Homeমহাকাশ বিজ্ঞানচাঁদের পথে ফেরা: আর্টেমিস টু মিশনের মহাপ্রস্তুতি

চাঁদের পথে ফেরা: আর্টেমিস টু মিশনের মহাপ্রস্তুতি

বহু বছর আগে অ্যাপোলো প্রোগ্রাম মানুষকে চাঁদে পৌঁছে দিয়েছিল। তারপর নীরবে কেটে গেছে ৫০ বছরের বেশি সময়। আর এখন, সেই দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে আবার শুরু হচ্ছে নতুন অধ্যায়, আর্টেমিস টু মিশন। এটি কোনো সাধারণ মহাকাশ ভ্রমণ নয়। এটি এক ধরনের মহড়া। ভবিষ্যতের চাঁদে অবতরণের আগে মানুষের সাহস, প্রযুক্তি আর পরিকল্পনাকে শেষবারের মতো পরীক্ষা করে নেওয়ার এক মহাপ্রস্তুতি।

কেনেডি স্পেস সেন্টার ও ওরায়েন স্পেসক্রাফট

সবকিছু শুরু হবে পৃথিবীর এক কোণ থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার, যেখান থেকে একসময় অ্যাপোলো রকেটগুলো উড়ে গিয়েছিল, সেখান থেকেই আবার বিশাল এক রকেটের আগুন জ্বলে উঠবে। এর নাম, স্পেস লঞ্চ সিস্টেম। ধীরে ধীরে আকাশের দিকে উঠতে শুরু করবে রকেট। নিচে জ্বলতে থাকবে অগ্নিশিখা, আর উপরে বসে থাকবে মানুষ। সেই মানুষদের বহন করবে একটি আধুনিক মহাকাশযান- ওরায়েন স্পেসক্রাফট। রকেটটি কয়েক মিনিটের মধ্যেই পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের শক্ত বন্ধন ছিন্ন করে দেবে। তারপর রকেট থেকে আলাদা হয়ে যাবে স্পেসক্রাফট। এখান থেকেই শুরু হবে আসল যাত্রা। কিন্তু মহাকাশযানটি সরাসরি চাঁদের দিকে ছুটে যাবে না। প্রথমে এটি পৃথিবীর চারপাশে ঘুরবে, তারপর এক নির্দিষ্ট মুহূর্তে তার ইঞ্জিন জ্বালিয়ে এমন এক গতি নেবে, যাকে বলা হয় ট্রান্স-লুনার ইনজেকশন, বাংলায় বললে, চাঁদের পথে যাওয়ার চূড়ান্ত ধাক্কা।

চাঁদের দেশে ৫-৬ দিনের নিঃশব্দ ভ্রমণ

এই মুহূর্তটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই ঠিক হয়, মহাকাশযান পৃথিবীর চারপাশে ঘুরবে, না কি পৃথিবীর বন্ধন ছেড়ে চাঁদের পথে বেরিয়ে পড়বে. এরপর শুরু হবে ৫ থেকে ৬ দিনের নিঃশব্দ ভ্রমণ। মহাকাশযানের জানালার বাইরে ধীরে ধীরে ছোট হতে থাকবে পৃথিবী। আর সামনে বড় হতে থাকবে চাঁদ। সেই চাঁদের কাছে গিয়ে মহাকাশযানটি একবার ঘুরে আসবে। কিন্তু নামবে না। কারণ এই মিশনের উদ্দেশ্য চাঁদে নামা নয়, বরং সেখানে যাওয়ার পথটি ঠিকঠাক বোঝা। চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ এখানে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি মহাকাশযানটিকে নিজের দিকে টেনে নেয়, আবার সেই টানকেই ব্যবহার করে তাকে পৃথিবীর দিকে ঠেলে দেয়। যেন এক অদৃশ্য স্লিংশট, এই কৌশল ব্যবহার করেই মহাকাশযানটি পৃথিবীতে ফিরে আসবে। এই পুরো যাত্রায় থাকবেন চারজন মহাকাশচারী। তাঁরা শুধু মহাকাশে ভ্রমণ করবেন না। তাঁরা পরীক্ষা করবেন মহাকাশযানের প্রতিটি যন্ত্র, প্রতিটি সিস্টেম, প্রতিটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বহু বছর পর মানুষ আবার চাঁদের এত কাছে যাবে। তাই এই মিশনই হবে ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগার।

বায়ুমন্ডলে প্রবেশ ও কঠিন ফেরার পথ

তবে ফেরার পথটাই হবে সবচেয়ে কঠিন। যখন ওরায়েন স্পেসক্রাফট পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢুকবে, তখন এর গতি হবে এত বেশি যে চারপাশে আগুনের মতো প্লাজমা তৈরি হবে। তাপমাত্রা পৌঁছে যাবে হাজার হাজার ডিগ্রিতে। কিন্তু এর বিশেষ তাপঢাল সেই আগুন ঠেকিয়ে রাখবে। তারপর ধীরে ধীরে খুলবে প্যারাশুট। আর একসময় মহাকাশযানটি নেমে আসবে সমুদ্রে। সেখানে অপেক্ষা করবে উদ্ধারকারী দল। পুরো মিশনের সময়কাল ১০ দিন। আর্টিমিস ২ এর ভ্রমণ বৃত্তান্ত শুনলে মনে হতে পারে এ যেন এক সরল যাত্রা। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে অসংখ্য জটিলতা, হাজার হাজার মানুষের পরিশ্রম, আর বহু বছরের পরিকল্পনা। কারণ এই মিশনের আসল লক্ষ্য শুধু চাঁদ ঘুরে আসা নয়। এর লক্ষ্য আরও বড়। যদি আর্টেমিস টু মিশন সফল হয়, তাহলে পরবর্তী ধাপে মানুষ আবার চাঁদের মাটিতে পা রাখবে এবং সেখান থেকেই অদূর ভবিষ্যতে শুরু হবে আরও দূরের যাত্রা, একেবারে মঙ্গলগ্রহের দিকে

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular