Sunday, November 30, 2025

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ব্লগ সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এই সাইটে এখন, দেড়শোর বেশি বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা রয়েছে। আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeবিবিধ বিজ্ঞানউন্নতির অপর নাম উদ্ভাবন

উন্নতির অপর নাম উদ্ভাবন

এ বছরের অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন জোয়েল মকির, ফিলিপ আঘিওঁ এবং পিটার হুইট- এই তিনজন গবেষক। তাঁরা দেখিয়েছেন উন্নতি কেবল শ্রম, পুঁজি বা কারখানার সংখ্যা দিয়ে আসে না; উন্নতি ধরে রাখতে হলে একটি সমাজকে বারবার নতুন চিন্তা, নতুন প্রযুক্তি এবং নতুন আবিষ্কার সৃষ্টি করতে হয়। অর্থাৎ, টেকসই উন্নতির আসল ইঞ্জিন হলো উদ্ভাবন।

মকির দেখিয়েছেন – বিজ্ঞানচর্চা, উচ্চমানের শিক্ষা, মুক্ত বিতর্ক আর চিন্তার স্বাধীনতা যত দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠে, আবিষ্কারের সম্ভাবনাও ততই বাড়ে। ইউরোপে উচ্চমানের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা আর আলোচনার স্বচ্ছ পরিবেশ ছিল বলেই শিল্পবিপ্লব সম্ভব হয়েছিল। তিনি আরও বলেছিলেন, উন্নতি দীর্ঘস্থায়ী হতে হলে আবিষ্কারের পেছনে কেবল “এটা কাজ করে” বোঝাই নয়; “কেন কাজ করে” সেই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও জানা জরুরি। কারণ ব্যাখ্যা না থাকলে পরের প্রজন্ম আগের আবিষ্কারের ওপর দাঁড়িয়ে এগোতে পারে না। এর পাশাপাশি, সমাজকে নতুন চিন্তা গ্রহণের মতো উদার হতে হয়; তা না হলে দিন বদলের পথ মাঝপথেই বন্ধ হয়ে যায়।

আঘিওঁ ও হুইট দেখিয়েছেন, নতুন কিছুর আসা মানেই পুরনো কিছুর সরে যাওয়া। এটিই হচ্ছে “creative destruction” বা সৃষ্টির জন্য ধ্বংস। স্মার্টফোন হাতে আসায় ক্যামেরা, ক্যালেন্ডার, ঘড়ি, এমন কত কিছুই আর আলাদা করে লাগে না; ইলেকট্রিক গাড়ি আসায় পেট্রোল গাড়ির যুগ শেষের পথে। এই বদলই উন্নতির চালিকা শক্তি। 

তবে, বদলের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাতও শুরু হয়। পুরনো ব্যবসা নতুনকে ঠেকাতে চায়, প্রতিষ্ঠিত শক্তি তাদের প্রভাব হারাতে চায় না। এই সংঘাতকে সামলাতে না পারলে উদ্ভাবন থেমে যায়, আর উন্নতি ঢুকে পড়ে স্থবিরতায়।

নোবেল কমিটি বলছে, অর্থনৈতিক বৃদ্ধি কখনোই স্বাভাবিক বা নিশ্চিত কিছু নয়। মানব ইতিহাসের মূল সুর ছিল স্থবিরতা, কখনো সখনো কিছু উন্নতি হলেও তা আবার থেমে যেত। ধারাবাহিক উন্নতি, অর্থাৎ একের পর এক নতুন উদ্ভাবনের ধারা, এটা আধুনিক সভ্যতার এক বিশাল পরিবর্তন। আর এই ধারাকে টিকিয়ে রাখতে হলে সমাজকে নতুনের জন্য জায়গা করে দিতে হবে, পুরনোকে ছাড়া শিখতে হবে, এবং পরিবর্তনকে ভয় না পেয়ে গ্রহণ করতে হবে।

অতএব, উন্নতি মানে শুধু রাস্তা, সেতু‌, দালানকোঠা – এসব অবকাঠামোগত উন্নয়ন, কিংবা রপ্তানি বৃদ্ধির সংখ্যা নয়; উন্নতি মানে এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে নতুন ভাবনা জন্ম নিতে পারে, ভুলের অনুমতি থাকে, পরীক্ষা করার সাহস থাকে, আর পুরনোকে আঁকড়ে না ধরে নতুনকে স্বাগত জানানো হয়। 

এই নোবেল পুরস্কার আসলে একটি আগাম সতর্ক বার্তা। যতদিন না আমরা নতুনকে সৃষ্টি করতে, পুরনোকে বদলাতে এবং পরিবর্তনকে গ্রহণ করতে শিখছি, ততদিন উন্নয়ন স্থায়ী হবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, উন্নতির অপর নামই  – উদ্ভাবন। 

Tanvir Hossain
Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে প্রবল উৎসাহী। ‌স্কুলে পড়ার সময় অনুসন্ধানী বিজ্ঞান ক্লাবের সাথে জড়িত ছিলেন। তরুণ বয়স থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। তার লেখা বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। সাম্প্রতিক কালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য ভাষায় তুলে ধরেছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তার লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে। লেখালেখির পাশাপাশি দেশ ভ্রমণ এবং মহাকাশের ছবি তোলা তার প্রধান শখ। তানভীর হোসেনের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ এবং শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কৃষি বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি করার পর জেনেটিক্স এবং প্ল্যান্ট ব্রিডিংয়ে মাস্টার্স করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পরবর্তীতে একই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে বিজ্ঞানী হিসেবে এক দশক কাজ করার পর অভিবাসী হিসেবে পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়।‌ তারপর দীর্ঘ পঁচিশ বছর অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার পর অবসর নিয়েছেন। বর্তমানে আই পি পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments