মূল কন্টেন্টে যান
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতাপ্রকৃতি ও পরিবেশঅস্ট্রেলিয়ার দাবানল: জলবায়ু পরিবর্তন ও মহাবিপর্যয়

অস্ট্রেলিয়ার দাবানল: জলবায়ু পরিবর্তন ও মহাবিপর্যয়

১১ জানুয়ারি, ২০২০

⏱ ৩ মিনিট পড়ার সময়

👁 ৩৫৫ 💬 ০
অস্ট্রেলিয়ার দাবানল: জলবায়ু পরিবর্তন ও মহাবিপর্যয়

অসময়ে বুশফায়ার ও বিপর্যয়

অস্ট্রেলিয়াতে প্রতি বছরই প্রাকৃতিক নিয়মে দাবানল হয়। এদেশে একে বলে বুশফায়ার। এটি সাধারণত শুরু হয় শুষ্ক মৌসুমে, অর্থাৎ ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে। দক্ষিণ গোলার্ধে তখন থাকে গ্রীষ্মকাল।

কিন্তু শঙ্কার বিষয় হলো, এ বছর বুশফায়ার সিজন শুরু হয়েছে বসন্তের শুরুতে, একদম সেপ্টেম্বর মাস থেকে। ডিসেম্বর মাসে এসে এর ভয়াবহতা প্রচন্ড মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে।

ধ্বংসযজ্ঞের পরিসংখ্যান

পরিস্থিতি এক কথায় ভয়াবহ। এ পর্যন্ত বুশফায়ারে যে ক্ষতি হয়েছে তা অকল্পনীয়:

  • দশ লক্ষ হেক্টর বনভূমি সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
  • কয়েক হাজার বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে।
  • অনেক মানুষ নিহত হয়েছে এবং লক্ষ লক্ষ বন্য প্রাণীর মৃত্যু হয়েছে।

আগুনের উৎকট ধোঁয়ায় অস্ট্রেলিয়ার বিশাল অংশ ঢেকে গেছে, ফলে মানুষের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে রীতিমতো অসুবিধা হচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রেলিয়ার ব্যাপক অঞ্চল জুড়ে এখনো আগুন জ্বলছে এবং মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে।

এই অস্ট্রেলিয়ার দাবানল-এর বিস্তৃতি এতই ব্যাপক যে মহাকাশ থেকেও আগুনের ধোঁয়া স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এমনকি প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে সেই ধোঁয়া দক্ষিণ আমেরিকায় পৌঁছে গেছে। একমাত্র প্রবল বৃষ্টিই থামাতে পারে এই আগুন, কিন্তু আবহাওয়ায় সেরকম কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।

খরা ও অর্থনীতির সংকট

গত কয়েক বছর ধরেই অস্ট্রেলিয়ায় বৃষ্টিপাত অনেক কমে গেছে। যার ফলে সেখানে ব্যাপক খরা দেখা দিয়েছে। নদী-নালা শুকিয়ে গেছে এবং সেচ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে কৃষিতে। ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়ায় কৃষক সমাজ এখন সরকারি সাহায্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশটির সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

জলবায়ু পরিবর্তন: বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা

অনেকেই মনে করছেন, এই পরিস্থিতির পেছনে মূল কারণ হলো জলবায়ু পরিবর্তন। বিজ্ঞানীরা কয়েক দশক ধরেই বলে আসছেন, বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে।

তিরিশ বছর আগেই বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও দাবানলের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাবে। তাঁরা সতর্ক করেছিলেন, এই বিপর্যয় ঠেকাতে হলে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো ছাড়া কোনো গতি নেই।

রাজনৈতিক অবহেলা ও বাস্তবতা

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, বিশ্ব রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বিজ্ঞানীদের এই কথাগুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেননি। তাঁরা পরিবেশের চেয়ে অর্থনীতিকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁরা মনে করেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার পদক্ষেপ অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

ফলে যা হবার তাই হয়েছে। বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত যে, অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বনভূমি শুষ্ক হয়ে দাবানলের জন্য মোক্ষম পরিবেশ তৈরি করেছে। বনে আগুন লাগার জন্য এখন সামান্য স্ফুলিঙ্গই যথেষ্ট হচ্ছে।

ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ও বাংলাদেশ

কিন্তু আশঙ্কার বিষয় হলো, এটাই শেষ নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রকৃতির রুদ্ররোষ ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবার কারণে তলিয়ে যাবে অনেক দেশ। যার মধ্যে আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশও রয়েছে।

আশঙ্কা করা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের উপকূলের এক বিরাট এলাকা সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাবে। সারা পৃথিবীতে বন্যা, খরা ও ঘূর্ণিঝড়ের মাত্রা বাড়তেই থাকবে। প্রকৃতপক্ষে, মানব সভ্যতার অস্তিত্বই ভবিষ্যতে হুমকির সম্মুখীন হবে। যারা এখনো এ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন, তাদের উচিত অস্ট্রেলিয়ার দাবানল-এর ভয়াবহতা স্বচক্ষে দেখে যাওয়া।

আমাদের করণীয়

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কী? আসলে অনেক আগেই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল। তবুও বিজ্ঞানীরা বলছেন, এখনো সময় আছে আমাদের কার্বন ফুট-প্রিন্ট কমানোর। সেই লক্ষ্যে আমাদের যা করতে হবে:

  • ব্যক্তিগত থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো।
  • নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো।
  • প্রচুর গাছপালা লাগানো এবং বনভূমি রক্ষা করা।
  • সম্পদের অপচয় কমিয়ে রিসাইকেল বা পুনঃব্যবহার বাড়ানো।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। মনে রাখতে হবে, এই গ্রহটি বসবাসের অযোগ্য হয়ে গেলে আমাদের আর কোনো বিকল্প বাসভূমি নেই।

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *