বরফে ঢাকা, নীরব আর প্রায় জনমানবশূন্য এক দ্বীপ। পৃথিবীর উত্তর মেরুর খুব কাছে, নরওয়ের আর্কটিক অঞ্চলের কঠিন শীতলতার মধ্যে লুকিয়ে আছে মানব সভ্যতার এক অসাধারণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এর নাম, স্ভালবার্ড গ্লোবাল সীড ভল্ট। (Svalbard Global Seed Vault)
এটাকে অনেকেই “ডুমসডে ভল্ট” বলেন। কিন্তু আসলে এটি কোনো ভয়ের গল্প নয়, বরং এক ধরনের ভবিষ্যৎ সুরক্ষা। এখানে সংরক্ষিত আছে পৃথিবীর খাদ্য ব্যবস্থার ভিত্তি, ধান, গম, ভুট্টা, আলু, ডাল, নানা ধরনের শস্য ও উদ্ভিদের বীজ। সংখ্যার দিক থেকেও ব্যাপারটা চমকপ্রদ। এখন পর্যন্ত এখানে জমা হয়েছে প্রায় ১২ লক্ষেরও বেশি (১.২ মিলিয়ন) বীজের নমুনা। এই নমুনাগুলো প্রতিনিধিত্ব করে ৫ হাজারেরও বেশি ভিন্ন ভিন্ন উদ্ভিদ প্রজাতি এবং লক্ষাধিক স্থানীয় জাত বা ভ্যারাইটি। পৃথিবীতে যত ধরনের খাদ্যশস্য আছে, তার প্রায় সবকিছুরই বীজের সংগ্রহ এখানে রাখা হয়েছে। এ যেন পৃথিবীর কৃষি বৈচিত্র্যের এক জীবন্ত আর্কাইভ।
কত দেশ যুক্ত?
এটা কোনো একক দেশের প্রকল্প নয়। আজ পর্যন্ত ১০০টিরও বেশি দেশ, এবং শতাধিক জিনব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এখানে তাদের বীজ জমা দিয়েছে। এই ভল্ট পরিচালনা করে ক্রপ ট্রাস্ট, নরওয়ে সরকার এবং নর্ডিক জেনেটিক রিসোর্স সেন্টার। একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এখানে জমা রাখা বীজের মালিকানা ভল্টের নয়। প্রতিটি বীজ সেই দেশ বা প্রতিষ্ঠানেরই থাকে, যারা সেটা জমা দিয়েছে। ভল্ট শুধু তাদের বীজ নিরাপদে রাখে।
খরচ কত?
এই ভল্ট তৈরি করতে খরচ হয়েছিল প্রায় ৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। পরবর্তীতে এর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার খরচ বহন করে নরওয়ে সরকার এবং আন্তর্জাতিক অংশীদাররা। মানব সভ্যতার খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষার জন্য এই বিনিয়োগ আসলে খুবই সামান্য। খাদ্য নিরাপত্তার শেষ স্তর
কেন এত দূরে?
এই ভল্ট তৈরি করা হয়েছে নরওয়ের স্ভালবার্ড দ্বীপপুঞ্জে, একেবারে হিসেব করে। এখানে সারা বছরই তাপমাত্রা শূন্যের অনেক নিচে। চারপাশে চিরস্থায়ী পারমাফ্রস্ট। ফলে যদি বিদ্যুৎ চলে যায়, তবুও প্রাকৃতিক ঠান্ডা বীজগুলোকে জমাট অবস্থায় নিরাপদ রাখবে। ভল্টটি পাহাড়ের প্রায় ১০০-১২০ মিটার ভেতরে ঢুকে তৈরি করা হয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে যথেষ্ট উঁচুতে, যাতে বরফ গলে গেলেও পানি ঢুকতে না পারে। ভেতরে তাপমাত্রা রাখা হয় মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই তাপমাত্রায় অনেক বীজ শত শত বছর পর্যন্ত জীবিত থাকতে পারে।
কীভাবে কাজ করে?
এটি আসলে এক ধরনের “সেফ ডিপোজিট বক্স”। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের জিনব্যাংক তাদের বীজের ডুপ্লিকেট কপি এখানে জমা রেখেছে। যদি কোনো দেশে যুদ্ধ হয়, অথবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কোনো ফসলের জাত হারিয়ে যায় তখন সেই দেশ এই ভল্ট থেকে নিজেদের বীজ ফেরত নিতে পারে। এই কারণে এটিকে বলা হয়, “ব্যাকআপ অফ ব্যাকআপ” – পৃথিবীর খাদ্য নিরাপত্তার শেষ স্তর।
কার্যকারিতা প্রমাণিত
এটা শুধু ভবিষ্যতের জন্য নয়, ইতিমধ্যেই এর কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। সিরিয়ার আলেপ্পোতে যুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ICARDA তাদের জিনব্যাংক হারিয়ে ফেলেছিল। পরে এই ভল্ট থেকে বীজ নিয়ে তারা আবার গবেষণা শুরু করতে পেরেছে। অর্থাৎ, এটি কেবল ধারণা নয় বাস্তবেও কাজ করছে।
নীরব আশ্বাস
আমরা প্রতিদিন খাবার খাই। কিন্তু খুব কমই ভাবি, এই ফসলগুলো যদি একদিন হারিয়ে যায়? তখন কি হবে? পৃথিবীর খাদ্যব্যবস্থা আসলে ভীষণ ভঙ্গুর। একটুখানি পরিবর্তনেই অনেক ফসলের জাত চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে। সেই অনিশ্চয়তার বিপরীতে, বরফে ঢাকা এই পাহাড়ের ভেতরে রাখা ছোট ছোট কন্টেইনারের মধ্যে রাখা বীজগুলোই আমাদের এক ধরনের নিশ্চয়তা দেয়। এগুলো শুধু বীজ নয়। এগুলো ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। মানুষের ইতিহাসে অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে। কিন্তু এবার অন্তত আমরা চেষ্টা করছি আমাদের ফসলের বীজগুলো যাতে চিরতরে হারিয়ে না যায়।
