সময়ের প্রবাহ ও আধুনিক বিজ্ঞান
সময় আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের সঙ্গী। কিন্তু সময় কি সর্বত্র একই গতিতে চলে? মহাকাশে কি সময়ের গতি ভিন্ন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই আগামী সপ্তাহে ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি (ESA) শুরু করতে যাচ্ছে ‘ACES’ মিশন। এটা হচ্ছে ‘Atomic Clock Ensemble in Space’ এর সংক্ষিপ্ত রূপ।
আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ও সময়ের গতি
এই মিশনের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা মহাকাশে সময়ের প্রবাহ নিয়ে গবেষণা করবেন। সময়ের গতি আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের মতে, সময়ের গতি কোনো ধ্রুবক নয়—এটি ভর, গতি এবং মহাকর্ষ বলের উপর নির্ভরশীল। মহাকর্ষ কম হলে সময় দ্রুত চলে। অর্থাৎ, পৃথিবীর পৃষ্ঠের তুলনায় মহাশূন্যে সময় কিছুটা দ্রুত প্রবাহিত হয়। আবার বস্তুর গতি বৃদ্ধি পেলে, সময়ের গতি কমে যায়। অর্থাৎ মহাশূন্যে চলমান রকেটের মধ্যে সময়ের গতি কিছুটা শ্লথ হয়ে যায়। আইনস্টাইনের এই তত্ত্বকে যাচাই করতেই ACES মিশনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (ISS) পাঠানো হবে অত্যন্ত উচ্চ-নির্ভুলতার দুটি অত্যাধুনিক পারমাণবিক ঘড়ি।এদের নাম দেয়া হয়েছে, PHARAO এবং SHM।
অত্যাধুনিক পারমাণবিক ঘড়ি PHARAO এবং SHM
ফ্রান্সে নির্মিত PHARAO (Projet d’Horloge Atomique à Refroidissement d’Atomes en Orbite) হলো একটি লেজার-কুলড সিজিয়াম অ্যাটমিক ক্লক। এই ঘড়িতে সিজিয়াম পরমাণুগুলিকে প্রায় শূন্য কেলভিনে ঠান্ডা করে সময়ের গতি নির্ধারণ করা হয়। অপরদিকে সুইজারল্যান্ডে বানানো SHM বা Space Hydrogen Maser একটি হাইড্রোজেন-ভিত্তিক ঘড়ি, যা স্বল্পমেয়াদে অত্যন্ত স্থিতিশীল সময় সংকেত দিতে সক্ষম। আশা করা যাচ্ছে, এই দুটি ঘড়ি একসঙ্গে কাজ করে পৃথিবী ও মহাশূন্যের মধ্যকার সময়ের সামান্যতম পার্থক্যও নির্ণয় করতে সক্ষম হবে।
মহাশূন্যে পরীক্ষা চালানোর সুবিধা
তবে এই ধরনের গবেষণা নতুন কিছু নয়। পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠেও একাধিকবার পারমাণবিক ঘড়ি ব্যবহার করে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা যাচাই করা হয়েছে। কিন্তু এবার বিষয়টি আলাদা, কারণ এই পরীক্ষা করা হচ্ছে মহাশূন্যে, যেখানে পৃথিবীর মতো পরিবেশগত সমস্যা নেই। পৃথিবীতে ঘড়িগুলোকে যখন পরীক্ষা করা হয়, তখন মাধ্যাকর্ষণ, তাপমাত্রার পরিবর্তন, বায়ুর চাপসহ নানা সীমাবদ্ধতা সময় মাপার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। কিন্তু মহাশূন্য হলো এক নিঃশব্দ ল্যাবরেটরি, যেখানে এইসব পার্থিব প্রভাব প্রায় অনুপস্থিত। ফলে সময়ের প্রকৃত স্বরূপ এবং আপেক্ষিকতার সূক্ষ্মতম দিকগুলো এখানে অনেক বেশি স্পষ্টভাবে ধরা যায়।
ACES মিশনের পরিকল্পনা ও সময়সীমা
ACES মিশনটি ২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল, অর্থাৎ আগামী সোমবার, স্পেসএক্সের একটি রকেটের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (ISS) পাঠানো হবে। সেখানে ইউরোপীয় কলম্বাস মডিউলের বাইরে এই সিস্টেমটি স্থাপন করা হবে। তারপর আগামী ৩০ মাস ধরে এটি মহাকাশে সময়ের প্রবাহ নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করবে। এসব ডেটা পৃথিবীর বিভিন্ন গবেষণাগারে স্থাপিত ঘড়িগুলোর সঙ্গে তুলনা করে সময়ের অমিল বা ভিন্নতা যাচাই করা হবে। যদি দেখা যায়, মহাশূন্যে সময় সত্যিই একটু দ্রুত চলে, তবে তা আইনস্টাইনের তত্ত্বকে আরও শক্তিশালী প্রমাণ দেবে।
ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিতে এই গবেষণার প্রভাব
এই ধরনের গবেষণার তাৎপর্য কেবল তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে সীমাবদ্ধ নয়। সময়ের সূক্ষ্মতম হিসাব নির্ভর করে যেসব প্রযুক্তির উপর, যেমন – GPS, টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক, স্যাটেলাইট সিঙ্ক্রোনাইজেশন – এসবের নির্ভুলতা আরো বাড়বে এই গবেষণার মাধ্যমে। এছাড়া ACES থেকে পাওয়া ফলাফল হয়তো ভবিষ্যতে আমাদেরকে ডার্ক ম্যাটার কিংবা মহাবিশ্বের গঠন সম্পর্কেও নতুন ধারণা দিতে পারে।
সময়কে নতুনভাবে চেনার বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা
ACES মিশন কেবল এক জোড়া ঘড়ির গল্প নয়। এটি এমন এক বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা,—যার মাধ্যমে সময়কে আর ঘড়ির কাঁটার ভেতর বেঁধে রাখা যাবে না। সময় যে আসলে চলমান, ভাসমান এবং আপেক্ষিক, সেই সত্যকেই আবার একবার নতুন করে বোঝানোর জন্য বিজ্ঞানীরা এবার তাকিয়েছেন মহাশূন্যের দিকে। যেখানে সময় যেন নিজের ছায়ার সঙ্গে দৌড়াচ্ছে। একটু বেশি দ্রুতলয়ে, একটু বেশি নিঃশব্দে।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার
ছবি সৌজন্য: ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি।
