Sunday, November 30, 2025

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ব্লগ সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এই সাইটে এখন, দেড়শোর বেশি বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা রয়েছে। আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeকোয়ান্টাম বিজ্ঞানসম্ভাবনার মেঘে ইলেকট্রনের ছায়া

সম্ভাবনার মেঘে ইলেকট্রনের ছায়া

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যখন কোয়ান্টাম তত্ত্বের ভিত্তি গড়ে উঠছিল, তখন থেকেই বিজ্ঞানীরা জানতেন ইলেকট্রন কোনো নির্দিষ্ট কক্ষপথে চলে না; বরং তার অবস্থান নির্ধারিত হয় সম্ভাবনার ভিত্তিতে। ইলেকট্রনের অবস্থানকে প্রকাশ করা যায় একটি গাণিতিক সমীকরণে, যাকে বলে ওয়েভ ফাংশন। এই সমীকরণের প্রবর্তনের জন্য অস্ট্রিয়ান পদার্থবিদ আরভিন শ্রোয়েডিঙ্গার ১৯৩৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। তাঁর এই ওয়েভ ফাংশন সমীকরণ জানায়, ইলেকট্রন কোথায় পাওয়া যেতে পারে এবং সেই সম্ভাবনার মাত্রা কতটুকু। তবে এতদিন এই ধারণা ছিল সম্পূর্ণ তাত্ত্বিক, কেউ কখনো সেটিকে চোখে দেখেনি।

২০১৩ সালে সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক প্রথমবারের মতো সেই অদৃশ্য কোয়ান্টাম বাস্তবতাকে দৃশ্যমান করে তুললেন। তাঁরা ব্যবহার করেছেন এক বিশেষ পদ্ধতি, যার নাম ফটো-আয়নাইজেশন মাইক্রোস্কোপি। এই প্রযুক্তিতে হাইড্রোজেন পরমাণুকে একটি তীব্র লেজার রশ্মি দিয়ে উত্তেজিত করা হয়, যাতে তার একমাত্র ইলেকট্রনটি নিউক্লিয়াস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বেরিয়ে আসে।

ইলেকট্রনটি যখন পরমাণু থেকে বেরিয়ে আসে, তখন সেটি একধরনের “ইন্টারফেয়ারেন্স প্যাটার্ন” তৈরি করে, যেটা ইলেকট্রনের তরঙ্গ-প্রকৃতির সরাসরি প্রমাণ। গবেষকেরা হাজার হাজার ইলেকট্রনের অবস্থান রেকর্ড করে সেই প্যাটার্নকে পুনর্গঠন করেন। সেই  ডেটার ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয় ইতিহাসের প্রথম বাস্তব ছবি – একটি হাইড্রোজেন পরমাণুর ইলেকট্রন অরবিটালের দৃশ্যরূপ। 

ছবিটিতে দেখা যায় একাধিক রঙিন বৃত্ত বা তরঙ্গাকৃতি অঞ্চল। প্রতিটি অঞ্চল আসলে ইলেকট্রনের “প্রবাবলিটি ডেনসিটি” বা সম্ভাবনামূলক ঘনত্ব নির্দেশ করে। যেখানে ইলেকট্রন থাকার সম্ভাবনা বেশি, সেখানে রঙও বেশি ঘন। এটি কোনো গ্রহের মতো নির্দিষ্ট কক্ষপথ নয়; বরং এটি হলো ইলেকট্রনের সম্ভাবনার মেঘ, যেটা শ্রোয়েডিঙ্গারের সমীকরণের সরাসরি দৃশ্যমান রূপ।

এই পরীক্ষার ফলাফল কোয়ান্টাম তত্ত্বের একটি মৌলিক ভবিষ্যদ্বাণীকে নিশ্চিত করে – ইলেকট্রনের অবস্থান নির্দিষ্ট নয়, তার অস্তিত্বই হলো একধরনের তরঙ্গ-সম্ভাবনা।

এক শতাব্দী আগে যেটা ছিল গাণিতিক সমীকরণ, আজ সেটা বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের চোখে দৃশ্যমান হয়েছে। এটি কেবল একটি ছবি নয়; এটি কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের গভীরতম সত্যের এক বাস্তব প্রতিফলন। যেখানে বাস্তবতা নিজেই তরঙ্গ আকারে বয়ে চলে সম্ভাবনার সমুদ্রে।

Tanvir Hossain
Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে প্রবল উৎসাহী। ‌স্কুলে পড়ার সময় অনুসন্ধানী বিজ্ঞান ক্লাবের সাথে জড়িত ছিলেন। তরুণ বয়স থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। তার লেখা বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। সাম্প্রতিক কালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য ভাষায় তুলে ধরেছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তার লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে। লেখালেখির পাশাপাশি দেশ ভ্রমণ এবং মহাকাশের ছবি তোলা তার প্রধান শখ। তানভীর হোসেনের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ এবং শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কৃষি বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি করার পর জেনেটিক্স এবং প্ল্যান্ট ব্রিডিংয়ে মাস্টার্স করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পরবর্তীতে একই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে বিজ্ঞানী হিসেবে এক দশক কাজ করার পর অভিবাসী হিসেবে পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়।‌ তারপর দীর্ঘ পঁচিশ বছর অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার পর অবসর নিয়েছেন। বর্তমানে আই পি পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments