Sunday, November 30, 2025

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ব্লগ সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এই সাইটে এখন, দেড়শোর বেশি বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা রয়েছে। আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeবিজ্ঞানীদের কথাএক্স-রের জন্মকথা

এক্স-রের জন্মকথা

১৮৯৫ সালের নভেম্বর মাসের ৮ তারিখ। কনকনে শীতের রাত। জার্মানির ভুরৎসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ল্যাবরেটরির অন্ধকার কোনে একা বসে গবেষণা করছেন পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক উইলহেল্ম কনরাড রনটগেন। তাঁর সামনে টেবিলে রাখা “লেনার্ড টিউব”। যার ভেতর দিয়ে ছুটে চলেছে ক্যাথোড রে, অর্থাৎ ঋণাত্মক চার্জযুক্ত কণার ধারা। টিউবটি কালো কাগজে মোড়ানো, যাতে সামান্য আলোও বাইরে বেরোতে না পারে। সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক, কিন্তু হঠাৎ তাঁর চোখে ধরা পড়ল আশ্চর্য এক দৃশ্য ।

টেবিলের পাশে রাখা ছিল বেরিয়াম প্লাটিনোসায়ানাইডে মোড়া একটি ফ্লূরোসেন্ট পর্দা। হঠাৎ করে সেই পর্দাটি আলো ঝলমল করে উঠলো। যেন অদৃশ্য কোনো আলো তার ভেতরে প্রাণ জাগিয়ে তুলেছে। এটা তো হওয়ার কথা নয়। টিউবের আলো কালো কাগজে ঢেকে রাখা হয়েছে। তবুও সেই অদৃশ্য আলো ল্যাবরেটরির অন্ধকারে অদ্ভুত এক আবেশ ছড়িয়ে দিল।

রনটগেন অবাক হয়ে ফ্লূরোসেন্ট পর্দাটিকে একটু দূরে সরালেন, তবু সেটি আলো ছড়াচ্ছে। তিনি আরও দূরে রাখলেন, প্রায় দুই মিটার পর্যন্ত, কিন্তু তবুও সেই আলো জ্বলজ্বল করতে থাকলো। তখনই তিনি বুঝলেন, এখানে এমন এক অদ্ভুত বিকিরণ ঘটছে, যেটা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু পদার্থ ভেদ করে দূরে ছড়িয়ে পড়ছে।

এরপর শুরু হলো তাঁর নিরলস পরীক্ষা-নিরীক্ষা। তিনি একে একে নানা বস্তু সেই অজানা রশ্মির সামনে রাখলেন। কাগজ, কাঠ, ধাতু, সবই পরীক্ষা করা হলো। প্রতিটি পদার্থ আলাদা প্রতিক্রিয়া দেখাল। একদিন তিনি তাঁর স্ত্রী বার্থার হাতকে ফটোগ্রাফিক প্লেটের সামনে রাখলেন। হাতের উপর সেই অজানা রশ্মির বিকিরণ ফেললেন। তারপর প্লেটটি ধুয়ে দেখা গেল এক বিস্ময়কর দৃশ্য। বার্থার হাতের হাড়গুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, আঙুলে থাকা বিয়ের আংটিও ঝকমক করছে, কিন্তু হাতের চামড়া-মাংস কোথাও নেই। মানুষের শরীরের ভেতরের হাড়ের কাঠামো প্রথমবারের মতো ছবিতে ধরা পড়লো।

রনটগেন এই আলোকরশ্মির নাম দিলেন এক্স-রে, অর্থাৎ অজানা রশ্মি। তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে প্রমাণ করলেন, এই রশ্মি ধাতু ছাড়া প্রায় সবকিছুই ভেদ করতে পারে। ১৮৯৫ সালের শেষদিকে তিনি তাঁর গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করলেন। আর মুহূর্তেই গোটা বিজ্ঞানজগৎ বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল।

তারপর চিকিৎসাবিজ্ঞানে শুরু হলো এক নতুন যুগ। এক্স-রে দিয়ে অস্ত্রোপচার ছাড়াই দেহের ভেতর দেখা সম্ভব হলো। ভাঙা হাড়, ফুসফুসের ছায়া, শরীরের গোপন ব্যাধি, সব ধরা পড়ল এক্স-রে ছবিতে। মানবকল্যাণে এই আবিষ্কারের গুরুত্ব এতই গভীর ছিল যে, ১৯০১ সালে রনটগেন পান পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রথম নোবেল পুরস্কার।

তাঁর সেই আবিষ্কার আজও বেঁচে আছে প্রতিটি হাসপাতালের রেডিওলজি কক্ষে, প্রতিদিন নতুন করে অসংখ্য প্রাণ বাঁচাচ্ছে। প্রতি বছর ৮ নভেম্বর পৃথিবীজুড়ে পালিত হয়, “ওয়ার্ল্ড রেডিওগ্রাফি ডে”। এই দিনটি স্মরণ করিয়ে দেয়, একজন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের অসামান্য কৌতূহল ও অধ্যবসায় কতটা শক্তিশালী হতে পারে।

Tanvir Hossain
Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে প্রবল উৎসাহী। ‌স্কুলে পড়ার সময় অনুসন্ধানী বিজ্ঞান ক্লাবের সাথে জড়িত ছিলেন। তরুণ বয়স থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। তার লেখা বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। সাম্প্রতিক কালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য ভাষায় তুলে ধরেছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তার লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে। লেখালেখির পাশাপাশি দেশ ভ্রমণ এবং মহাকাশের ছবি তোলা তার প্রধান শখ। তানভীর হোসেনের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ এবং শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কৃষি বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি করার পর জেনেটিক্স এবং প্ল্যান্ট ব্রিডিংয়ে মাস্টার্স করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পরবর্তীতে একই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে বিজ্ঞানী হিসেবে এক দশক কাজ করার পর অভিবাসী হিসেবে পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়।‌ তারপর দীর্ঘ পঁচিশ বছর অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার পর অবসর নিয়েছেন। বর্তমানে আই পি পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments