধা শুনে বোরের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়তো। তিনি বিড়বিড় করতেন, পাইপ টানতেন আর সারা দিন সেই ধাঁধার সমাধান খুঁজতেন। অবশেষে, রাতের ডিনার টেবিলে বোর এমন এক অকাট্য যুক্তি নিয়ে হাজির হতেন, যা আইনস্টাইনের ধাঁধাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিত। পরের দিন সকালে আইনস্টাইন আবারও নতুন ধাঁধা নিয়ে আসতেন, আর বোর আবারও তা সমাধান করতেন। এভাবেই চলছিল এক রোমাঞ্চকর মগজাস্ত্রের লড়াই।

১৯৩৫: আইনস্টাইনের তুরুপের তাস এবং ‘ভুতুড়ে কাণ্ড’

বছর গড়িয়ে গেল। আইনস্টাইন তখন জার্মানি ছেড়ে আমেরিকার প্রিন্সটনে। কিন্তু বোরের সাথে তার সেই অসম্পূর্ণ লড়াইয়ের কথা তিনি ভোলেননি। ১৯৩৫ সালে আইনস্টাইন তার দুই সহকর্মী (পোদোলস্কি এবং রোজেন) নিয়ে এমন এক গবেষণাপত্র প্রকাশ করলেন, যা বিজ্ঞানের দুনিয়ায় বোমা ফাটিয়ে দিল। ইতিহাসে একে বলা হয় ইপিআর (EPR) প্যারাডক্স।

আইনস্টাইন দেখালেন, বোরের তত্ত্ব যদি সত্যি হয়, তবে মহাবিশ্বে এমন দুটি কণা থাকা সম্ভব যারা নিজেদের মধ্যে এক অদৃশ্য মায়াজালে আবদ্ধ (যাকে আজ আমরা Entanglement বলি)। এই অবস্থায় একটি কণা যদি পৃথিবীতে থাকে এবং অন্যটি যদি লাখ লাখ আলোকবর্ষ দূরে অন্য কোনো গ্যালাক্সিতে থাকে, তবুও পৃথিবীর কণাটিতে টোকা দিলে ওই দূরের কণাটি সাথে সাথে কেঁপে উঠবে! মাঝখানে কোনো সংকেত আদান-প্রদান ছাড়াই কীভাবে এটি সম্ভব? আলোর চেয়ে দ্রুত তো কোনো কিছু চলতে পারে না!

আইনস্টাইন এই অদ্ভুত ঘটনার নাম দিলেন “স্পুকি অ্যাকশন অ্যাট এ ডিস্ট্যান্স” (Spooky action at a distance) বা দূরবর্তী ভুতুড়ে কাণ্ড। আইনস্টাইন মুচকি হেসে বললেন, “যেহেতু এমন ভুতুড়ে কাণ্ড বাস্তবে ঘটা অসম্ভব, তাই বোরের কোয়ান্টাম তত্ত্বটাই আসলে ভুল বা অসম্পূর্ণ।”

বোর এবারও হাল ছাড়লেন না। তিনি বললেন, “যত ভুতুড়েই লাগুক, প্রকৃতি আসলে এমনই।”

মৃত্যুর ওপারের রায় এবং আজকের পৃথিবী

আইনস্টাইন (১৯৫৫) এবং বোর (১৯৬২)—দুজনই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। তারা কেউই জেনে যেতে পারলেন না এই মহাকাব্যিক লড়াইয়ে কে জিতেছিল।

কিন্তু ১৯৬০-এর দশকে বিজ্ঞানী জন বেল এবং পরবর্তীতে ২০২২ সালে নোবেলজয়ী একদল বিজ্ঞানী (অ্যালেইন অ্যাসপেক্ট, জন ক্লজার এবং অ্যান্টন জেইলিঙ্গার) ল্যাবরেটরিতে প্রমাণ করে ছাড়লেন সেই অবিশ্বাস্য সত্য। রায় বোরের পক্ষেই গেল! হ্যাঁ, মহাবিশ্ব সত্যিই অদ্ভুত। প্রকৃতির গভীরে অনিশ্চয়তা রয়েছে এবং আইনস্টাইনের সেই “ভুতুড়ে কাণ্ড” বা কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্ট শতভাগ সত্যি।

কিন্তু এই গল্পের সবচেয়ে বড় চমক অন্য জায়গায়।

আইনস্টাইন এবং বোরের সেই তাত্ত্বিক লড়াই, যা একসময় কেবল ব্ল্যাকবোর্ড আর কল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তা-ই আজ আমাদের আধুনিক সভ্যতার ভিত্তি।

  • বোরদের কোয়ান্টাম মেকানিক্স না থাকলে আজ আমাদের হাতে স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ থাকত না, কারণ এগুলোর ভেতরের মাইক্রোচিপ কোয়ান্টাম নিয়মেই চলে।
  • হাসপাতালের এমআরআই (MRI) স্ক্যানার কিংবা ফাইবার অপটিক্সের লেজার প্রযুক্তি—সবই এই তত্ত্বের অবদান।
  • আর আইনস্টাইন যে “স্পুকি অ্যাকশন”-কে ভুল ভেবে বাতিল করতে চেয়েছিলেন? সেই ভুতুড়ে কাণ্ডকে কাজে লাগিয়েই আজ তৈরি হচ্ছে সুপারপাওয়ারফুল কোয়ান্টাম কম্পিউটার এবং হ্যাকার-প্রতিরোধী সুরক্ষিত ইন্টারনেট ব্যবস্থা!

আইনস্টাইন ও নীলস বোর—দুজন ভিন্ন মেরুর মানুষ ছিলেন। কিন্তু তাদের এই মতভেদ কোনো অহংকারের লড়াই ছিল না; এটি ছিল পরম সত্যকে জানার এক অদম্য কৌতূহল। আর সেই কৌতূহল থেকেই জন্ম নিয়েছে আজকের আধুনিক বিশ্ব, যার প্রতিটি ইলেকট্রনিক স্পন্দনে লুকিয়ে আছে এই দুই মহারথীর বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের ইতিহাস।

Raisul Sohan
Raisul Sohan
বিজ্ঞান অনুরাগী। শখের বিজ্ঞান লেখক।
RELATED ARTICLES

Most Popular