Homeজীবনের বিজ্ঞানঅদৃশ্য পথের সন্ধানে: পায়রার মগজে থাকা জাদুকরী কম্পাসের রহস্য উন্মোচন

অদৃশ্য পথের সন্ধানে: পায়রার মগজে থাকা জাদুকরী কম্পাসের রহস্য উন্মোচন

এক প্রাচীন রহস্য কল্পনা করুন আজ থেকে শত শত বছর আগের কথা। রাজা-বাদশাহদের আমল কিংবা প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ময়দান। যোগাযোগের জন্য কোনো ইন্টারনেট নেই, টেলিফোন নেই। আছে শুধু একদল বিশ্বস্ত দূত—হোমিং পিজন বা বার্তাবাহক পায়রা। যুদ্ধক্ষেত্রের ধোঁয়া, কুয়াশা কিংবা ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে শত শত মাইল অচেনা পথ পাড়ি দিয়ে ঠিকই তারা গন্তব্যে পৌঁছে যেত।

মানুষের তৈরি জিপিএস (GPS) কাজ করে মহাকাশে থাকা স্যাটেলাইটের সাহায্যে। কিন্তু একটি ছোট্ট পাখির মগজে তো আর স্যাটেলাইট রিসিভার বসানো নেই! তাহলে তারা পথ চেনে কীভাবে? এই প্রশ্নটি শুধু সাধারণ মানুষকেই নয়, বিজ্ঞানীদেরও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভাবিয়ে তুলেছে। তারা বুঝতে পারছিলেন, পায়রারা পৃথিবীর বিশাল চৌম্বক ক্ষেত্রকে (Magnetic Field) কোনোভাবে অনুভব করতে পারে। কিন্তু তাদের শরীরে সেই জাদুকরী ‘কম্পাস’টা ঠিক কোথায় লুকানো আছে, সেটাই ছিল প্রাণীবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি।

ভুল পথে বিজ্ঞানীদের গোয়েন্দাগিরি রহস্য সমাধানে বিজ্ঞানীরা প্রথমে গোয়েন্দাদের মতোই কাজ শুরু করলেন। প্রথমে সন্দেহ করা হলো পায়রার ঠোঁটকে। বিজ্ঞানীরা ভাবলেন, হয়তো পায়রার ঠোঁটে লোহার অতি ক্ষুদ্র কণা (ম্যাগনেটাইট) আছে, যা চৌম্বক ক্ষেত্র শনাক্ত করে। কিন্তু অনেক বছর পর প্রমাণিত হলো, সেগুলো আসলে রোগ প্রতিরোধকারী কোষ (ম্যাক্রোফেজ), কোনো কম্পাস নয়!

এরপর সন্দেহ গিয়ে পড়লো চোখের ওপর। বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করলেন, পায়রার চোখে ‘ক্রিপ্টোক্রোম’ নামের এক বিশেষ প্রোটিন আছে, যা আলোর উপস্থিতিতে কোয়ান্টাম মেকানিক্স ব্যবহার করে চৌম্বক ক্ষেত্র ‘দেখতে’ সাহায্য করে। একে বলা হলো ‘লাইট কম্পাস’। কিন্তু এখানেও একটা বড় সমস্যা দেখা দিল। এই কম্পাস তো শুধু আলোতেই কাজ করে! তাহলে মেঘলা দিনে বা রাতের অন্ধকারে পায়রারা কীভাবে পথ চেনে?

বোঝাই যাচ্ছিল, রহস্যের আসল সমাধান এখনও অধরা। ঠিক তখনই বিজ্ঞানীরা এক নতুন অভিযানের সিদ্ধান্ত নিলেন।

মস্তিষ্কের মানচিত্র খোঁজার অভিযান বিজ্ঞানের জগতে আলোড়ন ফেলা গবেষণাটির নাম ছিল—“A global screen for magnetically induced neuronal activity in the pigeon brain”, যা সাম্প্রতিক সময়ে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত হয়।

বিজ্ঞানীরা ভাবলেন, আমরা বাইরে বাইরে খুঁজছি কেন? সরাসরি পায়রার মস্তিষ্কের ভেতরেই উঁকি দিয়ে দেখা যাক না! তারা একটি অভিনব পরীক্ষা সাজালেন। পায়রাগুলোকে এমন একটি বিশেষ ঘরে রাখা হলো, যেখানে কৃত্রিমভাবে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের মতো পরিবেশ তৈরি করা যায়। এরপর চৌম্বক ক্ষেত্রের দিক পরিবর্তন করে বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে পায়রার পুরো মস্তিষ্কের (Global screen) স্ক্যান করা শুরু করলেন।

তারা দেখতে চাইলেন—ম্যাগনেটিক ফিল্ড পরিবর্তন হলে মস্তিষ্কের ঠিক কোন কোন অংশের নিউরনগুলো (স্নায়ুকোষ) বাল্বের মতো জ্বলে ওঠে বা সক্রিয় হয়।

অপ্রত্যাশিত চমক—কানের ভেতরের অ্যান্টেনা মস্তিষ্কের স্ক্যানিং রিপোর্টে যা দেখা গেল, তা বিজ্ঞানীদের রীতিমতো চমকে দিল। সিগন্যালগুলো চোখ বা ঠোঁট থেকে আসছিল না; সেগুলো আসছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এক জায়গা থেকে—পায়রার কানের একদম গভীর থেকে!

মানুষের মতো পায়রাদেরও কানের ভেতরে ভারসাম্য রক্ষার জন্য অর্ধবৃত্তাকার কিছু নালি (Semicircular canals) থাকে। বিজ্ঞানীরা দেখলেন, এই নালির ভেতরে থাকা ‘টাইপ-২ হেয়ার সেল’ (Type II hair cells) নামের অতি সূক্ষ্ম কিছু কোষ আসলে শক্তিশালী অ্যান্টেনার মতো কাজ করছে।

কিন্তু কীভাবে? এখানে প্রকৃতি এক অদ্ভুত পদার্থবিজ্ঞানের আশ্রয় নিয়েছে—যার নাম ‘ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ইন্ডাকশন’ বা তাড়িতচৌম্বকীয় আবেশ। বিষয়টা অনেকটা আপনার স্মার্টফোনের ওয়্যারলেস চার্জারের মতো। পায়রা যখন আকাশে উড়ে এবং তার মাথা এদিক-ওদিক নাড়ায়, তখন পৃথিবীর চৌম্বক রেখাগুলো তার কানের ওই নালিগুলোকে ভেদ করে যায়। এর ফলে কানের ভেতরের ওই কোষগুলোতে অতি সূক্ষ্ম বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি হয়।

মস্তিষ্কের গোপন কন্ট্রোল রুম কানের ভেতরের এই কোষগুলো সংকেত তৈরি করেই বসে থাকে না। তারা সেই মেসেজ পাঠায় মস্তিষ্কের গভীরে। বিজ্ঞানীরা দেখলেন, এই বৈদ্যুতিক বার্তাগুলো মস্তিষ্কের প্রধানত দুটি অংশে গিয়ে পৌঁছায়: ১. মেডিয়াল ভেস্টিবুলার নিউক্লিয়াই (Medial vestibular nuclei): এটি হলো মস্তিষ্কের প্রথম রিসিভিং স্টেশন। কানের সিগন্যালগুলো সরাসরি এখানে এসে পৌঁছায়। ২. কডাল মেসোপ্যালিয়াম (Caudal mesopallium): এটি হলো মস্তিষ্কের উচ্চতর প্রসেসিং সেন্টার বা আসল ‘ম্যাপ রুম’।

যখনই চৌম্বক ক্ষেত্রের সংকেত এই ম্যাপ রুমে পৌঁছায়, মস্তিষ্কের এই অংশটি তীব্রভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। পায়রার মস্তিষ্ক তখন এই ডেটা বিশ্লেষণ করে বুঝতে পারে—সে পৃথিবীর ঠিক কোথায় আছে এবং তাকে কোন দিকে উড়তে হবে।

দ্য ডার্ক কম্পাস বা অন্ধকারের দিশারী এই আবিষ্কারের সবচেয়ে যুগান্তকারী দিকটি হলো, এটি সেই পুরোনো রহস্যের সমাধান করে দিল—”পাখিরা অন্ধকারে কীভাবে ওড়ে?”

চোখের কম্পাস কাজ করার জন্য আলোর দরকার হলেও, কানের ভেতরের এই নতুন আবিষ্কৃত নেভিগেশন সিস্টেমটির কোনো আলোর প্রয়োজন হয় না। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন “ডার্ক কম্পাস” (Dark Compass)। রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে, ঘন মেঘের ভেতরে কিংবা বৃষ্টির মাঝেও এই কম্পাস সমানভাবে কাজ করে। কারণ পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র তো আর অন্ধকারে হারিয়ে যায় না!

প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ প্রকৌশল এই গবেষণাটি প্রমাণ করলো যে, একটি ছোট্ট পায়রার মস্তিষ্কের ভেতরে এমন এক নিখুঁত এবং জটিল নেভিগেশন সিস্টেম কাজ করছে, যা আমাদের আধুনিক প্রযুক্তির চেয়েও অনেক বেশি কার্যকর এবং স্বয়ংক্রিয়। কোনো ব্যাটারি বা কৃত্রিম স্যাটেলাইট ছাড়াই, শুধু পৃথিবীর নিজস্ব শক্তিকে কাজে লাগিয়ে কোটি কোটি বছর ধরে পাখিরা এই গ্রহের বুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

বিজ্ঞানীদের এই আবিষ্কার শুধু পায়রাদের রহস্যই সমাধান করেনি, বরং ভবিষ্যতে মানুষের তৈরি নেভিগেশন সিস্টেম, ডুবোজাহাজ বা ড্রোন প্রযুক্তিতেও হয়তো এই ‘ডার্ক কম্পাস’ বা কানের সেন্সরের ধারণা এক নতুন বিপ্লব নিয়ে আসবে। প্রকৃতি যে কত বড় বিজ্ঞানী, এই গল্পটি আমাদের সেটাই আবার মনে করিয়ে দেয়।

Raisul Sohan
Raisul Sohan
বিজ্ঞান অনুরাগী। শখের বিজ্ঞান লেখক।
RELATED ARTICLES

Most Popular