প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে যেন ধীরে ধীরে জেগে উঠছে বিশাল এক দানব। আর পৃথিবীর জলবায়ু বিজ্ঞানীরা এখন উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে আছেন সেদিকেই।
একটি “সুপার এল নিনো” তৈরির আভাস মিলছে।
এটা কোনো অতিরঞ্জিত শিরোনাম নয়। মার্কিন জলবায়ু সংস্থা NOAA সতর্ক করছে, বছরের শেষ দিকে এই এল নিনো অত্যন্ত শক্তিশালী রূপ নিতে পারে। ইউরোপের কিছু এআই ভিত্তিক জলবায়ু মডেল বলছে, নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
সংখ্যাটা শুনতে ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু জলবায়ুর ভাষায় এটি এক বিশাল অস্থিরতার সংকেত।
যদি সত্যিই এমনটা ঘটে, তবে এটি ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোগুলোর একটিতে পরিণত হতে পারে।
১৮৭৭ সালের সেই ভয়াবহ এল নিনো আজও জলবায়ু ইতিহাসে আতঙ্কের প্রতীক হয়ে আছে। পৃথিবীর বহু অঞ্চলে তখন খরা, ফসলহানি, দুর্ভিক্ষ আর খাদ্যসংকটে কোটি কোটি মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল।
অবশ্য বিজ্ঞানীরা এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি। কারণ প্রকৃতি সবসময়ই কিছু অনিশ্চয়তা রেখে দেয়। বসন্তকাল এল নিনো পূর্বাভাসের জন্য কঠিন সময়। তাই মাঝগ্রীষ্মের পর পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হবে। তবে মাঝারি মাত্রার এল নিনো এখনোও সম্ভব।
• এল নিনো আসলে কী?
সহজ ভাষায় বললে, প্রশান্ত মহাসাগরের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শক্তিশালী বাণিজ্যিক বায়ু হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন পশ্চিমে জমে থাকা বিশাল উষ্ণ পানির স্তর ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে সরে যেতে শুরু করে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
আর এই এক পরিবর্তনই যেন পুরো পৃথিবীর আবহাওয়ার ছন্দ লন্ডভন্ড করে দেয়। দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক অঞ্চলে দেখা দিতে পারে তীব্র খরা। অস্ট্রেলিয়ায় বাড়তে পারে দাবানলের ঝুঁকি। অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে নেমে আসতে পারে অতিবৃষ্টি ও ভয়াবহ বন্যা। প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যাও বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা আবারও নতুন রেকর্ড ছুঁতে পারে।
• পৃথিবী বদলে গেছে
কিন্তু এবারের পরিস্থিতিকে আলাদা করে তুলেছে আরেকটি উদ্বেগের বিষয়। এখনকার পৃথিবী আর আগের পৃথিবী নয়। ২০১৫-১৬ সালের সুপার এল নিনোর সময়ও প্রশান্ত মহাসাগর আজকের তুলনায় অনেক ঠান্ডা ছিল। গত এক দশকে পৃথিবীর সমুদ্র বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত তাপ শোষণ করেছে। অর্থাৎ এল নিনোর জন্য মঞ্চ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি উত্তপ্ত।
• অশনি সংকেত
প্রকৃতির নিয়ম একই আছে, কিন্তু পটভূমি বদলে গেছে। আর উষ্ণতর পৃথিবীতে, একই জলবায়ুগত ধাক্কাও এখন অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। আবহাওয়া পূর্বাভাসের সবচেয়ে খারাপ সম্ভাবনাগুলো এখন আর দূরের কোন কল্পনা নয়।
