
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যখন কোয়ান্টাম তত্ত্বের ভিত্তি গড়ে উঠছিল, তখন থেকেই বিজ্ঞানীরা জানতেন ইলেকট্রন কোনো নির্দিষ্ট কক্ষপথে চলে না; বরং তার অবস্থান নির্ধারিত হয় সম্ভাবনার ভিত্তিতে। ইলেকট্রনের অবস্থানকে প্রকাশ করা যায় একটি গাণিতিক সমীকরণে, যাকে বলে ওয়েভ ফাংশন। এই সমীকরণের প্রবর্তনের জন্য অস্ট্রিয়ান পদার্থবিদ আরভিন শ্রোয়েডিঙ্গার ১৯৩৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। তাঁর এই ওয়েভ ফাংশন সমীকরণ জানায়, ইলেকট্রন কোথায় পাওয়া যেতে পারে এবং সেই সম্ভাবনার মাত্রা কতটুকু। তবে এতদিন এই ধারণা ছিল সম্পূর্ণ তাত্ত্বিক, কেউ কখনো সেটিকে চোখে দেখেনি।
২০১৩ সালে সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক প্রথমবারের মতো সেই অদৃশ্য কোয়ান্টাম বাস্তবতাকে দৃশ্যমান করে তুললেন। তাঁরা ব্যবহার করেছেন এক বিশেষ পদ্ধতি, যার নাম ফটো-আয়নাইজেশন মাইক্রোস্কোপি। এই প্রযুক্তিতে হাইড্রোজেন পরমাণুকে একটি তীব্র লেজার রশ্মি দিয়ে উত্তেজিত করা হয়, যাতে তার একমাত্র ইলেকট্রনটি নিউক্লিয়াস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বেরিয়ে আসে।
ইলেকট্রনটি যখন পরমাণু থেকে বেরিয়ে আসে, তখন সেটি একধরনের “ইন্টারফেয়ারেন্স প্যাটার্ন” তৈরি করে, যেটা ইলেকট্রনের তরঙ্গ-প্রকৃতির সরাসরি প্রমাণ। গবেষকেরা হাজার হাজার ইলেকট্রনের অবস্থান রেকর্ড করে সেই প্যাটার্নকে পুনর্গঠন করেন। সেই ডেটার ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয় ইতিহাসের প্রথম বাস্তব ছবি – একটি হাইড্রোজেন পরমাণুর ইলেকট্রন অরবিটালের দৃশ্যরূপ।
ছবিটিতে দেখা যায় একাধিক রঙিন বৃত্ত বা তরঙ্গাকৃতি অঞ্চল। প্রতিটি অঞ্চল আসলে ইলেকট্রনের “প্রবাবলিটি ডেনসিটি” বা সম্ভাবনামূলক ঘনত্ব নির্দেশ করে। যেখানে ইলেকট্রন থাকার সম্ভাবনা বেশি, সেখানে রঙও বেশি ঘন। এটি কোনো গ্রহের মতো নির্দিষ্ট কক্ষপথ নয়; বরং এটি হলো ইলেকট্রনের সম্ভাবনার মেঘ, যেটা শ্রোয়েডিঙ্গারের সমীকরণের সরাসরি দৃশ্যমান রূপ।
এই পরীক্ষার ফলাফল কোয়ান্টাম তত্ত্বের একটি মৌলিক ভবিষ্যদ্বাণীকে নিশ্চিত করে – ইলেকট্রনের অবস্থান নির্দিষ্ট নয়, তার অস্তিত্বই হলো একধরনের তরঙ্গ-সম্ভাবনা।
এক শতাব্দী আগে যেটা ছিল গাণিতিক সমীকরণ, আজ সেটা বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের চোখে দৃশ্যমান হয়েছে। এটি কেবল একটি ছবি নয়; এটি কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের গভীরতম সত্যের এক বাস্তব প্রতিফলন। যেখানে বাস্তবতা নিজেই তরঙ্গ আকারে বয়ে চলে সম্ভাবনার সমুদ্রে।

