Homeপদার্থ বিজ্ঞানপারিপার্শ্বিকের আড়ালে: ক্যালাবি–ইয়াউ ম্যানিফোল্ড

পারিপার্শ্বিকের আড়ালে: ক্যালাবি–ইয়াউ ম্যানিফোল্ড

দৃশ্যমান জগতের বাইরে চার-মাত্রিক স্পেসটাইম

আমাদের চারপাশের এই পরিচিত জগতে আমরা তিনটি স্থানিক মাত্রা দেখতে পাই। সামনে-পেছনে, ডানে-বামে, আর উপরে-নিচে। এর সঙ্গে যোগ হয় সময়। এই স্থান আর সময় মিলেই তৈরি হয় চার-মাত্রিক স্পেসটাইম, যেখানে আমাদের সমস্ত অভিজ্ঞতা গড়ে ওঠে। কিন্তু আধুনিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বলছে, এই দৃশ্যমান জগতই শেষ কথা নয়। এর আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে আরও কিছু অতিরিক্ত মাত্রা, যেগুলো আমরা সরাসরি দেখতে পাই না। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, এই মাত্রাগুলো কোথায়? আর কেনই বা আমাদের চোখে পড়ে না? একটা সহজ উদাহরণ দেয়া যাক। দূর থেকে একটা সরু তারকে দেখলে সেটাকে একদম সোজা একটা রেখার দেখা যায়, মনে হয় একমাত্রিক। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখলে বোঝা যায়, তারের আসলে প্রস্থ আছে, উচ্চতা আছে অর্থাৎ সেটা ত্রিমাত্রিক। তারের চারপাশে যে গোল করে ঘেরা অংশটা, সেটা দূর থেকে চোখে পড়ে না বলেই আমাদের মনে হয় সেটি একমাত্রিক। ঠিক তেমনি, আমাদের মহাবিশ্বেও হয়তো অতিরিক্ত কিছু মাত্রা আছে, কিন্তু সেগুলো এত ক্ষুদ্র স্কেলে গুটিয়ে আছে যে আমরা সেগুলো আলাদা করে দেখতে পাই না।

জ্যামিতিক কাঠামোর বিস্ময় ক্যালাবি–ইয়াউ ম্যানিফোল্ড

তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই অতিরিক্ত মাত্রাগুলো এলোমেলোভাবে গুটিয়ে নেই। বরং তারা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নিয়মতান্ত্রিক কিছু জ্যামিতিক কাঠামোর মধ্যে নিজেকে সাজিয়ে নিয়েছে। এই বিশেষ গঠনগুলোকেই বলা হয় “ক্যালাবি–ইয়াউ ম্যানিফোল্ড”। এই নামের পেছনেও একটা সুন্দর ইতিহাস আছে। ১৯৫০-এর দশকে ইতালীয় আমেরিকান গণিতবিদ ইউজিনিও ক্যালাবি প্রথম ধারণা দেন, এমন কিছু জ্যামিতিক গঠন থাকতে পারে যেগুলোর বক্রতা এমনভাবে বিন্যস্ত যে পুরো গঠনটিতে এক ধরনের ভারসাম্য তৈরি হয়। গণিতের ভাষায় বলা হয়, এই গঠনে রিচি টেন্সরের মান সর্বত্র শূন্য। তখন এটি ছিল কেবল একটি গাণিতিক ধারণা, যাকে বলা হত “ক্যালাবি কনজেকচার”। এর প্রায় দুই দশক পর, ১৯৭০-এর দশকে চীনা গণিতবিদ শিং-তুং ইয়াউ এই সমস্যার সমাধান করে দেখান, ক্যালাবির ধারণাটি সত্যিই সঠিক। সেই থেকেই এই গঠনগুলোর নাম হয়ে যায় “ক্যালাবি–ইয়াউ ম্যানিফোল্ড”।

ম্যানিফোল্ড শব্দের সহজ ব্যাখ্যা ও জ্যামিতি

“ম্যানিফোল্ড” কথাটাও আসলে খুব জটিল কিছু নয়। সহজভাবে বললে, এটি এমন একটি জ্যামিতিক গঠন, যেটা খুব ছোট পরিসরে সমতল মনে হয়, কিন্তু বড় পরিসরে গিয়ে জটিলভাবে বাঁকানো। পৃথিবী এর একটা ভালো উদাহরণ, পৃথিবী গোল হলেও আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেটাকে সমতলই মনে হয়। কিন্তু ক্যালাবি–ইয়াউ ম্যানিফোল্ড কল্পনা করা এত সহজ নয়। এগুলো বহু মাত্রায় মোচড়ানো, ভাঁজ খাওয়া, কখনো ছিদ্রযুক্ত এমন এক জগত, যেটা আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার বাইরে। তবু ধারণা করা হয়, এই জটিল কাঠামোগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে অতিরিক্ত মাত্রাগুলো।

স্ট্রিং তত্ত্ব ও কম্পমান স্ট্রিং-এর ভূমিকা

তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞানের স্ট্রিং তত্ত্ব এখানে এসে বিষয়টাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্বের মৌলিক কণাগুলো বিন্দু নয়, বরং অতি ক্ষুদ্র কম্পমান “স্ট্রিং”। এই স্ট্রিংগুলো কীভাবে কম্পন করছে, সেটাই নির্ধারণ করে কণার ভর, চার্জ আর অন্যান্য বৈশিষ্ট্য। আর এই কম্পনের ধরন নির্ভর করে স্ট্রিংগুলো যে জ্যামিতিক পরিসরে অবস্থান করছে তার উপর অর্থাৎ ক্যালাবি–ইয়াউ ম্যানিফোল্ডের গঠনের উপর। এখানে এসে একটা অদ্ভুত ব্যাপার খুঁজে পাওয়া যায়। আমরা সাধারণত জ্যামিতিকে ভাবি কেবল আকার-আকৃতির ভাষা হিসেবে। কিন্তু এখানে সেই জ্যামিতিই যেন নির্ধারণ করছে প্রকৃতির মৌলিক নিয়ম। যেন মহাবিশ্বটা এক বিশাল সুরের সমাহার, আর তার ভেতরের সুরের বিন্যাস ঠিক করছে এই অতি সূক্ষ্ম এবং জটিল জ্যামিতি। তবে এখানেই রহস্যের শেষ নয়। বরং এখান থেকেই নতুন প্রশ্নের শুরু। কারণ ক্যালাবি–ইয়াউ ম্যানিফোল্ডের সম্ভাব্য রূপ একটি বা দুইটি নয়, বরং অসংখ্য। তাহলে আমাদের মহাবিশ্বে ঠিক কোন গঠনটি বাস্তব? কেন এই নির্দিষ্ট জ্যামিতিটিই বেছে নেওয়া হয়েছে? এই প্রশ্নগুলোর নির্দিষ্ট উত্তর এখনো বিজ্ঞানীদের জানা নেই। আর ঠিক এই অজানার ভেতরেই লুকিয়ে আছে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে গভীর রহস্যগুলোর একটি।

হয়তো আমরা চারপাশে যা দেখি, সেটাই পুরো বাস্তবতা নয়। হয়তো আমাদের দৃষ্টির বাইরে, পারিপার্শ্বিকের আড়ালে, এমন এক সূক্ষ্ম জগত লুকিয়ে আছে যেখানে মাত্রা, জ্যামিতি আর পদার্থ একসাথে মিলেমিশে তৈরি করেছে মহাবিশ্বের গভীর গঠন। ক্যালাবি–ইয়াউ ম্যানিফোল্ড সেই অদৃশ্য জগতের এক ঝলক মাত্র। এটা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাস্তবতা অনেক সময় কল্পনার চেয়েও বিস্ময়কর হতে পারে।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular