এক সময় ভূরাজনীতির খেলা চলতো পেট্রোলিয়ামকে ঘিরে। তেলের কূপ নিয়ন্ত্রণ করত বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। নতুন এক শক্তির উৎস উঠে এসেছে বিশ্ব মঞ্চে। বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু খনিজ পদার্থ, যেমন: লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল, নিওডিমিয়াম, ডিসপ্রোসিয়াম, প্রাসিওডিমিয়াম, টার্বিয়াম, ইট্রিয়াম, সেরিয়াম, ল্যান্থানাম, গ্যাডোলিনিয়াম, সমারিয়াম, ক্রোমিয়াম, ইত্যাদি হয়ে উঠছে বিশ্ব রাজনীতির চালিকাশক্তি। এর মধ্যে রয়েছে বেশ কিছু “রেয়ার আর্থ মিনারেল” যেগুলো পৃথিবীতে খুবই বিরল। কিন্তু এসব খনিজ পদার্থের ওপর নির্ভর করছে আধুনিক প্রযুক্তির প্রতিটি স্তর। স্মার্টফোন থেকে রাডার, বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে ক্ষেপণাস্ত্র, সব কিছুর প্রাণশক্তি এসব উপাদানগুলোর মধ্যে লুকিয়ে আছে।
চীন এখন বিশ্বব্যাপী এসব বিরল খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রায় ৯১ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে চীনকে একধরনের “খনিজ সাম্রাজ্য” বলা ভুল হবে না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়া মরিয়া হয়ে উঠেছে এই নির্ভরতা ভাঙতে। কারণ আজকের বিশ্বে রেয়ার আর্থ মিনারেল শুধু অর্থনীতির নয়, এটি ভূরাজনীতিরও মোক্ষম অস্ত্র।
চীনের এই আধিপত্য তৈরি হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। নব্বইয়ের দশক থেকেই তারা রেয়ার আর্থকে “স্ট্র্যাটেজিক মেটেরিয়াল” ঘোষণা করে বিপুল বিনিয়োগ করে। ফলে এখন প্রায় সব উন্নত প্রযুক্তি শিল্পই চীনা পরিশোধন কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। ২০১০ সালে জাপানের সঙ্গে বাণিজ্যিক বিরোধের সময় চীন রপ্তানি সীমিত করলে মুহূর্তে এগুলোর বাজার মূল্য প্রায় দশগুণ বেড়ে যায়। সেই সংকটই বিশ্বকে চোখ খুলে দেখায়, এসব খনিজও হতে পারে অস্ত্রের মতো কার্যকর।
২০১৯ সালে আমেরিকা-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ চলাকালে যখন চীন আবার রপ্তানি সীমিত করার ইঙ্গিত দেয়, তখন নিওডিমিয়াম ও ডিসপ্রোসিয়ামের দাম কয়েক দিনের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে যায়।
২০২৫ সালে বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন এই পরিস্থিতিকে নতুনভাবে দেখছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি ঘোষণা দিয়েছেন, রেয়ার আর্থের সরবরাহ চেইনকে চীনের হাত থেকে মুক্ত করা হবে। তিনি “ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট” ব্যবহার করে মার্কিন খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে সরকারি বিনিয়োগের অনুমোদন দিয়েছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার “মাউন্টেন পাস” খনি পুনরায় চালু করা হয়েছে, যেখানে বছরে প্রায় ৪৫ হাজার টন রেয়ার আর্থ অক্সাইড উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে এই খনি থেকে প্রাপ্ত কাঁচামাল এখনও মালয়েশিয়ায় পাঠিয়ে পরিশোধন করতে হয়, যেটা আমেরিকার কৌশলগত দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে। ট্রাম্প প্রশাসন তাই মার্কিন প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো গড়তে এক বিলিয়ন ডলারের তহবিল ঘোষণা করেছে। সেই সাথে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের সঙ্গে, “মিনারেল সিকিউরিটি পার্টনারশিপ” গঠন করেছে।
অস্ট্রেলিয়া এখন ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলে রেয়ার আর্থের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার খনিগুলোতে বিপুল পরিমাণ নিওডিমিয়াম ও প্রাসিওডিমিয়াম মজুত রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া এবং আমেরিকা একসঙ্গে কাজ করছে যেন এই খনিজসম্পদ শুধু উত্তোলন নয়, প্রক্রিয়াজাত করাও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেই হয়। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া ইতিমধ্যে এই প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনাম এখন নতুন রেয়ার আর্থ প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র হিসেবে উঠে আসছে। মালয়েশিয়া ইতিমধ্যেই আমেরিকার মাউন্টেন পাস খনি থেকে আসা কনসেনট্রেট প্রক্রিয়াজাত করছে। ভিয়েতনামে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে এই খাতে, যদিও এ ব্যাপারে পরিবেশগত উদ্বেগও কম নয়। ইন্দোনেশিয়া রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা জারি করে বাধ্য করছে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে তাদের দেশেই প্রক্রিয়াজাত কারখানা স্থাপন করতে।
এই রেয়ার আর্থ কূটনীতির পেছনে কাজ করেছে ভূরাজনীতি। চীন এখনও বাজার নিয়ন্ত্রণে অদ্ভুত দক্ষ। তারা ইচ্ছেমতো উৎপাদন বাড়িয়ে দাম কমায়, আবার রপ্তানি রুদ্ধ করে দাম বাড়ায়। ২০২৪ সালের শেষ দিকে মিয়ানমারে রাজনৈতিক অস্থিরতায় সীমান্ত বন্ধ হয়ে গেলে রেয়ার আর্থের দাম ১৫ শতাংশ বেড়ে যায়। এখান থেকেই বোঝা যায় এই বাজার কতটা ভঙ্গুর। মিয়ানমারকে ঘিরে পশ্চিমা বিশ্বের মাথাব্যথার অন্যতম প্রধান কারণ এই রেয়ার আর্থ মিনারেলস।
সাম্প্রতিক (২০২৫) কিছু গবেষণায় জানা যায়, বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলেও রেয়ার আর্থ মিনারেলের সন্ধান পাওয়া গেছে। বলাই বাহুল্য, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এই ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের বাইরে নয়।
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ঘোষণা দিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের ১০ শতাংশ রেয়ার আর্থ নিজস্ব ভূখণ্ড থেকে, ৪০ শতাংশ প্রক্রিয়াজাতকরণ নিজেদের দেশে, আর ১৫ শতাংশ পুনর্ব্যবহৃত উপাদান থেকে সংগ্রহ করবে। নর্ডিক দেশগুলো, বিশেষত সুইডেন ও গ্রিনল্যান্ড, নতুন খনি আবিষ্কারের কাজে নামছে। তবে স্থানীয় জনগণের অধিকার ও পরিবেশের ভারসাম্য এসব দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
রেয়ার আর্থ আজ কেবল খনিজ পদার্থ নয়, এটি এক ধরনের ভূরাজনৈতিক মুদ্রা। শক্তি, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা – সব কিছুর ভিত্তি এখন এই উপাদানগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে। একদিকে ট্রাম্প প্রশাসন দ্রুত দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে চায়, অন্যদিকে চীন তার প্রভাব ধরে রাখতে চাইছে। অস্ট্রেলিয়া, জাপান, কানাডা ও ইউরোপ মিলে বিকল্প নেটওয়ার্ক গড়ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজও পৃথিবীর বেশিরভাগ ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ভিতরে চীনের কোনো না কোনো রেয়ার আর্থ উপাদান আছে।
ইতিহাসে যেমন একদিন তেল নির্ধারণ করেছিল সাম্রাজ্যের শক্তি, আজ সেই জায়গায় উঠে এসেছে, রেয়ার আর্থ মিনারেল। এটি অর্থনীতির, প্রযুক্তির এবং কূটনীতির তিনমুখী অস্ত্র। কয়লা, ইস্পাত ও তেলের যুগের পরে পৃথিবী এখন প্রবেশ করেছে এক নতুন “রেয়ার আর্থ” যুগে।

