আলবার্ট আইনস্টাইন ও সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব
আলবার্ট আইনস্টাইন ছিলেন একজন অসাধারণ প্রতিভাবান বিজ্ঞানী। অনেকের মতে, তিনি ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। গত শতাব্দীর গোড়ার দিকে, ১৯১৫ সালে, তাঁর আবিষ্কৃত সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব সারা বিশ্বে এক যুগান্তকারী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এই তত্ত্বে আইনস্টাইন স্থান এবং কালের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন এক সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে। সাদা চোখে আমরা স্থান এবং কালকে আলাদা মনে করি, কিন্তু তাঁর মতে মহাবিশ্বে স্থান এবং কাল একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। স্থান ও কালের যৌথ বুননেই গঠিত হয়েছে এই মহাবিশ্বের কাঠামো যাকে বলা হয় “স্পেসটাইম“।
স্পেসটাইম বক্রতা ও মহাকর্ষ তরঙ্গের ধারণা
এই স্পেসটাইম কাঠামোর মধ্যে যদি কোনো ভরযুক্ত বস্তু থাকে, তাহলে সেখানে এক ধরনের বক্রতা সৃষ্টি হয়। বস্তু যত ভারী, তার চারপাশের স্পেসটাইম ততটাই বেশি বেঁকে যায়। এই বাঁকা পথে বস্তু যখন চলে, সেটাকেই আমরা “মহাকর্ষ” হিসেবে দেখি। কিন্তু এর থেকেও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, যখন বিশাল ভরসম্পন্ন দুটি বস্তু একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খায় বা একত্রিত হয়, তখন এই স্পেসটাইমে এক ধরনের ঢেউ বা কম্পন সৃষ্টি হয় এবং সেটা ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। এই তরঙ্গের নামই হলো, গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ বা মহাকর্ষ তরঙ্গ।
মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্তকরণ ও বিজ্ঞানের সাফল্য
১৯১৬ সালে এই মহাকর্ষ তরঙ্গের ধারণা আইনস্টাইন নিজেই দিয়েছিলেন। তবে এটি শনাক্ত করা ছিল অত্যন্ত কঠিন, কারণ এই তরঙ্গ এতটাই দুর্বল যে সাধারন যন্ত্রপাতি সেটা ধরতে পারে না। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে, বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো দুটি ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষ থেকে উৎপন্ন একটি গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ শনাক্ত করেন LIGO নামের এক অত্যন্ত সংবেদনশীল লেজার ইন্টারফেরোমিটারের মাধ্যমে। এই পর্যবেক্ষণটি প্রকাশ করা হয় ২০১৬ সালে, অর্থাৎ আইনস্টাইনের ভবিষ্যদ্বাণীর ঠিক ১০০ বছর পর। এটি ছিল জ্যোতির্পদার্থবিদ্যার ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব সাফল্য। এর মাধ্যমে আইনস্টাইনের তত্ত্ব আবারও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়।
কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্ট ও স্থির মহাবিশ্বের ধারণা
তাহলে প্রশ্ন হলো, আইনস্টাইন ভুলটা করেছিলেন কোথায়? আসলে আইনস্টাইন যখন তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতার সমীকরণ তৈরি করছিলেন, তখনো জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন, মহাবিশ্ব চিরকাল স্থির অবস্থায় রয়েছে। সেই তৎকালীন ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতেই আইনস্টাইন তাঁর সমীকরণে একটি অতিরিক্ত ধ্রুবকের আশ্রয় নিয়েছিলেন। এর নাম তিনি দিয়েছিলেন “কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্ট” এবং গ্রিক অক্ষর λ (ল্যামডা) দিয়ে সেটা প্রকাশ করেছিলেন। এই ধ্রুবকটি মহাকর্ষীয় টানের বিপরীতে কাজ করে, যাতে তাঁর সমীকরণ থেকে একটি স্থির মহাবিশ্বের ধারণা পাওয়া যায়।
এডউইন হাবল ও আইনস্টাইনের জীবনের বড় ভুল
কিন্তু ১৯২৯ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাবল দেখিয়ে দিলেন, আমাদের মহাবিশ্ব আসলে স্থির নয় বরং এটি প্রসারিত হচ্ছে। এরপর আইনস্টাইন নিজেই তাঁর আগের এই ল্যামডা যুক্ত করার সিদ্ধান্তকে “জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল” বলে মন্তব্য করেছিলেন (যদিও তিনি কথাটি নিজে লিখিতভাবে বলেননি, তাঁর বিজ্ঞানী বন্ধু জর্জ গ্যামোর মাধ্যমে জানা যায়)। আইনস্টাইন পরে এই কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্ট তাঁর সমীকরণ থেকে বাদ দেন।
মহাবিশ্বের ত্বরান্বিত প্রসারণ ও নতুন আবিষ্কার
তবে এখন আবার প্রশ্ন উঠেছে, আইনস্টাইন কি আসলেই ভুল করেছিলেন? নব্বইয়ের দশকে সুপারনোভা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করলেন, মহাবিশ্ব শুধু প্রসারিতই হচ্ছে না, বরং এর প্রসারণের গতি ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। এটা ছিল এক যুগান্তকারী আবিষ্কার, কারণ এর আগে ধারণা করা হতো একসময় মহাবিশ্বের প্রসারণ থেমে যাবে এবং সংকুচিত হতে শুরু করবে মহাবিশ্ব। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, গ্যালাক্সিগুলো যেন কোনো অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে ক্রমাগত একে অপর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
ডার্ক এনার্জি ও অদৃশ্য শক্তির প্রভাব
এই অদৃশ্য শক্তিরই নাম দেওয়া হয়েছে, ডার্ক এনার্জি। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই ডার্ক এনার্জি মহাবিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ জুড়ে রয়েছে এবং এটি মহাশূন্যের এক অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য। এই আবিষ্কারের জন্য ২০১১ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান তিনজন বিজ্ঞানী, তাঁদের নাম সোল পার্লমাটার, ব্রায়ান স্মিড এবং অ্যাডাম রিস।
আইনস্টাইনের দূরদৃষ্টি ও বর্তমান বিজ্ঞানের ভিত্তি
বর্তমানে অনেক বিজ্ঞানী মনে করছেন, ডার্ক এনার্জির ব্যাখ্যার জন্য আইনস্টাইনের কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্টই সবচেয়ে যৌক্তিক এবং কার্যকর উপায়। গবেষণায়ও দেখা গেছে, এই ধ্রুবকটি মহাবিশ্বের গঠন ও প্রসারণ বোঝার জন্য একটি অপরিহার্য উপাদান। তাই প্রশ্নটা ঘুরে ফিরে আবার আসছে, আইনস্টাইন কি আদৌ ভুল করেছিলেন? নাকি তাঁর দূরদৃষ্টিই ভবিষ্যতের বিজ্ঞানের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল?
