আশ্চর্য রেডিও সংকেত
১৯৭৭ সালের ১৫ আগস্ট। যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির শান্ত এক মহাকাশ গবেষণাগার। গভীর রাত। বিশাল একটি যন্ত্র আকাশের দিকে কান পেতে শুনছিল মহাবিশ্বের নিঃশব্দ ফিসফিসানি। কাজটা ছিল একঘেয়ে, দূর মহাকাশ থেকে আসা ক্ষীণ রেডিও সংকেত রেকর্ড করা। সেই সময় হঠাৎ করেই যন্ত্রটি একটি আশ্চর্য রেডিও সংকেত ধরে ফেলল।
কয়েক দিন পর কম্পিউটারের প্রিন্টআউট পরীক্ষা করার সময় একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী সেই অস্বাভাবিক রেডিও সংকেতটি দেখতে পান। বিস্মিত হয়ে তিনি প্রিন্টআউটের পাশে লাল কালিতে লিখেছিলেন— “Wow!” সেখান থেকেই “Wow! Signal” নামটির জন্ম। আর তারপর থেকে প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে এটি রয়ে গেছে মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় সংকেতগুলোর একটি।
মহাবিশ্বে আমরা কি একা?
মানুষ বহুদিন ধরেই ভেবেছে, এই বিশাল মহাবিশ্বে কি শুধু আমরাই একমাত্র বুদ্ধিমান প্রাণী? নাকি দূর নক্ষত্রের কোনো গ্রহে অপর কোন সভ্যতা আকাশের দিকে তাকিয়ে একই প্রশ্ন করছে?
এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নিয়েছিল SETI বা “Search for Extraterrestrial Intelligence” প্রজেক্ট। অর্থাৎ ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান সভ্যতার সন্ধান। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, যদি কোথাও কোনো উন্নত সভ্যতা থেকে থাকে, তাহলে তারা হয়তো শক্তিশালী রেডিও সংকেত ব্যবহার করতে পারে। কারণ রেডিও তরঙ্গ মহাকাশে অনেক দূর পর্যন্ত ভ্রমণ করতে পারে।
তাই পৃথিবীর বিভিন্ন রেডিও টেলিস্কোপ আকাশের দিকে কান পেতে থাকে। ঠিক যেন মহাজাগতিক সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে কেউ দূরের অচেনা জাহাজের হুইসেল শোনার চেষ্টা করছে।
বিগ ইয়ার
যে যন্ত্রটি সেই রহস্যময় সংকেত ধরেছিল তার নাম ছিল “বিগ ইয়ার”। এটি ছিল একটি বিশাল রেডিও টেলিস্কোপ। আর এই রেডিও টেলিস্কোপ দিয়ে ওয়াও সিগন্যাল শনাক্তকারী জ্যোতির্বিজ্ঞানীর নাম ছিল, জেরী এহম্যান। তিনি ছিলেন SETI প্রকল্পের একজন স্বেচ্ছাসেবী গবেষক।
মজার ব্যাপার হলো, বিগ ইয়ার চলমান টেলিস্কোপ ছিল না। এটা ছিল স্থির। পৃথিবী নিজের অক্ষে ঘুরছিল, আর সেই ঘূর্ণনের ফলে আকাশের বিভিন্ন অংশ ধীরে ধীরে এর দৃষ্টিসীমার ভেতর দিয়ে চলে যাচ্ছিল। ফলে কোনো সংকেত সাধারণত প্রায় ৭২ সেকেন্ডের বেশি ধরা পড়তো না। আর ঠিক ৭২ সেকেন্ডের জন্যই ধরা পড়েছিল সেই অদ্ভুত সংকেত।
6EQUJ5 রহস্যের কোড
সংকেতটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে কম্পিউটার প্রিন্টআউটে সেটি আলাদা করে চোখে পড়ে যায়। সেখানে একটি অদ্ভুত কোড লেখা ছিল: 6EQUJ5। এটি আসলে সংকেতের তীব্রতার হিসাব। যত ডানে যাওয়া যায়, সংকেত তত শক্তিশালী হয়েছে, পরে আবার দুর্বল হয়ে গেছে। অর্থাৎ সংকেতটি ধীরে ধীরে উঠেছে এবং পরে আবার মিলিয়ে গেছে। ঠিক যেমনটি মহাকাশের কোনো দূরবর্তী উৎস থেকে আশা করা যায়।
ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, সংকেতটি এসেছিল একটি বিশেষ ফ্রিকোয়েন্সিতে- প্রায় ১৪২০ মেগাহার্টজে। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সংখ্যা। কারণ এই ফ্রিকোয়েন্সি হলো নিরপেক্ষ হাইড্রোজেনের স্বাভাবিক স্পেকট্রাল লাইন।
মহাবিশ্বে সবচেয়ে বেশি যে মৌলটি রয়েছে সেটি হলো হাইড্রোজেন। তাই অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, কোনো উন্নত সভ্যতা যদি ইচ্ছাকৃতভাবে সংকেত পাঠাতে চায়, তাহলে তারা হয়তো এই ফ্রিকোয়েন্সিই ব্যবহার করবে। কারণ এটি এক ধরনের “মহাজাগতিক সাধারণ ভাষা” হতে পারে।
তাহলে কি এটি এলিয়েনদের বার্তা?
এখানেই রহস্যের শুরু। Wow! Signal এতটাই অস্বাভাবিক ছিল যে অনেক বিজ্ঞানী প্রথমে ভেবেছিলেন, হয়তো এটি সত্যিই কোনো বুদ্ধিমান সভ্যতার পাঠানো সংকেত। কারণ এটি ছিল খুব সংকীর্ণ ব্যান্ডের, অত্যন্ত শক্তিশালী, এবং প্রাকৃতিক রেডিও উৎসের মতো আচরণ করছিল না।
কিন্তু সমস্যা হলো, সংকেতটি আর কখনো ফিরে আসেনি। বিজ্ঞানীরা বহুবার একই জায়গায় খুঁজেছেন। আরও উন্নত যন্ত্র দিয়ে অনুসন্ধান করেছেন। কিন্তু দ্বিতীয়বার আর সেই সংকেত ধরা পড়েনি। যদি এটি কোনো নিয়মিত ভিনগ্রহী সম্প্রচার হতো, তাহলে হয়তো আবার দেখা যেত। কিন্তু মহাবিশ্ব নীরবই রয়ে গেল।
সম্ভাব্য ব্যাখ্যা
বছরের পর বছর ধরে ওয়াও সিগন্যালের অনেক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। কেউ বলেছেন, এটি হয়তো ধূমকেতুর গ্যাসমেঘ থেকে আসা সংকেত। কেউ বলেছেন, পৃথিবীর কোনো অজানা রেডিও ইন্টারফেয়ারেন্স। আবার কেউ মনে করেন, এটি হয়তো একেবারেই বিরল কোনো প্রাকৃতিক মহাজাগতিক ঘটনা।
২০১৭ সালে কিছু গবেষক দাবি করেছিলেন, দুটি ধূমকেতুর চারপাশের হাইড্রোজেন মেঘ হয়তো এই সংকেতের কারণ হতে পারে। কিন্তু সেই ব্যাখ্যা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। কারণ অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, ধূমকেতুর সংকেত এত শক্তিশালী ও এত নির্দিষ্ট হওয়ার কথা নয়। অর্থাৎ রহস্য এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি।
মহাবিশ্বের নীরবতা ও ফার্মি প্যারাডক্স
Wow! Signal আমাদের একটি অদ্ভুত সত্যের সামনে দাঁড় করায়। মহাবিশ্ব অবিশ্বাস্য রকম বিশাল। শুধু আমাদের ছায়াপথেই শত শত বিলিয়ন নক্ষত্র। আবার মহাবিশ্বে রয়েছে শত শত বিলিয়ন গ্যালাক্সি।
তাহলে কোথায় সবাই?
আর এই প্রশ্নটিই, “ফার্মি প্যারাডক্স” নামে পরিচিত। অর্থাৎ, এত বিশাল মহাবিশ্বে যদি বুদ্ধিমান সভ্যতা প্রচুর থেকে থাকে, তাহলে আমরা এখনো তাদের কোনো স্পষ্ট চিহ্ন কেন পাইনি?
Wow! Signal যেন সেই নীরব মহাবিশ্বে হঠাৎ ভেসে আসা একটি ক্ষণিকের ফিসফিসানি। হয়তো এটি নিছকই একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। আবার হয়তো এটি ছিল এমন কিছুর ইঙ্গিত, যার অর্থ আমরা এখনো বুঝতে পারিনি।
৭২ সেকেন্ডের বিস্ময়
আজ প্রায় পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেছে। “Big Ear” টেলিস্কোপটি এখন আর নেই। কিন্তু সেই ৭২ সেকেন্ডের সংকেত এখনো বিজ্ঞানীদের কৌতূহল জাগিয়ে রাখে। হয়তো কোনোদিন আমরা এর ব্যাখ্যা খুঁজে পাব। আবার হয়তো কখনোই পাব না। তবু সেই লাল কালির ছোট্ট শব্দটি- “Wow!” মহাবিশ্বজুড়ে অজানাকে খুঁজে ফেরার ইতিহাসে এক চিরন্তন বিস্ময়ের প্রতীক হয়ে থাকবে।
