Homeমহাকাশ বিজ্ঞানচন্দ্রযাত্রার সেকাল ও একাল

চন্দ্রযাত্রার সেকাল ও একাল

মানুষ যখন প্রথম চাঁদের পথে পা বাড়ায়, তখন সেই যাত্রা ছিল একদম সরাসরি। একটানা, দ্রুত আর শক্তিশালী এক ছুটে চলা। বিশাল স্যাটার্ন ফাইভ রকেট অ্যাপোলো মহাকাশযানকে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ ছাড়িয়ে এমন এক পথে ঠেলে দিত, যেখানে গতি ছিল সাফল্যের প্রধান শর্ত। ১৯৬৯ সালের ১৬ জুলাই উৎক্ষেপণের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অ্যাপোলো ১১কে চাঁদের পথে পাঠানো হয়। এরপর প্রায় ৭৬ ঘণ্টা, অর্থাৎ তিন দিনের মধ্যে নভোচারীরা পৌঁছে যান চাঁদের কাছাকাছি। এই যাত্রায় গড় গতিবেগ দাঁড়ায় আনুমানিক প্রতি ঘণ্টায় পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোমিটার। তখন পথ ছিল ছোট, সরাসরি, আর লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট – যত দ্রুত সম্ভব চাঁদে পৌঁছানো, ইতিহাস গড়া।

তৎকালীন সীমিত প্রযুক্তি ও অসীম সাহস

তখনকার সময়ে প্রযুক্তি ছিল সীমিত, কিন্তু সাহস ছিল অসীম। নিরাপত্তা অবশ্যই বিবেচনায় ছিল, তবে আজকের মতো বহুস্তর বিশ্লেষণ আর ধাপে ধাপে যাচাই করার সুযোগ তখন ছিল না। তাই পুরো মিশনটাই ছিল অনেকটা “দ্রুত পৌঁছাও”, এই দর্শনের উপর দাঁড়িয়ে। আজকের আর্টেমিস ২ মিশনে এসে সেই দর্শন বদলে গেছে। এখানে শক্তি আছে, গতি আছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে পরিকল্পনা আর নিরাপত্তা। উৎক্ষেপণের পর অরায়েন মহাকাশযানকে সরাসরি চাঁদের পথে পাঠানো হয়নি। প্রথমে তাকে একটি অত্যন্ত প্রসারিত উচ্চ-পৃথিবী কক্ষপথে নেওয়া হয়, যেটা পৃথিবী থেকে প্রায় ৪৬,০০০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত। এই পর্যায়ে প্রায় একদিন ধরে মহাকাশযানের সব গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেম খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা হয়। সবকিছু ঠিক আছে নিশ্চিত হওয়ার পরই শুরু হয় চাঁদের উদ্দেশ্যে মূল যাত্রা। ফলে চাঁদের সবচেয়ে কাছে পৌঁছাতে সময় লাগছে প্রায় পাঁচ দিন, অর্থাৎ প্রায় ১২০ ঘণ্টা। শুনে মনে হতে পারে, যেন রকেটের গতি কমে গেছে। কিন্তু বাস্তবতা একটু ভিন্ন. এখানে মহাকাশযান সরাসরি সোজা পথে পাঠানো হয়নি, বরং সেটা একটি বড়, বাঁকা ও দীর্ঘ পথ ধরে এগিয়ে গেছে। ফলে মোট দূরত্ব বেড়ে গেছে, আর সেই কারণেই সময়ও বেশি লেগেছে।

অ্যাপোলো ও আর্টেমিসের পথের পার্থক্য

অ্যাপোলো আর আর্টেমিসের মধ্যে পার্থক্যটা তাই শুধু সময়ের নয়, পথেরও। অ্যাপোলোর ছিল ছোট ও সরাসরি পথের দ্রুত যাত্রা। আর্টেমিস বেছে নিয়েছে বড়, হিসেবি আর নিরাপদ পথ। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ট্র্যাজেক্টরি বা গতিপথের নকশা। অ্যাপোলো মিশনেই প্রথম “ফ্রি-রিটার্ন ট্র্যাজেক্টরি” ব্যবহার করা হয়েছিল। একটি এমন পথ, যেখানে মহাকাশযান চাঁদের পাশ দিয়ে ঘুরে মহাকর্ষের প্রভাবে স্বাভাবিকভাবেই আবার পৃথিবীর দিকে ফিরে আসে। মাঝপথে বড় কোনো সমস্যা হলে আলাদা করে ইঞ্জিন চালানো ছাড়াই নিরাপদে ফিরে আসার সুযোগ থাকে। আর্টেমিস মিশনেও এই একই মৌলিক ধারণাকে আরও উন্নতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে দেখা যায়, অ্যাপোলো তুলনামূলকভাবে দ্রুত চাঁদে পৌঁছালেও, সেটি ছিল একটি সরাসরি ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ। আর্টেমিস ধীরগতির মনে হলেও, এটি আসলে আরও পরিণত, পরীক্ষিত এবং নিরাপদ এক কৌশলের প্রতিফলন।

দৃষ্টিভঙ্গির এই পরিবর্তনটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অ্যাপোলো ছিল একটানা দৌড়ে চাঁদ ছোঁয়ার এক দুরন্ত প্রতিযোগিতা। আর্টেমিস সেই দৌড়কে রূপ দিয়েছে এক দীর্ঘ যাত্রায়। যেখানে লক্ষ্য শুধু পৌঁছানো নয়, বরং বারবার ফিরে আসা, দীর্ঘদিন থাকা, আর ভবিষ্যতের আরও গভীর মহাকাশ অভিযানের ভিত্তি তৈরি করা।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular