আজ ১৪ই মার্চ। গণিতপ্রেমী ও বিজ্ঞান অনুরাগী সবার কাছে দিনটি পরিচিত ‘পাই দিবস’ বা ‘Pi Day’ নামে।
কিন্তু কেন ঠিক এই দিনটিতেই?
কারণ তারিখটি যদি মাস/দিন বা ৩/১৪ ফরম্যাটে লেখা হয়, তাহলে সেটি মিলে যায় গণিতের সবচেয়ে বিখ্যাত ও পরিচিত ধ্রুবক পাই 𝝅-এর প্রথম অঙ্কগুলোর সঙ্গে: 𝝅 = 3.1415926535…
সহজ কথায়, পাই হলো একটি বৃত্তের পরিধি ও ব্যাসের অনুপাত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সংখ্যাটি শুধু জ্যামিতির সাধারণ পাতাতেই সীমাবদ্ধ নয়। মহাবিশ্বের নানা জটিল সমীকরণ ও হিসাব-নিকাশের মাঝে এটি বারবার ফিরে আসে।
অন্তহীন সংখ্যার মায়াজাল
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, পাইয়ের মান কখনো শেষ হয় না। এটি একটি অমূলদ সংখ্যা (Irrational number)। এর অঙ্কগুলো চলতেই থাকে অন্তহীনভাবে, কোনো নির্দিষ্ট পুনরাবৃত্তি বা প্যাটার্ন ছাড়াই। বিজ্ঞানীরা সুপারকম্পিউটার ব্যবহার করে এখন পর্যন্ত দশমিকের পর এর ১০০ ট্রিলিয়নেরও বেশি ঘর বের করেছেন, তবুও এর কোনো শেষ পাওয়া যায়নি। মানুষের পক্ষেও এই সংখ্যা মনে রাখা এক অদ্ভুত চ্যালেঞ্জ। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড অনুযায়ী, ২০১৫ সালে রাজবীর মীনা নামের এক ব্যক্তি চোখ বেঁধে প্রায় ১০ ঘণ্টা ধরে দশমিকের পর 𝝅-এর ৭০ হাজার ঘর পর্যন্ত মান নির্ভুলভাবে মুখস্থ বলে বিশ্ব রেকর্ড করেছিলেন!
মহাকাশ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে পাই
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা গ্রহের কক্ষপথ নির্ণয় করতে, নক্ষত্রের আকার হিসাব করতে, গ্যালাক্সির গতিবিধি বুঝতে, এমনকি মহাকাশের জ্যামিতি বিশ্লেষণ করতেও পাই ব্যবহার করেন। পাই না থাকলে আমরা সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণের সময় নির্ভুলভাবে অনুমান করতে পারতাম না। মহাকাশ গবেষণায় $\pi$-এর প্রয়োগগুলো বেশ চমকপ্রদ:
- নাসার হিসাব-নিকাশ: সৌরজগতের দূরত্ব পেরিয়ে মহাকাশযান পাঠানো খুব সহজ কাজ নয়। তবে মজার ব্যাপার হলো, নাসার (NASA) মতো সংস্থা তাদের ইন্টারপ্ল্যানেটারি নেভিগেশনের জন্য 𝝅-এর দশমিকের পর মাত্র ১৫টি ঘর ব্যবহার করে! আর পুরো দৃশ্যমান মহাবিশ্বের পরিধি একটি হাইড্রোজেন পরমাণুর সমান নিখুঁতভাবে মাপতে দশমিকের পর মাত্র ৩৯ থেকে ৪০ ঘর মানই যথেষ্ট।
- মঙ্গল গ্রহে অভিযান: নাসা যখন মঙ্গল গ্রহে কিউরিওসিটি বা পারসিভারেন্সের মতো রোভার পাঠায়, তখন বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পর তাদের গতি কমানোর জন্য বিশাল প্যারাশুট ব্যবহার করা হয়। বাতাসের বাধা অনুযায়ী এই প্যারাশুটের আকার ঠিক কতটা বড় হতে হবে, তা নির্ধারণ করতে এর ক্ষেত্রফলের Α= 𝝅r2 নির্ভুল হিসাব করাটা অত্যন্ত জরুরি।
- ভিনগ্রহের সন্ধান: সৌরজগতের বাইরের কোনো গ্রহ (Exoplanets) যখন তার নক্ষত্রের সামনে দিয়ে যায়, তখন নক্ষত্রের আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে কিছুটা বাধা পায়। গ্রহটি নক্ষত্রের ঠিক কতটা আলো আটকে দিচ্ছে, তা তাদের গোলাকার ক্ষেত্রফলের অনুপাতের ওপর নির্ভর করে। এই 𝝅-নির্ভর হিসাব থেকেই বিজ্ঞানীরা হাজার হাজার আলোকবর্ষ দূরের গ্রহগুলোর আকার নিখুঁতভাবে বের করেন।
ইতিহাস ও বিজ্ঞানীদের সাথে অদ্ভুত সংযোগ
এই রহস্যময় ধ্রুবক ও ১৪ই মার্চের সাথে বিজ্ঞানের ইতিহাসের রয়েছে এক অদ্ভুত মেলবন্ধন। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম পথিকৃৎ আলবার্ট আইনস্টাইন জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮৭৯ সালের এই পাই দিবসেই। আবার, আরেক কিংবদন্তি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং ২০১৮ সালের ঠিক এই ১৪ই মার্চেই মৃত্যুবরণ করেন।
ইতিহাসে পাই নিয়ে মজার এবং অদ্ভুত ঘটনাও আছে। ১৮৯৭ সালে আমেরিকার ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যে “ইন্ডিয়ানা পাই বিল” (Indiana Pi Bill) নামে একটি আইন পাসের চেষ্টা করা হয়েছিল, যেখানে সরকারিভাবে 𝝅-এর মান 3.2 নির্ধারণ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়! ভাগ্যক্রমে একজন গণিতবিদ সেখানে উপস্থিত থেকে এর অবৈজ্ঞানিক দিকটি বুঝিয়ে বিলটি আটকে দেন।
এক অর্থে, এই ধ্রুবকটি পৃথিবীর ছোট্ট একটি বৃত্তকে মহাবিশ্বে ঘুরে বেড়ানো গ্রহ-নক্ষত্রের গতির সঙ্গে যুক্ত করে দেয়। পাই এমন একটি সংখ্যা, যার কোনো শেষ নেই… আর এই সংখ্যা দিয়ে আমরা বর্ণনা করি এমন এক মহাবিশ্বকে, যার সীমানাও হয়তো অনন্ত।
হ্যাপি পাই ডে!
