এ বছরের অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন জোয়েল মকির, ফিলিপ আঘিওঁ এবং পিটার হুইট- এই তিনজন গবেষক। তাঁরা দেখিয়েছেন উন্নতি কেবল শ্রম, পুঁজি বা কারখানার সংখ্যা দিয়ে আসে না; উন্নতি ধরে রাখতে হলে একটি সমাজকে বারবার নতুন চিন্তা, নতুন প্রযুক্তি এবং নতুন আবিষ্কার সৃষ্টি করতে হয়। অর্থাৎ, টেকসই উন্নতির আসল ইঞ্জিন হলো উদ্ভাবন।
মকির দেখিয়েছেন – বিজ্ঞানচর্চা, উচ্চমানের শিক্ষা, মুক্ত বিতর্ক আর চিন্তার স্বাধীনতা যত দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠে, আবিষ্কারের সম্ভাবনাও ততই বাড়ে। ইউরোপে উচ্চমানের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা আর আলোচনার স্বচ্ছ পরিবেশ ছিল বলেই শিল্পবিপ্লব সম্ভব হয়েছিল। তিনি আরও বলেছিলেন, উন্নতি দীর্ঘস্থায়ী হতে হলে আবিষ্কারের পেছনে কেবল “এটা কাজ করে” বোঝাই নয়; “কেন কাজ করে” সেই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও জানা জরুরি। কারণ ব্যাখ্যা না থাকলে পরের প্রজন্ম আগের আবিষ্কারের ওপর দাঁড়িয়ে এগোতে পারে না। এর পাশাপাশি, সমাজকে নতুন চিন্তা গ্রহণের মতো উদার হতে হয়; তা না হলে দিন বদলের পথ মাঝপথেই বন্ধ হয়ে যায়।
আঘিওঁ ও হুইট দেখিয়েছেন, নতুন কিছুর আসা মানেই পুরনো কিছুর সরে যাওয়া। এটিই হচ্ছে “creative destruction” বা সৃষ্টির জন্য ধ্বংস। স্মার্টফোন হাতে আসায় ক্যামেরা, ক্যালেন্ডার, ঘড়ি, এমন কত কিছুই আর আলাদা করে লাগে না; ইলেকট্রিক গাড়ি আসায় পেট্রোল গাড়ির যুগ শেষের পথে। এই বদলই উন্নতির চালিকা শক্তি।
তবে, বদলের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাতও শুরু হয়। পুরনো ব্যবসা নতুনকে ঠেকাতে চায়, প্রতিষ্ঠিত শক্তি তাদের প্রভাব হারাতে চায় না। এই সংঘাতকে সামলাতে না পারলে উদ্ভাবন থেমে যায়, আর উন্নতি ঢুকে পড়ে স্থবিরতায়।
নোবেল কমিটি বলছে, অর্থনৈতিক বৃদ্ধি কখনোই স্বাভাবিক বা নিশ্চিত কিছু নয়। মানব ইতিহাসের মূল সুর ছিল স্থবিরতা, কখনো সখনো কিছু উন্নতি হলেও তা আবার থেমে যেত। ধারাবাহিক উন্নতি, অর্থাৎ একের পর এক নতুন উদ্ভাবনের ধারা, এটা আধুনিক সভ্যতার এক বিশাল পরিবর্তন। আর এই ধারাকে টিকিয়ে রাখতে হলে সমাজকে নতুনের জন্য জায়গা করে দিতে হবে, পুরনোকে ছাড়া শিখতে হবে, এবং পরিবর্তনকে ভয় না পেয়ে গ্রহণ করতে হবে।
অতএব, উন্নতি মানে শুধু রাস্তা, সেতু, দালানকোঠা – এসব অবকাঠামোগত উন্নয়ন, কিংবা রপ্তানি বৃদ্ধির সংখ্যা নয়; উন্নতি মানে এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে নতুন ভাবনা জন্ম নিতে পারে, ভুলের অনুমতি থাকে, পরীক্ষা করার সাহস থাকে, আর পুরনোকে আঁকড়ে না ধরে নতুনকে স্বাগত জানানো হয়।
এই নোবেল পুরস্কার আসলে একটি আগাম সতর্ক বার্তা। যতদিন না আমরা নতুনকে সৃষ্টি করতে, পুরনোকে বদলাতে এবং পরিবর্তনকে গ্রহণ করতে শিখছি, ততদিন উন্নয়ন স্থায়ী হবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, উন্নতির অপর নামই – উদ্ভাবন।

