সাধারণত কৃষির মূল্য মাপা হয় শুধু ফসলের হিসেবে। কে কত ধান ফলাল, কত গম, কত ফল বা শাকসবজি উৎপাদন করল – সেটাই হলো মূল কথা। কিন্তু পৃথিবী বদলে যাচ্ছে। এখন একই জমি শুধু খাদ্যই দেয় না, বাতাস থেকে কার্বন শুষে নিয়ে আয়ও করতে পারে। শুনতে অবাক লাগলেও, অস্ট্রেলিয়ায় এখন এমন এক ব্যবসা চলছে যেখানে “কার্বন” নিজেই এক ধরনের কৃষি সম্পদে পরিণত হয়েছে।
বিষয়টি একটু খুলেই বলি।
অস্ট্রেলিয়ার বড় বড় শিল্পকারখানা প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে ছড়াচ্ছে। এতে বায়ুমণ্ডলে গ্রীনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বাড়ছে, পৃথিবী আরও উষ্ণ হয়ে উঠছে। তাই সরকার বলছে, কার্বন নির্গমনের একটা সীমা আছে। সেই সীমা ছাড়ালে শিল্পকারখানাকে জরিমানা দিতে হবে, অথবা কিনতে হবে – কার্বন ক্রেডিট।
কার্বন ক্রেডিট আসলে কী?
ব্যাপারটা আসলে খুব সহজ। যদি কেউ পরিবেশ থেকে এক টন কার্বন কমাতে পারে – যেমন গাছ লাগিয়ে, মাটির ভেতর কার্বন আটকে রেখে, গবাদিপশুর মিথেন নির্গমন কমিয়ে, অথবা জমিতে বিশেষ ধরনের জীবাণু ব্যবহার করে- তাহলে সে পাবে একটি কার্বন ইউনিট। অস্ট্রেলিয়ায় একে বলা হয়, অস্ট্রেলিয়ান কার্বন ক্রেডিট ইউনিট (ACCU)। এক ইউনিট মানে এক টন কার্বন।
এখন প্রশ্ন হলো, কৃষক কীভাবে মাটিতে এই কার্বন ধরে রাখবেন?
উপায় আছে অনেক। যেমন:
- কম চাষ দিয়ে জমি তৈরি করা
- ফসল কাটার পর খড় বা জৈব পদার্থ মাটিতে ফিরিয়ে দেওয়া
- কভার ক্রপ লাগানো
- জমির পাশে গাছের সারি বা এগ্রো-ফরেস্ট্রি করা
- মাটির নীচে জীবাণুদের সক্রিয় রাখা।
কার্বন সিকুয়েস্ট্রেশন ও আর্থিক লাভ
আসলে পুরো প্রক্রিয়ার ভিত্তিই হলো, সালোকসংশ্লেষণ। উদ্ভিদ সূর্যের আলো ব্যবহার করে বাতাসের কার্বন ডাই-অক্সাইড টেনে নিয়ে তাকে শর্করা ও জৈব পদার্থে রূপান্তর করে। সেই কার্বনেরই একটি অংশ গাছের শিকড়, পাতা ও জৈব আবর্জনার মাধ্যমে মাটিতে জমা হয়। এতে বাতাসের কার্বন উদ্ভিদের মাধ্যমে মাটির জৈব পদার্থে জমা হয়। এভাবে দীর্ঘমেয়াদে মাটিতে কার্বন আবদ্ধ করে রাখার নাম: কার্বন সিকুয়েস্ট্রেশন।
এরপর বিশেষ পদ্ধতিতে সেই জমির কার্বনের পরিমাণ মাপা হয়। যদি দেখা যায় সত্যিই কার্বনের পরিমাণ বেড়েছে, তাহলে সরকারের অনুমোদিত সংস্থা সেই পরিমাণকে কার্বন ক্রেডিট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কৃষক তখন সেই ক্রেডিট বাজারে বিক্রি করতে পারেন।
অস্ট্রেলিয়াতে এক কার্বন ক্রেডিটের বর্তমান বাজার মূল্য ৩০ থেকে ৩৫ ডলার। অর্থাৎ কৃষক যদি তার জমি চাষাবাদের মাধ্যমে বছরে ১০০০ টন কার্বন ধরে রাখতে পারেন, তাহলে তার বাজারমূল্য হবে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার ডলার। কার্বন ক্রেডিটের ক্রেতা সাধারণত বড় বড় কোম্পানি। যারা নিজেদের কার্বন নির্গমন “অফসেট” করতে চায়। অর্থাৎ, দূষণকারী শিল্পই শেষ পর্যন্ত কৃষকের হাতে এই টাকাটা তুলে দেয়।
কৃষির নতুন অর্থনীতি
তার মানে হলো, একজন কৃষক শুধু ফসল বিক্রি করছেন না, তিনি এক অর্থে বাতাসের কার্বন মাটিতে জমা করে “পরিষ্কার বাতাস” বিক্রি করছেন। তার জমিতে ফসল হচ্ছে, একই সঙ্গে মাটির নিচে জমছে কার্বন আর সেই জমে থাকা কার্বনেরও দাম পাচ্ছেন তিনি। একে এখন বলা হচ্ছে, কার্বন কৃষি। এক কথায় বলা যায়, কৃষির নতুন অর্থনীতি।
আগে কৃষকের আয় নির্ভর করত বৃষ্টি, ফলন আর বাজারদরের ওপর। এখন তার সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেকটি স্তর – পৃথিবীকে ঠান্ডা রাখার বিনিময়ে নগদ অর্থ। এ যেন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক নতুন চুক্তি।
আর বাংলাদেশে?
এখানেও এই ধারণা ধীরে ধীরে ঢুকছে। বনায়ন, কৃষি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, এমনকি পোশাক শিল্পেও কার্বন বাজারের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে কৃষিক্ষেত্রে এর সম্ভাবনা বিশাল। আমাদের দেশের কোটি কোটি কৃষক যদি জমির মাটিতে কার্বন ধরে রাখতে পারেন, তাহলে ভবিষ্যতে শুধু ধান বা পাট নয় – সেই কার্বনও বিক্রি করতে পারবেন।
তবে এই পথ খুব সহজ নয়। এর জন্য দরকার সঠিক পরিমাপ, দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি, স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। তবু ভবিষ্যতের দিকটা স্পষ্ট। আগামী দিনের কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের গল্প নয়। এটি হবে তিনটি জিনিসের সমন্বয় – খাদ্য, কার্বন ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করা। ভবিষ্যতের কৃষি শুধু মানুষের খাদ্য যোগাবে না, পৃথিবীকেও বাঁচাবে- এই আশা কি করা যায়?
