Sunday, November 30, 2025

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ব্লগ সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এই সাইটে এখন, দেড়শোর বেশি বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা রয়েছে। আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeপ্রকৃতি ও পরিবেশএল-নিনো ও লা-নিনা

এল-নিনো ও লা-নিনা

অস্ট্রেলিয়াতে এখন বসন্তকাল চলছে। কিন্তু ক্যানবেরার বর্তমান আবহাওয়া দেখে সেটা বোঝার  উপায় নেই। যখন তখন বৃষ্টি ঝরছে- মাঝে মাঝে ঝমঝম করে। বৃষ্টি হলে দেশের কথা মনে পড়ে, তখন ভালোই লাগে। তবে যখন টানা বৃষ্টি পড়ে আর ঠান্ডা বাড়ে, তখন খুব বিরক্ত লাগে। আজ অস্ট্রেলিয়া এবং ইন্ডিয়ার মধ্যে টি টোয়েন্টি ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলাম। খেলার মধ্যেই হঠাৎ তুমুল বৃষ্টি শুরু হলো, তারপর বৃষ্টির জন্য খেলা ভন্ডুল। কেমন লাগে বলুন?

সাধারণত অক্টোবর মাসে আকাশ থাকে পরিষ্কার, তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। কিন্তু এবারের আবহাওয়া ব্যতিক্রম। সারাদিন সূর্যের দেখা নেই, তাপমাত্রা কম, রাতে হিটার চালাতে হচ্ছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আরো ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তারা বলেছে, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের বর্তমান সমুদ্র বায়ু পরিস্থিতি এখনো লা-নিনা ধাঁচের থাকায় অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলে বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

লা-নিনার কথা শুনে এল-নিনোর কথাও মনে পড়ে গেল। এল-নিনো ও লা-নিনা হলো দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের আবহাওয়া পরিবর্তনের দুটো ভিন্ন রূপ। স্প্যানিশ ভাষায় “এল-নিনো” মানে ছেলেটা (the boy), আর “লা-নিনা” মানে মেয়েটা (the girl)। সময়ে সময়ে এই দুই দুষ্টু ছেলে ও মেয়ে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে আবির্ভূত হয় এবং আবহাওয়াকে নাটকীয়ভাবে পাল্টে দেয়। 

এল-নিনো ও লা-নিনা হলো একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে সমুদ্রস্রোতের দিক পাল্টালে এই দুই বিপরীত প্রকৃতির ঘটনা ঘটে। সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর এরা দেখা দেয়, তবে এর কোনো বাঁধা ধরা নিয়ম নেই।

বিজ্ঞানীরা এই ওঠানামাকে গাণিতিকভাবে ধরতে যে সূচক ব্যবহার করেন তার নাম, সাদার্ন অসিলেশন ইন্ডেক্স (SOI)। এল-নিনো ও লা-নিনা সাধারণত নয় থেকে বারো মাস স্থায়ী হয়, তবে কখনো আরও বেশি হয়। তারপর আবহাওয়া স্বাভাবিকের দিকে ফিরে যায়। যুগ যুগ ধরে এভাবেই চলছে।

এল-নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে উষ্ণ সমুদ্রস্রোতের দিক পরিবর্তন হয়ে আমেরিকা মহাদেশের দক্ষিণ দিক বরাবর প্রবাহিত হয়। তখন অস্ট্রেলিয়াতে বৃষ্টিপাত কমে যায়, খরা দেখা দেয়। কিন্তু দক্ষিণ আমেরিকায় বৃষ্টি বেড়ে যায়। আবার কয়েক বছর পর লা-নিনার প্রভাবে ঠিক উল্টো দৃশ্য দেখা যায়। তখন উষ্ণ স্রোত উল্টো দিকে, অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়ার দিকে ধাবিত হয়। ফলে অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলে বৃষ্টিপাত বেড়ে যায়, নদী-নালা উপচে পড়ে, ঝড়-বন্যা দেখা দেয়।

আবহাওয়া অফিস বলছে, আনুষ্ঠানিকভাবে লা-নিনার পর্যায় শেষ ঘোষণা করা হলেও সমুদ্র-বাতাসের ভেতরের অবস্থা এখনো লা-নিনা ধাঁচেই আছে। তাই বৃষ্টিপাত থামার লক্ষণ এখনো নেই। এই ভবিষ্যদ্বাণীও নির্দিষ্ট নয়, হঠাৎ কমতেও পারে, আবার হঠাৎ বাড়তেও পারে। জানিনা মেঘবতী দুষ্টু মেয়েটা আর কতদিন থাকবে এখানে।

Tanvir Hossain
Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে প্রবল উৎসাহী। ‌স্কুলে পড়ার সময় অনুসন্ধানী বিজ্ঞান ক্লাবের সাথে জড়িত ছিলেন। তরুণ বয়স থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। তার লেখা বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। সাম্প্রতিক কালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য ভাষায় তুলে ধরেছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তার লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে। লেখালেখির পাশাপাশি দেশ ভ্রমণ এবং মহাকাশের ছবি তোলা তার প্রধান শখ। তানভীর হোসেনের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ এবং শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কৃষি বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি করার পর জেনেটিক্স এবং প্ল্যান্ট ব্রিডিংয়ে মাস্টার্স করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পরবর্তীতে একই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে বিজ্ঞানী হিসেবে এক দশক কাজ করার পর অভিবাসী হিসেবে পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়।‌ তারপর দীর্ঘ পঁচিশ বছর অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার পর অবসর নিয়েছেন। বর্তমানে আই পি পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments