মূল কন্টেন্টে যান
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতামহাবিশ্বের মহাবিস্ময়গ্রেট অ্যাট্রাক্টর: মহাবিশ্বের অদৃশ্য মহাকর্ষীয় কেন্দ্র

গ্রেট অ্যাট্রাক্টর: মহাবিশ্বের অদৃশ্য মহাকর্ষীয় কেন্দ্র

২৫ নভেম্বর, ২০২৫

⏱ ৩ মিনিট পড়ার সময়

👁 ১০৬ 💬 ০
গ্রেট অ্যাট্রাক্টর: মহাবিশ্বের অদৃশ্য মহাকর্ষীয় কেন্দ্র

মহাবিশ্বের অদৃশ্য স্রোত

মহাবিশ্বকে আমরা খুব সাজানো গোছানো মনে করি। গ্রহ, নক্ষত্র, নীহারিকা, গ্যালাক্সি—সবকিছু‌ই যেন নিজ নিজ কক্ষপথে শান্তভাবে ঘুরছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় কোথাও কোনো ছন্দপতন নেই। কিন্তু এই শান্ত ছবির আড়ালে লুকিয়ে আছে অদৃশ্য এক মহাজাগতিক টান।‌

গ্যালাক্সিগুলো শুধু ঘুরছেই না, সেই সাথে তারা ছুটছে এক অদৃশ্য কেন্দ্রের দিকে। সেখানে কোনো এক অজানা শক্তি গ্যালাক্সিগুলোকে প্রবলভাবে তার দিকে টেনে নিচ্ছে। সেই রহস্যময় গন্তব্যই হলো, গ্রেট অ্যাট্রাক্টর

পিকুলিয়ার মোশন ও মহাজাগতিক দৌড়

আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি মহাশূন্যে স্রেফ ভেসে নেই। বিজ্ঞানীরা হিসেব করে দেখেছেন, এটি ঘণ্টায় লক্ষ লক্ষ কিলোমিটার গতিতে একটি নির্দিষ্ট দিকেই ছুটছে। আশ্চর্য ব্যাপার হলো, এই যাত্রায় আমরা একা নই। আমাদের প্রতিবেশী অ্যান্ড্রোমেডা গ্যালাক্সি, ভার্গো ক্লাস্টার এবং আশেপাশের শত শত গ্যালাক্সি সেই একই দিকে ছুটে চলেছে।

গ্যালাক্সিগুলোর এই বিশাল প্রবাহ বা সম্মিলিত গতিকে বলা হয় ‘পিকুলিয়ার মোশন’ (Peculiar Motion)। আর যার দিকে এই স্রোতটি ছুটে যাচ্ছে, সেই অদেখা মহাকর্ষীয় কেন্দ্রটিই হলো গ্রেট অ্যাট্রাক্টর।

জোন অফ অ্যাভয়ডেন্স: দৃষ্টির সীমানা

সমস্যা হলো, এত বিশাল একটি ভরের উৎস হওয়া সত্ত্বেও এটিকে সরাসরি দেখা যায় না। কারণ গ্রেট অ্যাট্রাক্টর আমাদের আকাশগঙ্গা বা মিল্কিওয়ের এমন এক কোণায় অবস্থান করছে, যা মহাজাগতিক ধুলো আর গ্যাসীয় নীহারিকার ঘন কুয়াশায় ঢাকা।

আমাদের টেলিস্কোপের আলো এই ধুলোর দেয়াল ভেদ করে ওপারে যেতে পারে না। জ্যোতির্বিজ্ঞানে এই অন্ধকারাচ্ছন্ন অঞ্চলকে বলা হয়, জোন‌ অফ অ্যাভয়ডেন্স (Zone of Avoidance)। মহাবিশ্ব যেন তার এই গোপন রহস্যটিকে একটি মহাজাগতিক পর্দার আড়ালে সযত্নে লুকিয়ে রেখেছে।

ল্যানিয়াকেয়া: আমাদের মহাজাগতিক ঠিকানা

তবুও বিজ্ঞানীরা থেমে থাকেননি। দৃশ্যমান আলো না পৌঁছালেও, তাঁরা গ্যালাক্সির গতিবেগ, রেডশিফট এবং এক্স-রে সিগনাল বিশ্লেষণ করে এই রহস্যভেদের চেষ্টা করেছেন। গবেষণায় তাঁরা বুঝতে পারলেন, এই অদৃশ্য অঞ্চলের ভেতরে লুকিয়ে আছে গ্যালাক্সিদের এক বিশাল সাম্রাজ্য।

এর নাম দেওয়া হয়েছে ল্যানিয়াকেয়া সুপারক্লাস্টার। হাওয়াইয়ান শব্দ ‘ল্যানিয়াকেয়া’-র অর্থ হলো ‘অসীম স্বর্গ’। এর ভর এতই বেশি যে তা লাখ লাখ গ্যালাক্সিকে নিজের দিকে টেনে ধরে রাখতে পারে। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিও সেই বিশাল সুপারক্লাস্টার পরিবারেরই এক ছোট সদস্য। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, গ্রেট অ্যাট্রাক্টর আসলে এই ল্যানিয়াকেয়া সুপারক্লাস্টারেরই মহাকর্ষীয় কেন্দ্রবিন্দু।

শাপলি সুপারক্লাস্টার ও অনন্ত রহস্য

কিন্তু চমক এখানেই শেষ নয়। বিজ্ঞানীরা যখন আরও গভীরে পর্যবেক্ষণ করলেন, তখন দেখলেন গ্রেট অ্যাট্রাক্টরের ওপারেই আছে আরও বড় এক মহাজাগতিক দানব—শাপলি সুপারক্লাস্টার

অর্থাৎ, আমরা আসলে বহু স্তরের এক মহাকর্ষীয় টানের ধারায় ছুটে যাচ্ছি। গ্রেট অ্যাট্রাক্টর হয়তো সেই পথের মাঝের এক বাঁক মাত্র, শেষ গন্তব্য নয়। মূল আকর্ষণ আসছে আরও দূরবর্তী শাপলি সুপারক্লাস্টার থেকে।

এই অদৃশ্য টান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মহাবিশ্বের প্রকৃত গভীরতা ও গঠন আমরা এখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। চোখে না দেখলেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে কোটি কোটি আলোকবর্ষ জুড়ে। এটি যেন দূর মহাকাশের অজানা কোনো আহ্বান, যেটা গ্যালাক্সিদের সারিবদ্ধ করে একদিকে টেনে নিচ্ছে। হয়তো ভবিষ্যতে উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে এর রহস্য পুরো উন্মোচিত হবে। কিন্তু ততদিন পর্যন্ত গ্রেট অ্যাট্রাক্টর থেকে যাবে এক নিঃশব্দ মহাজাগতিক ইশারা।

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *