Homeকোয়ান্টাম বিজ্ঞানতরঙ্গের সমীকরণ

তরঙ্গের সমীকরণ

শতবর্ষী সমীকরণ 

আজ থেকে ঠিক একশ বছর আগে, ১৯২৬ সালে, অস্ট্রিয়ান পদার্থবিদ আরভিন শ্রোডিঙ্গার কয়েকটি গাণিতিক প্রতীক দিয়ে এমন একটি সমীকরণ লিখেছিলেন, যেটা পরে আধুনিক কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে কিছু কিছু আবিষ্কার আছে, যেগুলো শুধু নতুন জ্ঞান দেয় না, বরং মানুষের চিন্তার ধরনটাই বদলে দেয়। শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণ ছিল তেমনি একটি আবিষ্কার। কারণ এটি বিজ্ঞানীদের সামনে এমন এক জগতের দরজা খুলে দিয়েছিল, যেখানে বাস্তবতা নিউটনের পরিচিত নিয়মে চলে না।

 কণা না তরঙ্গ?

বিশ শতকের শুরুতে বিজ্ঞানীরা পরমাণুর আচরণ নিয়ে গভীর সংকটে পড়েছিলেন। ইলেকট্রন কখনো কণার মতো আচরণ করছে, আবার কখনো তরঙ্গের মতো। আলোও একই ধরনের দ্বৈত আচরণ দেখাচ্ছে। প্রকৃতি নিজেই যেন দুই ভিন্ন রূপে উপস্থিত।
১৯২৪ সালে ফরাসি পদার্থবিদ লুই দ্য ব্রয়ী একটি দুঃসাহসী ধারণা দেন। তিনি প্রস্তাব করেন, শুধু আলো নয়, পদার্থের কণিকাও তরঙ্গের মতো আচরণ করতে পারে। অর্থাৎ ইলেকট্রনেরও একটি তরঙ্গ প্রকৃতি রয়েছে।
এই ধারণাই গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল শ্রোডিঙ্গারকে। তিনি ভাবলেন, যদি ইলেকট্রন সত্যিই তরঙ্গের মতো আচরণ করে, তাহলে নিশ্চয়ই সেই তরঙ্গের একটি সমীকরণ থাকা উচিত। দীর্ঘ চিন্তা, ব্যর্থতা আর অসংখ্য গাণিতিক পরীক্ষার পর তিনি তৈরি করলেন ইলেকট্রনের তরঙ্গের সেই বিখ্যাত সমীকরণ:
iħ ∂ψ/∂t = Ĥψ
ছোট্ট একটি পার্শিয়াল ডিফারেনশিয়াল সমীকরণ। কয়েকটি অদ্ভুত প্রতীক। কিন্তু এই সমীকরণই বদলে দিয়েছিল মানুষের বাস্তবতাকে বোঝার ধারণা। এটি আজ “শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণ” নামেই সুপরিচিত।

সম্ভাবনার জগৎ

সমীকরণটি দেখতে হয়তো নিরীহ একটি গাণিতিক সূত্র। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে কোয়ান্টাম জগতের অদ্ভুত আচরণ। এখানে “Ψ” বা সাই (psi) হলো “ওয়েভ ফাংশন”। এটি কোনো কণার নির্দিষ্ট অবস্থান সরাসরি বলে না। বরং বলে, কোথায় তাকে পাওয়ার সম্ভাবনা কত। এটাই ছিল সবচেয়ে বিপ্লবী ধারণা।
নিউটনের চিরায়ত বলবিদ্যার নিয়মে কোনো বস্তুর বর্তমান অবস্থা জানা থাকলে তার ভবিষ্যৎও নির্ভুলভাবে গণনা করা সম্ভব। কিন্তু শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণ বলল, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জগতে প্রকৃতি নিশ্চিত ভাষায় নয়, বরং সম্ভাবনার ভাষায় কথা বলে। সেখানে বাস্তবতা যেন এক ধরনের সম্ভাবনার মেঘ। আর শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণ সেই মেঘের ভেতরে ইলেকট্রনকে কোথায় পাওয়া যেতে পারে, সেই সম্ভাবনার মানচিত্র এঁকে দেয়।

শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল

পরবর্তী সময়ে, কোয়ান্টাম সম্ভাবনার এই অদ্ভুত ধারণাটি বোঝাতে শ্রোডিঙ্গার একটি বিখ্যাত পরীক্ষার কথা বলেছিলেন, যেটি আজ “শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল” নামে সুপরিচিত। এটি ছিল একটি কাল্পনিক থট এক্সপেরিমেন্ট।
মনে করুন, একটি সম্পূর্ণ বন্ধ বাক্সের ভেতরে একটি বিড়াল রাখা হয়েছে। সেই বাক্সের মধ্যে আছে একটি তেজস্ক্রিয় পরমাণু, একটি গাইগার কাউন্টার, একটি ছোট হাতুড়ি এবং সায়ানাইডভর্তি কাঁচের শিশি। পুরো পরীক্ষাটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে, যদি তেজস্ক্রিয় পরমাণুটি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে বিকিরণ ছড়ায়, তাহলে গাইগার কাউন্টার সেটি শনাক্ত করবে। সঙ্গে সঙ্গে যান্ত্রিকভাবে হাতুড়িটি নেমে এসে কাঁচের শিশিটি ভেঙে দেবে। তখন সায়ানাইড বেরিয়ে বিড়ালটি মারা যাবে। আর যদি পরমাণুটি ক্ষয়প্রাপ্ত না হয়, তাহলে কিছুই ঘটবে না, বিড়ালটিও বেঁচে থাকবে।
সমস্যাটি শুরু হয় কোয়ান্টাম জগতের অদ্ভুত নিয়ম থেকে। কোয়ান্টাম মেকানিক্স অনুযায়ী, তেজস্ক্রিয় পরমাণুর ক্ষয় হওয়া একটি সম্ভাবনাভিত্তিক ঘটনা। বাক্স খোলার আগ পর্যন্ত পরমাণুটি যেন একই সঙ্গে “ক্ষয়প্রাপ্ত” এবং “ক্ষয়প্রাপ্ত নয়” –  এই দুই অবস্থায়ই থাকতে পারে। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ভাষায় একে বলা হয় “সুপারপজিশন”। আর যেহেতু বিড়ালের জীবন-মৃত্যু পুরোপুরি নির্ভর করছে সেই তেজস্ক্রিয় পরমাণুর অবস্থার ওপর, তাই কোয়ান্টাম নিয়ম অনুযায়ী বাক্স খোলার আগ পর্যন্ত বিড়ালটিও একই সঙ্গে জীবিত এবং মৃত – দুই অবস্থাতেই আছে বলে ধরে নিতে হবে।
অবশ্য বাস্তবে কখনো কোনো বিড়ালকে এভাবে বাক্সে বন্দি করা হয়নি। এটি ছিল সম্পূর্ণ কাল্পনিক একটি উদাহরণ। শ্রোডিঙ্গার আসলে বোঝাতে চেয়েছিলেন, কোয়ান্টাম জগতের নিয়মগুলোকে যদি সরাসরি আমাদের দৈনন্দিন জগতে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে বাস্তবতা কতটা অদ্ভুত এবং অবিশ্বাস্য শোনাতে পারে।

প্রযুক্তির অন্তরালে

তবে যতই অদ্ভুত মনে হোক, আধুনিক প্রযুক্তির বিশাল অংশ দাঁড়িয়ে আছে শ্রোডিঙ্গারের এই সমীকরণের ওপর। পরমাণুর ভেতরে ইলেকট্রনের আচরণ, রাসায়নিক বন্ধন, সেমিকন্ডাক্টর, ট্রানজিস্টর, লেজার – এ সবকিছুর পেছনেই কাজ করছে শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণ। আজকের স্মার্টফোন, কম্পিউটার, এমআরআই স্ক্যান কিংবা আধুনিক ইলেকট্রনিক্সের জগতও এক অর্থে এই সমীকরণেরই বাস্তব রূপ।

 অমীমাংসিত রহস্য

আজ একশ বছর পরও সেই কোয়ান্টাম রহস্য পুরোপুরি সমাধান হয়নি। আজও বিজ্ঞানীরা বিতর্ক করছেন, ওয়েভ ফাংশন আসলে কী? বাস্তবতা কি সত্যিই সম্ভাবনার মেঘ? নাকি এর পেছনে আরও গভীর কোনো অজানা সত্য লুকিয়ে আছে?
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত। কয়েকটি গাণিতিক প্রতীকে লেখা সেই ছোট্ট সমীকরণ মানুষের মহাবিশ্বকে বোঝার ভাষা চিরতরে বদলে দিয়েছিল। শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণ শুধু একটি গাণিতিক সূত্র নয়। এটি ছিল এমন এক জানালা, যার মাধ্যমে মানুষ প্রথমবারের মতো কোয়ান্টাম বাস্তবতার রহস্যময় জগতে উঁকি দিয়েছিল।
Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular