মূল কন্টেন্টে যান
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতাবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমানুষের বদলে রোবট?

মানুষের বদলে রোবট?

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

⏱ ৬ মিনিট পড়ার সময়

👁 ৮ 💬 ০
মানুষের বদলে রোবট?
এআই এতদিন আমাদের ব্রেইনের কাজ শিখছিল। লেখা লিখছে, ছবি বানাচ্ছে, অনুবাদ করছে, প্রোগ্রামিং করছে। কিন্তু এবার এআইয়ের সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে হাত-পা। অর্থাৎ কম্পিউটারের এআই ঢুকে পড়ছে রোবটের শরীরে।
জার্মানির নিউরা রোবোটিকসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ডেভিড রেগার সম্প্রতি বেশ চমকে দেওয়া একটি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। তাঁর দাবি, আগামী ২ থেকে ৫ বছরের মধ্যে রোবট প্রায় সব ধরনের শারীরিক কাজ করার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। তিনি ১০ বা ২০ বছরের কথা বলছেন না। বলছেন এই দশকের মধ্যেই এটা ঘটতে যাচ্ছে।‌
কথাটা কি শুধুই রোবট কোম্পানির একজন প্রধান নির্বাহীর প্রচারণা?
কিন্তু তার কথা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ারও উপায় নেই। কারণ রোবটের জগতে ইতিমধ্যে বড় পরিবর্তন শুরু হয়ে গেছে।

রোবট হঠাৎ এত বুদ্ধিমান কেন?

পুরোনো শিল্প-রোবট আসলে খুব একটা বুদ্ধিমান ছিল না। কারখানার নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে একই কাজ হাজারবার করতে পারত। কিন্তু পরিবেশ বদলে গেলে বা সামনে অচেনা কিছু এলে সমস্যায় পড়ত।
নতুন প্রজন্মের হিউম্যানয়েড রোবট একেবারেই অন্য ধরনের। এদের শরীরে থাকছে ক্যামেরা, থ্রি-ডি ভিশন, নানা ধরনের সেন্সর এবং অত্যন্ত নিখুঁত মোটর। তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আধুনিক এআই। ফলে রোবট চারপাশ দেখতে পারে, পরিস্থিতি বুঝতে পারে এবং সেই অনুযায়ী নিজের কাজ ঠিক করতে পারে। এই প্রযুক্তিকেই এখন বলা হচ্ছে, ফিজিক্যাল এআই।
চ্যাটজিপিটির মতো এআই ডিজিটাল জগতে কাজ করে। আর ফিজিক্যাল এআই সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বাস্তব জগতে এনে দেয়। যেখানে তাকে কোনো কিছু ধরতে হবে, তুলতে হবে, হাঁটতে হবে কিংবা যন্ত্র চালাতে হবে। আন্তর্জাতিক রোবোটিকস সংস্থা (আইএফআর) বলছে, এআইয়ের সঙ্গে রোবোটিকসের এই মেলবন্ধন রোবটকে আগের তুলনায় অনেক বেশি সক্ষম করে তুলছে।

কারখানায় হিউম্যানয়েড‌ রোবট

এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হলো, বিএমডব্লিউ। যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ক্যারোলিনার বিএমডব্লিউ কারখানায় ফিগার এআইয়ের তৈরি করা হিউম্যানয়েড রোবট “ফিগার ০২” বাস্তব উৎপাদন লাইনে কাজ করেছে।
দশ মাসের পরীক্ষায় রোবটটি ৩০ হাজারের বেশি বিএমডব্লিউ এক্স৩ গাড়ি তৈরির কাজে অংশ নিয়েছে। প্রায় ৯০ হাজার যন্ত্রাংশ সরিয়েছে, কাজ করেছে প্রায় ১,২৫০ ঘণ্টা এবং হেঁটেছে প্রায় ১২ লাখ পদক্ষেপ।
তার কাজ ছিল গাড়ির ধাতব অংশ তুলে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নির্দিষ্ট জায়গায় বসিয়ে দেওয়া, যাতে পরের ধাপে সেগুলো ওয়েল্ডিং করা যায়। বিএমডব্লিউ বলছে, মিলিমিটার পর্যায়ের নির্ভুলতায় বারবার একই কাজ করতে পেরেছে রোবটটি। অর্থাৎ হিউম্যানয়েড রোবটের কারখানায় কাজ করা এখন আর ইউটিউবের ডেমো নয়।

মানুষ আকৃতির রোবট কেন?

এর পেছনে মজার একটা যুক্তি আছে। আমাদের পৃথিবীর প্রায় সব কর্মক্ষেত্রই মানুষের শরীরের কথা মাথায় রেখে তৈরি। দরজা, সিঁড়ি, তাক, টেবিল, যন্ত্রপাতি সবই মানুষের উচ্চতা, হাত এবং চলাফেরার উপযোগী। তাই মানুষের মতো দুটি হাত ও দুটি পা থাকা একটি রোবটের বড় সুবিধা হলো, তার জন্য পুরো কারখানা বা কর্মক্ষেত্র নতুন করে বানাতে হবে না। আন্তর্জাতিক রোবোটিকস সংস্থা আইএফআরও এটিকেই হিউম্যানয়েড রোবটের অন্যতম বড় সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে।

নিউরা কী বানাচ্ছে?

ডেভিড রেগারের নিউরা রোবোটিকস তৈরি করেছে “৪এনই১” নামের হিউম্যানয়েড রোবট। কোম্পানিটির দাবি, এটি চারপাশ বুঝতে পারে, মানুষের কাছাকাছি নিরাপদে কাজ করতে পারে এবং অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে পারে। এতে রয়েছে ৩৬০ ডিগ্রি পারসেপশন, সেন্সরযুক্ত ত্বক, মাল্টিমোডাল এআই এবং রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং প্রযুক্তি।
তাদের পরিকল্পনাটাও ছোট নয়।
নিউরা ঘোষণা করেছে, তারা ২০৩০ সালের মধ্যে শিল্প, পরিষেবা ও ঘরের কাজের জন্য ৫০ লাখ রোবট সরবরাহ করতে চায়।

চীনের দৌড়

রোবট প্রযুক্তিতে চীন যে কত দ্রুত এগোচ্ছে, তার একটা ঝলক দেখা গেছে সম্প্রতি বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেমসে। সেখানে রোবট শুধু দৌড় বা ফুটবল খেলেনি; ঘরের কাজ, শিল্পকারখানার কাজ এবং জরুরি উদ্ধারসহ বাস্তব জীবনের নানা কাজেও নিজেদের দক্ষতা দেখিয়েছে। ১৫০০ মিটার দৌড়ে বিজয়ী রোবট সময় নিয়েছে মাত্র ২ মিনিট ২১.৬৪ সেকেন্ড। আগের বছরের বিজয়ী রোবটের সময় ছিল ৬ মিনিট ৩৪.৪০ সেকেন্ড। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে উন্নতির গতিটা চোখে পড়ার মতো।
চীনের আসল শক্তি অবশ্য শুধু দ্রুতগতির রোবট বানানো নয়। দেশটিতে এখন রোবটের মোটর, সেন্সর, ব্যাটারি, কন্ট্রোল সিস্টেম থেকে শুরু করে এআই পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থাই দ্রুত গড়ে উঠছে।
বেইজিং শহরেই চীনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পূর্ণাঙ্গ রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ফলে রোবট এখন আর চীনে শুধু গবেষণাগারের পরীক্ষামূলক যন্ত্র নয়; লক্ষ্য হচ্ছে এগুলোকে কারখানা, গুদাম, হোটেল, বাড়ি এবং উদ্ধারকাজে সত্যিকারের শ্রমিক হিসেবে নামানো। এবারের প্রতিযোগিতার অনেক পরীক্ষাই তাই কৃত্রিম মাঠে নয়, বাস্তব পরিবেশে করা হয়েছে। চীনের এই অগ্রগতি দেখে একটা বিষয় বেশ পরিষ্কার – হিউম্যানয়েড রোবটের দৌড়টা এখন আর ভবিষ্যতের গল্প নয়, ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।

প্রথম ধাক্কাটা কোথায় আসতে পারে?

সম্ভবত সব পেশায় একসঙ্গে নয়।
প্রথমে এগিয়ে থাকবে সেই সব কাজ, যেগুলো বারবার একইভাবে করতে হয়, শারীরিকভাবে ক্লান্তিকর কিংবা মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। গুদামে মাল সরানো, কারখানায় যন্ত্রাংশ ওঠানো-বসানো, প্যাকেজিং, উৎপাদন লাইনের কাজ, লজিস্টিকস‌ – এসব ক্ষেত্রে এআইচালিত রোবটের ব্যবহার ইতিমধ্যেই দ্রুত এগোচ্ছে।
আন্তর্জাতিক রোবোটিক্স সংস্থা লজিস্টিকস ও ওয়্যারহাউসিংকে এআই-রোবোটিকস ব্যবহারের অগ্রবর্তী ক্ষেত্রগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এরপর ধীরে ধীরে নির্মাণ শিল্প, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিষেবা এবং ঘরের কাজেও এদের ব্যবহার বাড়তে পারে।

তাহলে কি মানুষের চাকরি শেষ?

এখানেই একটু সাবধান হওয়া দরকার। রেগারের ২ থেকে ৫ বছরের পূর্বাভাসটি একটি ভবিষ্যদ্বাণী, প্রমাণিত সময়সূচি নয়।
রোবট এখনো মানুষের মতো সহজে যেকোনো নতুন পরিবেশে গিয়ে যেকোনো কাজ করতে পারে না। বাস্তব পৃথিবী ভীষণ এলোমেলো। সেখানে অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে। হঠাৎ একটা কিছু রোবটের সামনে চলে আসতে পারে, কোনো বস্তু হাত থেকে পিছলে যেতে পারে কিংবা এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যেটা রোবট আগে কখনো দেখেনি।
এছাড়াও নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ব্যাটারির স্থায়িত্ব, নির্ভরযোগ্যতা, হাতের সূক্ষ্ম কাজ এবং নতুন পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া – এসব ক্ষেত্রে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আন্তর্জাতিক রোবোটিক্স সংস্থা (আইএফআর)  হিউম্যানয়েড রোবট নিয়ে বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি বাস্তব সীমাবদ্ধতার কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে।
তাই আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পৃথিবীর সব রাজমিস্ত্রি, মেকানিক, নার্স কিংবা প্লাম্বারের জায়গায় হিউম্যানয়েড রোবট বসে যাবে – এমন ভাবার কারণ নেই। কিন্তু দ্রুত পরিবর্তনের দিকটা পরিষ্কার। গত কয়েক বছরে এআই শিখেছে মানুষের ভাষা। এখন সেই এআই শিখছে বাস্তব পৃথিবীতে দেখতে, ধরতে, হাঁটতে এবং কাজ করতে।
মোদ্দাকথা হলো, কম্পিউটারের ভেতরের এআই এবার মানুষের মত শরীর পেতে শুরু করেছে। আর এই হিউম্যানয়েড রোবট প্রযুক্তি যদি বর্তমান গতিতে এগোতে থাকে, তাহলে এই দশকের শেষে প্রশ্নটা আর “রোবট কী কী করতে পারে?” থাকবে না। বরং প্রশ্নটা হয়তো হবে, “এমন কী কাজ আছে, যেটা শুধু মানুষই পারে?”

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।