Homeবিবিধ বিজ্ঞানঘনঘন ভূমিকম্প: কতটা ঝুঁকির মুখে বাংলাদেশ?

ঘনঘন ভূমিকম্প: কতটা ঝুঁকির মুখে বাংলাদেশ?

সাম্প্রতিক ভূকম্পন: বিচ্ছিন্ন ঘটনা নাকি বড় পূর্বাভাস?

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে পাঁচ থেকে ছয় মাত্রার একাধিক ভূমিকম্প হয়েছে। ২৬ নভেম্বর ২০২১ ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে ৬.২ মাত্রার ভূমিকম্প, ১৬ জুন ২০২৩ সিলেট অঞ্চলে ৫.০ মাত্রার কম্পন, একই বছরের ২৪ আগস্ট আবার সিলেটে ৫.৫ মাত্রার ভূমিকম্প, ২ ডিসেম্বর ২০২৩ নোয়াখালীর রামগঞ্জ এলাকায় ৫.৫ মাত্রার কম্পন, ২১ নভেম্বর ২০২৫ নরসিংদী-ঢাকা অঞ্চলে ৫.৫ মাত্রার ভূমিকম্প এবং সর্বশেষ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সাতক্ষীরার সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় ৫.৩ মাত্রার ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। এসব ভূমিকম্পে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি না হলেও জনমনে প্রশ্ন জেগেছে, এগুলো কী কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি বড়সড় কোন ভূমিকম্পের পূর্বাভাস?

টেকটনিক প্লেট ও বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক অবস্থান

পৃথিবীর ভূত্বক বেশ কয়েকটি বিশাল টেকটনিক প্লেটের সমন্বয়ে তৈরি। ভারতীয় প্লেট উত্তরের দিকে অগ্রসর হয়ে ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষে হিমালয় পর্বতমালার সৃষ্টি করেছে। পূর্বদিকে ইন্দো-বার্মা সাবডাকশন জোনে ভারতীয় প্লেটের একটি অংশ বার্মা মাইক্রোপ্লেটের নিচে সরে যাচ্ছে। এই দুই সক্রিয় টেকটনিক ব্যবস্থার সংযোগস্থলের কাছেই বাংলাদেশের অবস্থান। এটা টেকটনিক প্লেটে চাপ জমে থাকার একটি সক্রিয় অঞ্চল। টেকটনিক প্লেটে দীর্ঘদিন ধরে চাপ জমে থাকে, আটকে থাকে, এবং একসময় হঠাৎ মুক্তি পায়। সেই আকস্মিক চাপ-মুক্তির ফলে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: অতীতের বড় ভূমিকম্প

ভূমিকম্পের বৈশ্বিক মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি সংবেদনশীল এলাকা। ইতিহাস বলছে, এই ভূখণ্ড বড় বড় কম্পনের সাক্ষী। ১৮৯৭ সালের আসাম ভূমিকম্প, যার মাত্রা ছিল ৮ এরও বেশি, উত্তর-পূর্ব ভারত ও তৎকালীন বাংলায় ব্যাপক ধ্বংস ডেকে আনে। ঢাকায় বহু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং ভূমির উচ্চতায় পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৯১৮ সালের শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প (প্রায় ৭.৬ মাত্রা) সিলেট অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে। এসব ঘটনা দেখায় যে বৃহৎ মাত্রার ভূমিকম্প এই অঞ্চলে নতুন নয়; বরং ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতার অংশ।

ভূপ্রাকৃতিক রূপান্তর ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব

ভূমিকম্পের প্রভাব কেবল স্থাপনা ধ্বংসে সীমাবদ্ধ থাকে না; কখনো কখনো সেটা ভূপ্রকৃতির চেহারাও পাল্টে দেয়। ১৭৬২ সালের শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর ভূমির উত্থান‌-পতনের প্রমাণ পাওয়া যায়। অনেক গবেষকের মতে, এ ধরনের ভূ-উত্থান, অবনমন এবং বন্যা ও পলি সঞ্চয়ের সম্মিলিত প্রভাবে ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথে বড় পরিবর্তন ঘটে। একসময় নদীটি পূর্বদিকে পুরনো ব্রহ্মপুত্র চ্যানেল ধরে মেঘনার দিকে প্রবাহিত হলেও পরবর্তীতে পশ্চিমমুখী সরে এসে বর্তমান যমুনা চ্যানেলকে প্রধান ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। অর্থাৎ ভূমিকম্প কেবল মুহূর্তের কম্পন নয়; তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব কখনো কখনো শতাব্দীব্যাপী ভূ-প্রাকৃতিক রূপান্তরে প্রতিফলিত হয়।

ফল্ট লাইন ও বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা

সাম্প্রতিক মাঝারি মাত্রার কম্পনগুলোকে অনেকে অশনি সংকেত হিসেবে দেখছেন। তবে বিজ্ঞান এখানে সতর্ক। ছোট ও মাঝারি ভূমিকম্প কখনো জমে থাকা চাপের একটি অংশ মুক্ত করতে পারে, কিন্তু তাতে বড় ভূমিকম্প ঠেকবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং সিলেটের উত্তরে ডাউকি ফল্ট কিংবা ইন্দো-বার্মা মেগাথ্রাস্টের মতো বৃহৎ ফল্ট লাইনে দীর্ঘদিন শক্তি সঞ্চিত থাকলে সেটা একসময় বৃহৎ আকারে মুক্ত হয়ে ৮ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প ঘটাতে পারে। বড় বড় ভূমিকম্পের পুনরাবৃত্তিকাল শত বছরের স্কেলে মাপা হয়; তাই কয়েক বছরের শান্ত সময় বড় বিপদের অনুপস্থিতির প্রমাণ নয়।

অপরিকল্পিত নগরায়ন ও সাইট অ্যাম্পলিফিকেশন

ভূমিকম্পের ধ্বংসলীলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভূপ্রকৃতি ও অবকাঠামো। ভূমিকম্পের মাত্রা এক জিনিস, কিন্তু ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করে মাটি ও নির্মাণকাজের মানের ওপর। ঢাকার মতো শহর নরম অ্যালুভিয়াল সেডিমেন্টের ওপর গড়ে উঠেছে। এই ধরনের মাটি কম্পনের তরঙ্গকে বাড়িয়ে দেয়, যাকে বলা হয়, “সাইট অ্যাম্পলিফিকেশন”। ফলে একই মাত্রার ভূমিকম্প পাহাড়ি অঞ্চলের তুলনায় নদীবিধৌত অববাহিকায় বেশি ক্ষতি করতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত জনসংখ্যা, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন এবং পুরোনো অবকাঠামো। সব মিলিয়ে ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

দুর্যোগ মোকাবিলা: অন্য দেশের অভিজ্ঞতা

তবে ভূমিকম্পের ইতিহাস কেবল ভয়ের গল্প নয়, প্রস্তুতির শিক্ষাও দেয়। জাপান, চিলি কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঞ্চল নিয়মিত শক্তিশালী ভূমিকম্পের মুখোমুখি হয়। তবু কঠোর নির্মাণমান, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এবং জনসচেতনতার মাধ্যমে তারা প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলকভাবে সীমিত রাখতে সক্ষম হয়েছে। ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা যায় না, কিন্তু বিপর্যয়ের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রস্তুতি ও করণীয়

বাংলাদেশেও সিসমিক জোনিং মানচিত্র প্রণয়ন, হালনাগাদ বিল্ডিং কোড এবং কিছু সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু নীতিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়নের মধ্যে এখনও ব্যবধান রয়ে গেছে। হাসপাতাল, স্কুল, সেতু ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে ভূমিকম্প-সহনশীল করা, পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে রেট্রোফিটিংয়ের মাধ্যমে শক্তিশালী করা এবং জরুরি সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা গড়ে তোলা এখন আর বিলম্বের বিষয় নয়, বরং অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

বিপর্যয় এড়াতে চাই সচেতনতা

ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস স্পষ্ট করে দেয়, আমাদের এই অঞ্চল অতীতে বড় ভূমিকম্প দেখেছে। তাই ভবিষ্যতেও তার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। প্রশ্ন হলো, সেই দিন এলে আমরা কতটা প্রস্তুত থাকব? ভূমিকম্প হয়তো অনিবার্য, কিন্তু বিপর্যয় অনিবার্য নয়। এই পার্থক্য নির্ধারণ করবে আমাদের আজকের পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতি।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular