অস্ট্রেলিয়াতে এখন বসন্তকাল চলছে। কিন্তু ক্যানবেরার বর্তমান আবহাওয়া দেখে সেটা বোঝার উপায় নেই। যখন তখন বৃষ্টি ঝরছে- মাঝে মাঝে ঝমঝম করে। বৃষ্টি হলে দেশের কথা মনে পড়ে, তখন ভালোই লাগে। তবে যখন টানা বৃষ্টি পড়ে আর ঠান্ডা বাড়ে, তখন খুব বিরক্ত লাগে। আজ অস্ট্রেলিয়া এবং ইন্ডিয়ার মধ্যে টি টোয়েন্টি ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলাম। খেলার মধ্যেই হঠাৎ তুমুল বৃষ্টি শুরু হলো, তারপর বৃষ্টির জন্য খেলা ভন্ডুল। কেমন লাগে বলুন?
সাধারণত অক্টোবর মাসে আকাশ থাকে পরিষ্কার, তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। কিন্তু এবারের আবহাওয়া ব্যতিক্রম। সারাদিন সূর্যের দেখা নেই, তাপমাত্রা কম, রাতে হিটার চালাতে হচ্ছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আরো ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তারা বলেছে, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের বর্তমান সমুদ্র বায়ু পরিস্থিতি এখনো লা-নিনা ধাঁচের থাকায় অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলে বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
লা-নিনার কথা শুনে এল-নিনোর কথাও মনে পড়ে গেল। এল-নিনো ও লা-নিনা হলো দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের আবহাওয়া পরিবর্তনের দুটো ভিন্ন রূপ। স্প্যানিশ ভাষায় “এল-নিনো” মানে ছেলেটা (the boy), আর “লা-নিনা” মানে মেয়েটা (the girl)। সময়ে সময়ে এই দুই দুষ্টু ছেলে ও মেয়ে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে আবির্ভূত হয় এবং আবহাওয়াকে নাটকীয়ভাবে পাল্টে দেয়।
এল-নিনো ও লা-নিনা হলো একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে সমুদ্রস্রোতের দিক পাল্টালে এই দুই বিপরীত প্রকৃতির ঘটনা ঘটে। সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর এরা দেখা দেয়, তবে এর কোনো বাঁধা ধরা নিয়ম নেই।
বিজ্ঞানীরা এই ওঠানামাকে গাণিতিকভাবে ধরতে যে সূচক ব্যবহার করেন তার নাম, সাদার্ন অসিলেশন ইন্ডেক্স (SOI)। এল-নিনো ও লা-নিনা সাধারণত নয় থেকে বারো মাস স্থায়ী হয়, তবে কখনো আরও বেশি হয়। তারপর আবহাওয়া স্বাভাবিকের দিকে ফিরে যায়। যুগ যুগ ধরে এভাবেই চলছে।
এল-নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে উষ্ণ সমুদ্রস্রোতের দিক পরিবর্তন হয়ে আমেরিকা মহাদেশের দক্ষিণ দিক বরাবর প্রবাহিত হয়। তখন অস্ট্রেলিয়াতে বৃষ্টিপাত কমে যায়, খরা দেখা দেয়। কিন্তু দক্ষিণ আমেরিকায় বৃষ্টি বেড়ে যায়। আবার কয়েক বছর পর লা-নিনার প্রভাবে ঠিক উল্টো দৃশ্য দেখা যায়। তখন উষ্ণ স্রোত উল্টো দিকে, অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়ার দিকে ধাবিত হয়। ফলে অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলে বৃষ্টিপাত বেড়ে যায়, নদী-নালা উপচে পড়ে, ঝড়-বন্যা দেখা দেয়।
আবহাওয়া অফিস বলছে, আনুষ্ঠানিকভাবে লা-নিনার পর্যায় শেষ ঘোষণা করা হলেও সমুদ্র-বাতাসের ভেতরের অবস্থা এখনো লা-নিনা ধাঁচেই আছে। তাই বৃষ্টিপাত থামার লক্ষণ এখনো নেই। এই ভবিষ্যদ্বাণীও নির্দিষ্ট নয়, হঠাৎ কমতেও পারে, আবার হঠাৎ বাড়তেও পারে। জানিনা মেঘবতী দুষ্টু মেয়েটা আর কতদিন থাকবে এখানে।

