মূল কন্টেন্টে যান
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতাবিবিধ বিজ্ঞানবেঁচে ফেরা: হিরোশিমা থেকে নাগাসাকি

বেঁচে ফেরা: হিরোশিমা থেকে নাগাসাকি

৪ জুন, ২০২৬

⏱ ২ মিনিট পড়ার সময়

👁 ৪১ 💬 ০
বেঁচে ফেরা: হিরোশিমা থেকে নাগাসাকি

১৯৪৫ সালের আগস্ট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ প্রহর। জাপানের আকাশে তখন নেমে আসছে মানব ইতিহাসের ভয়ংকরতম মারণাস্ত্র।

৬ আগস্ট সকালে হিরোশিমা শহরে কর্মসূত্রে গিয়েছিলেন ২৯ বছর বয়সী একজন প্রকৌশলী। তাঁর নাম, সুতোমু ইয়ামাগুচি। হঠাৎ তিনি আকাশে একটি মার্কিন বি-২৯ বোমারু বিমান দেখতে পেলেন। পরমুহূর্তেই চোখ-ধাঁধানো এক আলোর ঝলকানি।

হিরোশিমার আকাশে বিস্ফোরিত হলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রথম পারমাণবিক বোমা। বিস্ফোরণের কেন্দ্র থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে ছিলেন ইয়ামাগুচি। বিস্ফোরণের অভিঘাতে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ছিটকে পড়েন ইয়ামাগুচি । তবুও অবিশ্বাস্যভাবে তিনি প্রাণে বেঁচে যান।

পরদিন অনেক কষ্টে ‌নিজের শহর নাগাসাকিতে ফিরে আসেন তিনি। শরীর তখনো ব্যান্ডেজে মোড়া। ৯ আগস্ট সকালে অফিসে বসে সহকর্মীদের কাছে হিরোশিমার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিচ্ছিলেন। অনেকে তাঁর কথা বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না।
ঠিক সেই মুহূর্তে আবারও আকাশে দেখা দিল একটি বি-২৯ বোমারু বিমান।

কিছুক্ষণের মধ্যেই নাগাসাকির ওপর বিস্ফোরিত হলো দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমা। আবারও এক তীব্র আলোর ঝলকানি। আবারও এক মহাবিধ্বংসী বিস্ফোরণ।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, দ্বিতীয়বারও ইয়ামাগুচি প্রাণে বেঁচে গেলেন।

হিরোশিমার বিস্ফোরণে সুতোমু ইয়ামাগুচির শরীরের বাম পাশ মারাত্মকভাবে ঝলসে যায়। তাঁর কানের পর্দা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তিনি সাময়িকভাবে দৃষ্টিশক্তির সমস্যায় ভুগেছিলেন। পরে পারমাণবিক বিস্ফোরণের তেজস্ক্রিয় বিকিরণের প্রভাবেও তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর চুল পড়তে শুরু করে, উচ্চ জ্বর দেখা দেয় এবং শরীরে তীব্র দুর্বলতা অনুভূত হয়। সে সময় হিরোশিমা ও নাগাসাকির বহু জীবিত ব্যক্তি তেজস্ক্রিয়তার কারণে রক্তকণিকা ধ্বংস, সংক্রমণ, রক্তক্ষরণ এবং বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসমস্যায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। তবে আশ্চর্যজনকভাবে ইয়ামাগুচি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং আরও ছয় দশকের বেশি সময় বেঁচে ছিলেন।

জাপান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সুতোমু ইয়ামাগুচিকে দুই পারমাণবিক হামলার প্রত্যক্ষ জীবিত সাক্ষী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। জীবনের বাকি সময় তিনি পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তিনি বারবার বলতেন, পৃথিবীর কোনো মানুষ যেন আর কখনো এমন দৃশ্য না দেখে।

২০১০ সালে ৯৩ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু তাঁর জীবনকাহিনী আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিজ্ঞান মানুষের কল্যাণে যেমন বিস্ময় সৃষ্টি করতে পারে, তেমনি ভুল হাতে পড়লে সেটা মানবসভ্যতার জন্য অকল্পনীয় ধ্বংসও ডেকে আনতে পারে।

হিরোশিমা ও নাগাসাকির পারমাণবিক বিস্ফোরণ থেকে দু’বার ফিরে আসা সুতোমু ইয়ামাগুচি শুধু একজন মানুষ নন; তিনি মানব সহনশীলতার এক জীবন্ত প্রতীক, এবং পারমাণবিক যুদ্ধের ভয়াবহতার বিরুদ্ধে এক স্থায়ী সতর্কবার্তা।

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।