Homeপদার্থ বিজ্ঞানপৃথিবীর লৌহ হৃদয়

পৃথিবীর লৌহ হৃদয়

রাতের আকাশের দিকে তাকালে আমরা মহাবিশ্বের অসীম বিস্তার দেখি। গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, ধূমকেতু – সব মিলিয়ে মহাকাশ যেন এক বিশাল রহস্যের ভাণ্ডার। কিন্তু বিস্ময়ের আরেকটি জগৎ লুকিয়ে আছে আমাদের পায়ের ঠিক নিচেই – পৃথিবীর গভীরে। আমরা যে গ্রহটিতে বাস করি, তার ভেতরটা কিন্তু কোনো কঠিন পাথরের নিস্তরঙ্গ গোলক নয়। বরং ভেতরে ভেতরে এটি এক চলমান, উত্তপ্ত এবং জটিল জগত। আর সেই জগতের সবচেয়ে রহস্যময় অংশটি হলো পৃথিবীর কেন্দ্র বা কোর। এই কোর শুধু পৃথিবীর কাঠামোর অংশ নয়; এখান থেকেই জন্ম নেয় পৃথিবীর শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র, যেটা আমাদের গ্রহকে মহাজাগতিক বিপদ থেকে প্রতিনিয়ত রক্ষা করে চলেছে।

পৃথিবীর ভেতরের স্তর

পৃথিবীর ব্যাস প্রায় বারো হাজার সাতশো কিলোমিটার। এর ভেতরটা স্তরবিন্যাসের মাধ্যমে গঠিত। সবচেয়ে বাইরে রয়েছে ভূত্বক, যার ওপরই আমরা বাস করি। এর পুরুত্ব খুব বেশি নয়, কোথাও মাত্র কয়েক কিলোমিটার, আবার কোথাও প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার পর্যন্ত। ভূত্বকের নিচে রয়েছে ম্যান্টল, যার পুরুত্ব প্রায় দুই হাজার নয়শো কিলোমিটার। এই স্তরটি অত্যন্ত উত্তপ্ত এবং প্রবাহমান পাথুরে পদার্থে ভরা।

ম্যান্টলের নিচেই শুরু হয় পৃথিবীর কোর। এই কোর আবার দুই ভাগে বিভক্ত – বহিঃকোর এবং অন্তঃকোর। এই অঞ্চলটি পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তপ্ত এবং ঘন অংশ, যেখানে তাপমাত্রা সূর্যের পৃষ্ঠের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।

লোহায় গড়া কেন্দ্র

পৃথিবীর কোর মূলত লোহা ও নিকেল দিয়ে তৈরি। এর ব্যাস প্রায় সাত হাজার কিলোমিটার, অর্থাৎ আকারে এটি প্রায় চাঁদের সমান। বহিঃকোর অংশটি তরল ধাতু দিয়ে গঠিত। এখানে তাপমাত্রা চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি।

এই উত্তপ্ত তরল লোহা পৃথিবীর ঘূর্ণনের প্রভাবে ক্রমাগত সঞ্চালিত হতে থাকে।

বহিঃকোরের ভেতরে রয়েছে অন্তঃকোর – একটি কঠিন লোহার গোলক। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত উচ্চ তাপমাত্রা থাকা সত্ত্বেও এখানে পদার্থ কঠিন অবস্থায় থাকে। এর কারণ হলো প্রচণ্ড চাপ। পৃথিবীর গভীরে চাপ এত বেশি যে গলিত লোহাও সেখানে কঠিন হয়ে যায়। বিজ্ঞানীদের মতে অন্তঃকোরের ব্যাস প্রায় দুই হাজার চারশো কিলোমিটার।

চৌম্বক ক্ষেত্রের জন্ম

পৃথিবীর কোরের এই উত্তপ্ত ধাতব স্রোতই তৈরি করে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র। বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে বলেন, জিওডায়নামো। পৃথিবীর ঘূর্ণনের ফলে বহিঃকোরের তরল লোহা ক্রমাগত সঞ্চালিত হয়। এই সঞ্চালনের ফলে বৈদ্যুতিক প্রবাহ তৈরি হয় এবং সেই প্রবাহ থেকেই জন্ম নেয় বিশাল চৌম্বক ক্ষেত্র।

এই চৌম্বক ক্ষেত্র পৃথিবীকে ঘিরে একটি অদৃশ্য ঢাল তৈরি করেছে, যাকে বলা হয়, ম্যাগনেটোস্ফিয়ার। সূর্য থেকে ক্রমাগত উচ্চশক্তির চার্জ যুক্ত কণার স্রোত ছুটে আসে, এর নাম সোলার উইন্ড। পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র না থাকলে এই কণাগুলো সরাসরি বায়ুমণ্ডলে আঘাত করত এবং ধীরে ধীরে বায়ুমণ্ডলের বড় অংশ মহাশূন্যে হারিয়ে যেতে পারত। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মঙ্গল গ্রহে চৌম্বক ক্ষেত্র না থাকার কারণেই এই গ্রহের বায়ুমণ্ডল এত পাতলা হয়ে গেছে।

মেরুর উল্টে যাওয়া

পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র কিন্তু স্থির নয়। দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ চৌম্বক মেরু একে অপরের জায়গা বদলে ফেলেছে। এই ঘটনাকে বলা হয় চৌম্বক মেরু বিপর্যয় বা ম্যাগনেটিক পোল রিভার্সাল।

প্রায় সাত লক্ষ আশি হাজার বছর আগে পৃথিবীতে শেষ বড় ধরনের মেরু উল্টে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। ভূতাত্ত্বিক স্তরে জমে থাকা আগ্নেয় শিলার মধ্যে থাকা লৌহ খনিজের দিক বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এই ইতিহাস জানতে পেরেছেন। যখন লাভা ঠান্ডা হয়ে পাথরে পরিণত হয়, তখন সেই লোহার কণাগুলো তখনকার চৌম্বক ক্ষেত্রের দিক অনুসারে স্থির হয়ে যায়। সেই কারণে পুরোনো শিলার মধ্যে পৃথিবীর চৌম্বক ইতিহাস যেন জমাট বেঁধে থাকে।

চৌম্বক মেরুর উল্টে যাওয়ার মূল কারণ লুকিয়ে আছে বহিঃকোরের তরল লোহার জটিল সঞ্চালনে। পৃথিবীর ভেতরের তাপ, ঘূর্ণন এবং তরল ধাতুর প্রবাহ মিলিয়ে সেখানে তৈরি হয় অত্যন্ত অস্থির স্রোত। কখনো কখনো এই স্রোতের বিন্যাস এতটাই বদলে যায় যে চৌম্বক ক্ষেত্রের দিক ধীরে ধীরে উল্টে যায়। তবে এই পরিবর্তন রাতারাতি ঘটে না; হাজার হাজার বছর ধরে ধীরে ধীরে সম্পন্ন হয়।

অন্তঃকোরের গতি

পৃথিবীর গভীর অভ্যন্তর এখনও বিজ্ঞানীদের কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। আমরা সরাসরি সেখানে পৌঁছাতে পারি না, তাই ভূমিকম্পের তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর ভেতরের কাঠামো সম্পর্কে ধারণা পান। সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় এমনও ইঙ্গিত মিলেছে যে অন্তঃকোর পৃথিবীর বাকি অংশের তুলনায় ভিন্ন গতিতে ঘুরতে পারে। অর্থাৎ পৃথিবীর গভীরে আজও চলছে বিশাল এক গতিশীল কর্মকাণ্ড।

শেষ কথা

আমরা যখন পৃথিবীর পৃষ্ঠে দাঁড়িয়ে আছি, তখন আমাদের পায়ের নিচে প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার গভীরে এক উত্তপ্ত লৌহসমুদ্র ঘুরপাক খাচ্ছে। সেই ধাতব সাগরের স্রোতই তৈরি করছে পৃথিবীর চৌম্বক ঢাল, যেটা সূর্যের ক্ষতিকর কণার ঝড় থেকে আমাদের গ্রহকে রক্ষা করে চলেছে কোটি কোটি বছর ধরে।

অদ্ভুত বিষয় হলো, এই অদৃশ্য রক্ষাকবচের উৎস লুকিয়ে আছে পৃথিবীর হৃদয়ে – একটি উত্তপ্ত লৌহগোলকের মধ্যে। পৃথিবীকে তাই কেবল একটি পাথুরে গ্রহ বললে ভুল হবে। এর ভেতরে চলমান রয়েছে এক বিশাল চৌম্বক ইঞ্জিন, যার প্রভাব ছড়িয়ে আছে আমাদের পুরো গ্রহজুড়ে।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular