Sunday, November 30, 2025

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ব্লগ সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এই সাইটে এখন, দেড়শোর বেশি বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা রয়েছে। আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeবিজ্ঞানীদের কথাজেমস ডি. ওয়াটসনের প্রয়াণ

জেমস ডি. ওয়াটসনের প্রয়াণ

ডিএনএর গঠন উন্মোচনের নায়ক জেমস ডি. ওয়াটসন আর নেই। ৯৭ বছর বয়সে, নিজগৃহে আজ তিনি শেষ নিঃশ্বাস ফেললেন। বিজ্ঞানের ইতিহাসে তাঁর নাম চিরস্থায়ী, কারণ তিনি এবং ফ্রান্সিস ক্রিক মিলে দেখিয়েছিলেন জীবনের নকশা লুকিয়ে আছে এক প্যাঁচানো সিঁড়ির মতো আণবিক গঠনে, যাকে আমরা আজ জানি, ডিএনএর ডাবল হেলিক্স নামে।
১৯৫৩ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার সময়, ওয়াটসন ও তাঁর সহকর্মী ফ্রান্সিস ক্রিক আবিষ্কার করেন ডিএনএর আণবিক গঠন। এই গঠন দুইটি পরস্পর প্যাঁচানো চেইনের মতো, যেখানে ধাপে ধাপে সাজানো থাকে জীবনের জেনেটিক কোড। তাঁদের এই আবিষ্কার থেকেই জন্ম নেয় আধুনিক জেনেটিক্স, মলিক্যুলার বায়োলজি, এবং জিনোম বিজ্ঞানের যুগ।
১৯৬২ সালে তিনজন বিজ্ঞানী ওয়াটসন, ক্রিক ও মরিস উইলকিন্স এই আবিষ্কারটির জন্য যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পান। কিন্তু এই গৌরবের আড়ালে ছিল নৈতিক বিতর্কও। ওয়াটসন ও ক্রিক তাঁদের এই গবেষণায় ব্যবহার করেছিলেন একটি বিশেষ তথ্য, যার উৎস ছিলেন রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন নামে একজন মহিলা বিজ্ঞানী। তাঁর তোলা বিখ্যাত “ফটো ফিফটি ওয়ান” ডিএনএর গঠন নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিনকে তাঁর গবেষণার জন্য যথাযথ কৃতিত্ব দেওয়া হয়নি। তিনি মারা যান মাত্র ৩৭ বছর বয়সে, ডিএনএ গঠনের জন্য নোবেল পুরস্কারের ঘোষণার আগে। ইতিহাসে এই ঘটনা দীর্ঘদিন বিজ্ঞানমহলকে অস্বস্তিতে রেখেছে।
ওয়াটসনের জীবনে বিতর্ক এখানেই থেমে থাকেনি। ২০০৭ সালে টাইমস পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, কৃষ্ণাঙ্গদের বুদ্ধিমত্তা নাকি শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় কম। বিজ্ঞানীরা তাঁর এই বর্ণবাদী মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠিত গবেষণাগার, কোল্ড স্প্রিং হারবার ল্যাবরেটরি‌র প্রধানের পদ থেকে তাকে সরিয়ে দেয়া হয়। ২০১৯ সালে আরও কিছু বর্ণবাদী মন্তব্যের জন্য তাঁকে সম্পূর্ণভাবে বরখাস্ত করা হয়। এই বর্ণবাদী মানসিকতা তাঁর উত্তরাধিকারকে চিরকাল প্রশ্নবিদ্ধ করে রাখবে।
তবুও ওয়াটসনের অবদান অস্বীকার করা যায় না। তাঁর লেখা The Double Helix আজও বিজ্ঞানচর্চার আড়ালের গল্প হিসেবে বিখ্যাত। তিনি বিশ্বাস করতেন, ডিএনএর রহস্য বোঝার মধ্য দিয়েই মানুষ একদিন নিজের ভবিষ্যৎ বুঝতে পারবে। পরে তিনি মানবজিনোম প্রকল্পেও যুক্ত হন, যেটা মানব জাতির জিনোম মানচিত্র তৈরির যুগান্তকারী উদ্যোগ।
জেমস ওয়াটসন ছিলেন প্রতিভা ও ত্রুটির এক আশ্চর্য সংমিশ্রণ। বুদ্ধির দীপ্তি যেমন ছিল, তেমনি ছিল বিতর্কের ছায়া। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পরও তিনি রয়ে যাবেন ডিএনএ অণুর ভেতরে, জীবনের সেই সর্পিল সিঁড়ির অংশ হয়ে।
Tanvir Hossain
Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে প্রবল উৎসাহী। ‌স্কুলে পড়ার সময় অনুসন্ধানী বিজ্ঞান ক্লাবের সাথে জড়িত ছিলেন। তরুণ বয়স থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। তার লেখা বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। সাম্প্রতিক কালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য ভাষায় তুলে ধরেছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তার লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে। লেখালেখির পাশাপাশি দেশ ভ্রমণ এবং মহাকাশের ছবি তোলা তার প্রধান শখ। তানভীর হোসেনের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ এবং শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কৃষি বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি করার পর জেনেটিক্স এবং প্ল্যান্ট ব্রিডিংয়ে মাস্টার্স করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পরবর্তীতে একই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে বিজ্ঞানী হিসেবে এক দশক কাজ করার পর অভিবাসী হিসেবে পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়।‌ তারপর দীর্ঘ পঁচিশ বছর অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার পর অবসর নিয়েছেন। বর্তমানে আই পি পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments