মূল কন্টেন্টে যান
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
সৌরজগৎ English

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতা › মহাকাশ বিজ্ঞান › হাবল টেনশন: মহাবিশ্বের প্রসারণ নিয়ে সৃষ্টিতাত্ত্বিক…

হাবল টেনশন: মহাবিশ্বের প্রসারণ নিয়ে সৃষ্টিতাত্ত্বিক এক রহস্যময় গরমিল

১৩ মার্চ, ২০২৬

⏱ ৩ মিনিট পড়ার সময়

সর্বশেষ হালনাগাদ: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

👁 ৭২ 💬 ০
শেয়ার ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ টেলিগ্রাম এক্স
হাবল টেনশন: মহাবিশ্বের প্রসারণ নিয়ে সৃষ্টিতাত্ত্বিক এক রহস্যময় গরমিল

মহাবিশ্বের প্রসারণ ও হাবল ধ্রুবক

মহাবিশ্ব অবিরাম ছুটে চলেছে। প্রতিটি ছায়াপথ, প্রতিটি তারা, আমাদের দৃষ্টির আড়ালে যেন প্রতিনিয়ত পালিয়ে যাচ্ছে অজানা এক গন্তব্যের দিকে। এই ছুটে চলাকে ব্যাখ্যা করতে ব্যবহৃত হয় ‘হাবল ধ্রুবক’। এটা এমন একটি সংখ্যা, যেটা বলে দেয়, মহাবিশ্ব কত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই ‘ধ্রুবক’ সংখ্যাটি সব ক্ষেত্রে এক নয়। এটার পরিমাপ একেক ভাবে একেক রকম আসছে। আর এখানেই শুরু হয়েছে বৈজ্ঞানিক জগতে সবচেয়ে রহস্যময় একটি দ্বন্দ্ব—যার নাম, হাবল টেনশন।

অতীতের বিকিরণ ও আদি মহাবিশ্বের পরিমাপ

এই টেনশন আসলে দুইটি ভিন্ন ভিন্ন গবেষণা পদ্ধতির ফলাফলের অসংগতির মধ্যে দেখা যায়। প্রথম পদ্ধতিতে, বিজ্ঞানীরা ফিরে তাকাচ্ছেন সুদূর অতীতের দিকে। প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগের মহাবিশ্বের শিশুকালীন সময়ের দিকে। এই সময়ের তথ্য পাওয়া যায় এক ধরনের অতিপ্রাচীন বিকিরনের মাধ্যমে, যাকে বলে কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন, সংক্ষেপে সিএমবি। এই বিকিরণ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখছেন, হাবল ধ্রুবকের মান দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৬৭ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড প্রতি মেগা-পারসেক।

আধুনিক পদ্ধতি ও কসমিক মাইলমার্কার

অন্যদিকে, আধুনিক মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ হার পরিমাপ করতে বিজ্ঞানীরা নির্ভর করছেন সেফেইড ভেরিয়েবল তারকা ও সুপারনোভা পর্যবেক্ষণের উপর। এগুলোর উজ্জ্বলতা ও দূরত্বের মধ্যে নিখুঁত সম্পর্ক থাকায়, এগুলোকে বলা হয় ‘কসমিক মাইলমার্কার’। এদের সাহায্যে মহাবিশ্বের বর্তমান বিস্তারের হার নির্ধারণ করা হলে দেখা যায়, হাবল ধ্রুবকের মান দাঁড়ায় প্রায় ৭৩ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড প্রতি মেগা-পারসেক।

গাণিতিক অমিল ও কসমোলজির সংকট

এখানেই রহস্য। দুটি পদ্ধতি যদি সঠিক হয়, তাহলে সংখ্যাগুলি কেন মিলছে না? আর এই অমিল তো ছোটখাটো পার্থক্য নয়। প্রায় ৯% পার্থক্য! এর মানে দাঁড়ায়, হয় আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে ধারণা সঠিক নয়, নয়তো কসমোলজির সৃষ্টিতত্ত্ব্বে কোথাও বড় ধরণের গরমিল রয়ে গেছে।

নতুন পদার্থবিজ্ঞান ও অজানা শক্তির সম্ভাবনা

বিজ্ঞানীরা এটিকে শুধুই পরিমাপের ত্রুটি বলে পাশ কাটিয়ে যেতে পারছেন না। কারণ, বারবার নির্ভুল পরিমাপেও এই ফাঁকটা থেকেই যাচ্ছে। তাই কেউ কেউ মনে করছেন, আমরা হয়তো নতুন ধরনের পদার্থবিজ্ঞান বা নিউ ফিজিক্সের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। হতে পারে, গ্যালাক্সির প্রসারণে কোনো অজানা শক্তি কাজ করছে, যাকে আমরা এখনো চিনতে পারিনি। আবার কারো মতে, ডার্ক এনার্জি বা ডার্ক ম্যাটারের চরিত্র নিয়ে আমাদের প্রচলিত ধারণাই হয়তো এখনো অসম্পূর্ণ।

ভবিষ্যৎ গবেষণা ও মহাকাশ টেলিস্কোপের ভূমিকা

এই রহস্য সমাধানে এখন যুক্ত হয়েছে নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ, ইউরোপের ইউক্লিড মিশন, আর সামনের দিনে আসছে আরও শক্তিশালী মহাকাশ পর্যবেক্ষক যন্ত্র।  হয়তো এরা একদিন আমাদের জানাবে, কোনটা সত্যি, কোনটা ভ্রান্ত।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক নতুন দিগন্ত

হাবল টেনশন আজ শুধু একটি সংখ্যা বা পার্থক্যের নাম নয়। এই রহস্যই আজকের জ্যোতির্বিজ্ঞানের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অধ্যায়। এটি মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের বোধের সীমা ও সম্ভাবনার মাপকাঠি। হয়তো এই টেনশন আমাদের টেনে নিয়ে যাবে এমন জায়গায়, যেখানে মহাবিশ্বের এক অজানা অধ্যায় খুলে যাবে চোখের সামনে। আর তখন আমরা বুঝবো, এই ছুটে চলা কেবল মহাবিশ্বের নয়, আমাদের জানার পথও ততটাই বিস্তৃত -অবিরাম এবং অন্তহীন।

শেয়ার ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ টেলিগ্রাম এক্স

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।