Homeমহাকাশ বিজ্ঞানচেতনার মহাবিশ্ব

চেতনার মহাবিশ্ব

এক সময় মানব চেতনা নিয়ে কথা বললেই বিজ্ঞানীরা বলতেন, এটা শুধু মস্তিষ্কের কাজ। নিউরনের জটিল বৈদ্যুতিক সংকেত থেকে জন্ম নেয় আমাদের অনুভূতি, স্মৃতি, আত্মসচেতনতা। ব্যস, গল্প শেষ।

প্যানসাইকিজম: মহাবিশ্বের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে চেতনা

কিন্তু গল্পটা বোধহয় এতটা সহজ না। বর্তমান যুগের কিছু বিজ্ঞানী আবার ফিরে তাকাচ্ছেন সেই পুরনো এক ধারণার দিকে, যার নাম, প্যানসাইকিজম। এই ধারণা বলে, চেতনা শুধু মানুষের মস্তিষ্কে আটকে নেই; বরং এটা বাস্তবতারই একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ, মহাবিশ্বের প্রতিটি কণার ভেতরেই হয়তো চেতনার সূক্ষ্মতম বীজ লুকিয়ে রয়েছে।

একসময় এটাকে নিছক আধ্যাত্মিক কল্পনা বলে উড়িয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা সেই পুরনো ভাবনাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।

কোয়ান্টাম জীববিজ্ঞান ও মানব মস্তিষ্ক

বিশেষ করে কোয়ান্টাম জীববিজ্ঞান এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। আমরা এখন জানি, উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ কিংবা পরিযায়ী পাখির দিক নির্ণয়ের মতো প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় কোয়ান্টাম প্রভাব কাজ করে। তাই প্রশ্ন উঠছে, মানব মস্তিষ্কেও কি এমন কিছু ঘটে?

অর্কেস্ট্রেটেড অবজেক্টিভ রিডাকশন তত্ত্ব

এই প্রশ্ন থেকেই, পদার্থবিদ রজার পেনরোজ ও অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট স্টুয়ার্ট হ্যামারহফ, এরা দুজনে মিলে প্রস্তাব করেছিলেন এক বিতর্কিত তত্ত্ব – অর্কেস্ট্রেটেড অবজেক্টিভ রিডাকশন। তাদের ধারণা ছিল, আমাদের মস্তিষ্কের নিউরনের ভেতরে থাকা মাইক্রোটিউবিউল নামের ক্ষুদ্র কাঠামোয় কোয়ান্টাম প্রক্রিয়া ঘটে, আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় চেতনা।

মহাবিশ্বের গভীর বুননে চেতনার অস্তিত্ব

বর্তমান যুগের আরও সাহসী কিছু বিজ্ঞানী বলছেন, চেতনার পেছনের কোয়ান্টাম তথ্য হয়তো “নন-লোকাল”। তার মানে, এটা শুধু মানব মস্তিষ্কে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মহাবিশ্বের গভীর বুননের সঙ্গে যুক্ত।

তবে এখনও এসবের কোনোটাই চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। বিজ্ঞান এখনো নিশ্চিত নয়, চেতনা কি মস্তিষ্কের উৎপাদন, নাকি মহাবিশ্বের মৌলিক উপাদান।

তবে একটি ব্যাপার নিশ্চিতভাবে সত্য। আমাদের শরীরের প্রতিটি পরমাণু কোনো এক মৃত নক্ষত্রের অভ্যন্তরে জন্ম নিয়েছিল। আমরা সেই তারার ধুলোরই পরিবর্তিত রূপ। আমাদের মস্তিষ্ক আজ চিন্তা করছে, প্রশ্ন করছে, বিস্মিত হচ্ছে।

অর্থাৎ, আমরা শুধু মহাবিশ্বে বাস করছি না, মহাবিশ্ব নিজেই আমাদের মধ্যে নিজেকে অনুভব করছে।

হয়তো মরমি সাধক আর পদার্থবিদরা দুই প্রান্ত থেকে একই সত্যের দিকে এগোচ্ছেন। প্রশ্নটা তাই থেকেই যায়, চেতনা কি মহাবিশ্বের সৃষ্টি? নাকি মহাবিশ্ব নিজেই চেতনার এক বিশাল রূপ?

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular