মূল কন্টেন্টে যান
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতামহাকাশ বিজ্ঞানব্লাড মুন: চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ কেন…

ব্লাড মুন: চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ কেন লাল বা রক্তিম দেখায়?

১২ মার্চ, ২০২৬

⏱ ৩ মিনিট পড়ার সময়

👁 ৮২ 💬 ০
ব্লাড মুন: চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ কেন লাল বা রক্তিম দেখায়?

ব্লাড মুন বা রক্তিম চাঁদ আসলে কী?

রাতের আকাশে পূর্ণিমার চাঁদকে আমরা দেখি উজ্জ্বল রুপোলি আলোয় ভেসে থাকতে। কিন্তু পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের সময় সেই পরিচিত চাঁদ হঠাৎ যেন অন্য রূপ ধারণ করে। ধীরে ধীরে তার আলো ম্লান হয়ে আসে, তারপর একসময় পুরো চাঁদটিই তামাটে লাল রঙে রাঙা হয়ে ওঠে। এই দৃশ্যকেই জনপ্রিয় ভাষায় বলা হয় “ব্লাড মুন”। নামটি শুনলে কারো কারো মনে হতে পারে আকাশে কোনো রহস্যময় ঘটনা ঘটছে। কিন্তু বাস্তবে এটি প্রকৃতির এক অপরূপ খেলা, যেখানে সূর্যের আলো, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল এবং মহাজাগতিক জ্যামিতি একসাথে কাজ করে।

পৃথিবীর ছায়ায় চাঁদের অবস্থান ও চন্দ্রগ্রহণ

• পৃথিবীর ছায়ায় চাঁদ
চন্দ্রগ্রহণ ঘটে তখনই, যখন সূর্য, পৃথিবী এবং চাঁদ একই সরলরেখায় অবস্থান করে। এই সময় পৃথিবী সূর্য ও চাঁদের মাঝখানে এসে পড়ে। ফলে সূর্যের আলো চাঁদের গায়ে সরাসরি পৌঁছাতে পারে না। পৃথিবীর বিশাল ছায়া তখন চাঁদের উপর পড়ে।

পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণে চাঁদ কেন অন্ধকার হয় না?

স্বাভাবিকভাবে মনে হতে পারে, পৃথিবী যখন সূর্যের আলো আটকাচ্ছে তখন চাঁদ সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেটা হয় না। বরং চাঁদ কালো না হয়ে লালচে হয়ে ওঠে। এই অদ্ভুত রঙের রহস্য লুকিয়ে আছে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে।

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও রেলি বিচ্ছুরণের রহস্য

• পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ভূমিকা
সূর্যের সাদা আলো আসলে একরঙা নয়; এটি বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোর মিশ্রণ। যখন এই আলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ভেতর দিয়ে যায়, তখন বায়ুমণ্ডলের অণু ও ভাসমান ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধূলিকণার কারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া ঘটে, যাকে বলা হয়, রেলি বিচ্ছুরণ (Rayleigh scattering)।

আলোক তরঙ্গের বিচ্ছুরণ ও আকাশের নীলিমা

এর ফলে, ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো বিশেষ করে নীল ও বেগুনি আলো বেশি ছড়িয়ে পড়ে। এই কারণেই দিনের বেলায় আকাশ আমাদের কাছে নীল দেখায়। অন্যদিকে লাল ও কমলা রঙের আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বড় হওয়ায় সেগুলো তুলনামূলক কম বিচ্ছুরিত হয় এবং অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে। সূর্য যখন দিগন্তের কাছে আসে, তখন সেই লালচে আলোই আমাদের চোখে বেশি ধরা পড়ে। তাই সূর্যাস্তের সময় আকাশ রক্তিম বা কমলা হয়ে ওঠে।

সূর্যাস্তের আলোয় যেভাবে চাঁদ রাঙা হয়ে ওঠে

• সূর্যাস্তের আলোয় রাঙা চাঁদ
চন্দ্রগ্রহণের সময় পৃথিবীর চারপাশে কার্যত একসাথে অসংখ্য সূর্যাস্ত ঘটছে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে সূর্যাস্তের সেই লালচে আলো বেঁকে গিয়ে পৃথিবীর ছায়ার ভেতরে প্রবেশ করে এবং শেষ পর্যন্ত চাঁদের গায়ে পৌঁছায়। ফলে পৃথিবীর ছায়ায় ঢাকা পড়েও চাঁদ পুরোপুরি অন্ধকার হয় না। বরং সূর্যাস্তের সেই লাল আলোয় আলোকিত হয়ে চাঁদ তামাটে বা রক্তিম আভা ধারণ করে। যেন পৃথিবীর সব সূর্যাস্ত মিলেমিশে দূরের সেই চাঁদটিকে রাঙিয়ে দিয়েছে।

ব্লাড মুনের রঙের ভিন্নতার কারণ

• রঙ সবসময় একই হয় না
তবে ব্লাড মুনের রঙ সব সময় একরকম হয় না। কখনো চাঁদ উজ্জ্বল কমলা, কখনো গাঢ় লাল, আবার কখনো তামাটে বাদামি রঙের দেখা যায়। এর প্রধান কারণ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের অবস্থা। যদি বায়ুমণ্ডলে ধূলিকণা, ধোঁয়া বা আগ্নেয়গিরির ছাই বেশি থাকে, তাহলে চাঁদের রঙ আরও গাঢ় হয়ে উঠতে পারে।

মহাজাগতিক আলোক বিজ্ঞান ও প্রাকৃতিক প্রদর্শনী

• মহাজাগতিক অপটিক্যাল খেলা
ব্লাড মুন কোনো রহস্যময় ঘটনা নয়। এটি আসলে সূর্যের আলো, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল এবং মহাকাশীয় জ্যামিতির এক অসাধারণ সমন্বয়। পৃথিবীর ছায়ায় ঢেকে যাওয়া চাঁদ, আর সেই ছায়ার ভেতর দিয়েই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ঘুরে আসা সূর্যাস্তের লাল আলো, এই মিলনেই সৃষ্টি হয় আকাশের সেই বিস্ময়কর দৃশ্য, ব্লাড মুন। বিশ্ব প্রকৃতির চমৎকার এক আলোক প্রদর্শনী।

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।