Sunday, November 30, 2025

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ব্লগ সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এই সাইটে এখন, দেড়শোর বেশি বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা রয়েছে। আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeবিজ্ঞানীদের কথাজাম্পিং জিনের জননী

জাম্পিং জিনের জননী

সাধারনত সমসাময়িক কালের যুগান্তকারী কোন আবিষ্কারের জন্যই বিজ্ঞানের তিনটি শাখায় প্রতিবছর নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। কিন্তু ১৯৮৩ সালের জীববিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কারটি দেয়া হয়েছিল এমন একজন বিজ্ঞানীকে যার অবদানের কথা অনেকে প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন। এই বিস্মৃতপ্রায় বিজ্ঞানীর নাম হলো ডক্টর বারবারা ম্যাককিলন্টক। যে আবিষ্কারটির জন্য তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিলো সেটি তিনি  করেছিলেন প্রায় চল্লিশ বছর আগে। দুঃখজনক ব্যাপার হলো এই কাজটির জন্য সে সময় তিনি ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিলেন। অন্যভাবে বলতে হয়, তিনি মহিলা হওয়ার কারণে, তাঁর ঐ প্রথাবিরোধী আবিষ্কারটি সেই সময়ের পুরুষপ্রধান বিজ্ঞানীমহল সহজভাবে গ্রহণ করেনি।

বারবারার জন্ম হয়েছিল ১৯০২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যে। বাবা ছিলেন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার। ছোটবেলা থেকেই বারবারার ছিল বিজ্ঞান নিয়ে অসীম উৎসাহ। সে সময় মেয়েদের জন্য বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করা খুব সহজ ব্যাপার ছিল না। বিশেষত এ ব্যাপারে তাঁর মায়ের রীতিমতো আপত্তি ছিল। কিন্তু বাবার উৎসাহে তিনি কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলেন এবং লেখাপড়া করলেন জেনেটিক্সের মত একটি কঠিন বিষয় নিয়ে। বারবারা পিএইচডি শেষ করলেন ১৯২৭ সালে। বারবারার প্রচন্ড আগ্রহ ছিল সাইটোজেনেটিক্সে। খুব ভালো স্লাইড তৈরি করতে পারতেন তিনি। ঘন্টার পর ঘন্টা বসে মাইক্রোস্কোপের নীচে তিনি ক্রোমোজোম পর্যবেক্ষণ করতেন। এসব পর্যবেক্ষণের বেশ কিছু নতুন পদ্ধতিও তিনি উদ্ভাবন করেন। তাঁর নিবিড় পর্যবেক্ষণের ফলে সাইটোজেনেটিক্সের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সে সময় আবিষ্কৃত হয়েছিলো। যেমন মেয়োসিসের সময় ক্রোমোজোমের মধ্যে যে ক্রসিং ওভার (crossing over) হয় সেটা বারবারাই প্রথম প্রত্যক্ষ করেন। এ ছাড়া ক্রোমোজোমের সেন্ট্রোমিয়ার এবং টেলোমিয়ারের ভূমিকা তিনিই প্রথম ব্যাখ্যা করেন। তিনিই প্রথম ভুট্টার দশটি ক্রোমোজোমের জেনেটিক ম্যাপ তৈরি করেছিলেন।

চল্লিশের দশকে নিউইয়র্কের কোল্ড স্প্রিং হারবার ল্যাবরেটরিতে কাজ করার সময় তিনি ভুট্টার ক্রোমোজোমের মধ্যে বেশকিছু অসামঞ্জস্য লক্ষ্য করলেন। তাঁর কাছে মনে হল ক্রোমোজোমের ভেতর কিছু কিছু জিন (gene) সব সময় একই জায়গায় অবস্থান করে না। এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্য তিনি আরো অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন। বিভিন্ন জাতের ভুট্টা নিয়ে সংকরায়ন করে তিনি কয়েক হাজার পর্যবেক্ষণ করলেন। তারপর তিনি নিশ্চিত হলেন তাঁর পর্যবেক্ষণে কোন ভুল নেই। তিনি আরও লক্ষ্য করলেন জিনের অবস্থান পরিবর্তনের সাথে সাথে ভুট্টার দানার রংও পরিবর্তিত হয়ে যায়। তিনি তখন বুঝতে পারলেন জিনের বহিঃপ্রকাশের জন্য এই অবস্থান পরিবর্তনের একটি ভূমিকা রয়েছে। তিনি তাঁর পরীক্ষার ফলাফল গবেষণাপত্র আকারে প্রকাশ করলেন।‌ দুঃখজনকভাবে তখন তিনি ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হলেন। তৎকালীন বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরা তাঁর এই গবেষণার ফলাফল মেনে নিতে পারলেন না। কারণ সে সময় ধারণা করা হতো ক্রোমোজোমের ভেতরে জিনগুলো অনড় অবস্থানে থাকে। সেজন্য কেউ বারবারার এই অভিনব “জাম্পিং জিন” তত্ত্ব মানতে চাইলেন না। এক বিখ্যাত বিজ্ঞানী তো বলেই বসলেন, বারবারার স্ট্যাটিসটিক্যাল জ্ঞানে কিছু ঘাটতি রয়েছে, সেজন্যই গবেষণার ফলাফলে কিছু উল্টোপাল্টা হয়েছে। ‌ এসব মন্তব্যে বারবারা প্রচন্ড মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি এ বিষয় নিয়ে আর নতুন কোন গবেষণাপত্র প্রকাশ করেননি।

আসলে সে সময় ডি এন এ অণুর গঠন এবং কার্যপ্রণালী নিয়ে বিজ্ঞানীদের তেমন কোন ধারণা ছিল না। ‌ কিন্তু পরবর্তী দশক গুলোতে মলিক্যুলার বায়োলজিতে ব্যাপক গবেষণা হওয়ার ফলে বিজ্ঞানীরা জিনের কার্যপ্রণালী সম্বন্ধে অনেক নতুন বিষয় আবিষ্কার করেছেন। তাঁরা ডি এন এ অণুর ভেতর ট্রান্সপোসেবল এলিমেন্ট বা ট্রান্সপোসনের (transposon) সন্ধান পেয়েছেন যেগুলো কার্যত বারবারার সেই “জাম্পিং জিন” ছাড়া আর কিছুই নয়।ট্রান্সপোসনগুলো ডিএনএ অণুর মধ্যে তাদের স্থান পরিবর্তন করে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন ভুট্টা ছাড়াও আরো অনেক প্রাণী, উদ্ভিদ,  ব্যাকটেরিয়া এমনকি ভাইরাসের  ক্ষেত্রেও  ট্রান্সপোসনগুলো জিন রেগুলেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সত্তরের দশকের শেষে এসে বারবারার “জাম্পিং জিন” তত্ত্ব বিজ্ঞানী মহলে স্বীকৃতি পেয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে তিনি ১৯৮৩ সালে জীববিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। বয়স তখন তাঁর আশি পেরিয়ে গেছে। শেষ বয়সে এসে তিনি তাঁর কাজের স্বীকৃতি পেয়েছিলেন এটাই ছিল তাঁর সান্ত্বনা। সারা জীবন তিনি ছিলেন অকৃতদার। ল্যাবরেটরিই ছিল তাঁর ঘর সংসার। বিজ্ঞানকে সাথী করে সারা জীবন কাটিয়েছেন।

নোবেল কমিটি তাঁদের সম্মাননায় বারবারার কাজকে তুলনা করেছিলেন জেনেটিক্সের জনক গ্রেগর জোহান মেন্ডেলের কাজের সাথে। এর চেয়ে সম্মানের আর কি হতে পারে?

Tanvir Hossain
Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে প্রবল উৎসাহী। ‌স্কুলে পড়ার সময় অনুসন্ধানী বিজ্ঞান ক্লাবের সাথে জড়িত ছিলেন। তরুণ বয়স থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। তার লেখা বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। সাম্প্রতিক কালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য ভাষায় তুলে ধরেছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তার লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে। লেখালেখির পাশাপাশি দেশ ভ্রমণ এবং মহাকাশের ছবি তোলা তার প্রধান শখ। তানভীর হোসেনের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ এবং শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কৃষি বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি করার পর জেনেটিক্স এবং প্ল্যান্ট ব্রিডিংয়ে মাস্টার্স করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পরবর্তীতে একই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে বিজ্ঞানী হিসেবে এক দশক কাজ করার পর অভিবাসী হিসেবে পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়।‌ তারপর দীর্ঘ পঁচিশ বছর অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার পর অবসর নিয়েছেন। বর্তমানে আই পি পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments