Homeপদার্থ বিজ্ঞানপ্যারাডক্স বিহীন টাইম ট্রাভেল: বিজ্ঞানের নতুন গাণিতিক সমাধান

প্যারাডক্স বিহীন টাইম ট্রাভেল: বিজ্ঞানের নতুন গাণিতিক সমাধান

সময় ভ্রমণের রহস্য ও প্রকৃতি

টাইম ট্রাভেল মানেই এক গভীর রহস্য। যেখানে অতীতের সঙ্গে ভবিষ্যতের টানাপোড়েন চিরকালীন, সেখানে সময় ভ্রমণ এক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে— সময়ের গতিধারা কি বদলানো সম্ভব? দু’জন বিজ্ঞানী দাবি করেছেন, সময়ের ধারা পূর্বনির্ধারিত (ডিটারমিনিস্টিক) হলেও, এটি নির্দিষ্ট জায়গায় স্বাধীনভাবে ঘটতে পারে। তাঁদের গবেষণা বলছে, বর্তমান থেকে এসে কেউ যদি অতীতকে বদলানোর চেষ্টা করে, তাহলে প্রকৃতি নিজেই এমনভাবে নিজেকে সামলে নেবে, যাতে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন না হয়।

গণিতভিত্তিক সমাধান ও নতুন গবেষণা

২০২০ সালে তাঁদের এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছিল, “ক্ল্যাসিকাল অ্যান্ড কোয়ান্টাম গ্রাভিটি” নামের এক পিয়ার-রিভিউড জার্নালে। অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জার্মেইন টোবার এবং তাঁর শিক্ষক ড: ফাবিও কস্তা, এমন এক গাণিতিক প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট এক ধরনের সময় ভ্রমণ বাস্তবে সম্ভব। মূলত, তাঁরা টাইম ট্র্যাভেলের প্যারাডক্স সমস্যার গণিতভিত্তিক সমাধান খুঁজে পেয়েছেন, যা দীর্ঘদিন ধরে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্য্যায় আলোচিত হয়ে আসছে।

আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা ও সময়ের বৃত্ত

এই গবেষণার পেছনে থাকা গণিত বেশ জটিল, কিন্তু মূল ধারণাটি বোঝা কঠিন নয়। টাইম ট্র্যাভেল তত্ত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো “ক্লোজড টাইম-লাইক কার্ভস” (CTC), এই ধারণাটি মূলত আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব থেকে এসেছে। এর মোদ্দা কথা হলো, সময় একটি বৃত্তের মতো ঘুরে ফিরে আবার আগের জায়গায় চলে আসতে পারে। টোবার ও কস্তা দেখিয়েছেন, যদি এই সময় বৃত্তের মধ্যে থাকা অন্তত দু’টি ঘটনা পারস্পরিক কার্যকারিতা বজায় রেখে থাকে, তাহলে বাকি ঘটনাগুলো স্বাধীনভাবে ঘটতে পারে। কিন্তু সেগুলো কখনোই বাস্তবতার সঙ্গে বিরোধ তৈরি করবে না।

প্যারাডক্স ও করোনা মহামারির উদাহরণ

এটি বোঝার জন্য ডঃ কস্তা একটি সহজ উদাহরণ দিয়েছেন। ধরুন, আপনি অতীতে ফিরে গিয়ে COVID-19 মহামারির প্রথম রোগী (পেশেন্ট জিরো) যেন সংক্রমিত না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে চান। যদি সফল হন, তাহলে মহামারি আদৌ ঘটবেই না। কিন্তু এই মহামারি না ঘটলে, আপনার অতীতে ফিরে যাওয়ার কারণটিই তো বাতিল হয়ে যায়! এটি টাইম ট্রাভেলের একটি ক্লাসিক প্যারাডক্স; সময় পরিবর্তন করলে তা নিজের মধ্যেই অসঙ্গতি সৃষ্টি করে।

প্রকৃতির নিজস্ব সংশোধনী ক্ষমতা

কিন্তু এই নতুন গবেষণা বলছে, প্রকৃতি নিজেই এমনভাবে ঘটনাপ্রবাহ সামলাবে, যাতে এই অসংগতিগুলো কখনোই ঘটতে না পারে। হতে পারে, আপনি আসল পেশেন্ট জিরোকে বাঁচিয়ে দিলেন, কিন্তু একই সময়ে হয়তো আপনি বা অন্য কেউ নতুনভাবে সংক্রমিত হয়ে গেলেন। অর্থাৎ, সময়ের মূলধারা কখনোই বিপর্যস্ত হবে না, বরং এটি নিজের নিয়মে সামঞ্জস্য আনবে।

বাটারফ্লাই এফেক্ট বনাম বাস্তবতা

সাধারণত আমরা শুনে থাকি, অতীতের সামান্য পরিবর্তন ভবিষ্যতে ভয়াবহ বিপর্যয় বয়ে আনতে পারে। এটাকে বলে, বাটারফ্লাই এফেক্ট। কিন্তু টোবার ও কস্তার গবেষণা দেখিয়েছে, সময় ভ্রমণের ক্ষেত্রে এটি পুরোপুরি সত্য নয়। বরং, এটা কিছুটা মিলে যায়, ডাব্লুউ ডাব্লুউ জ্যাকবসের লেখা বিখ্যাত সেই “বানরের থাবা” গল্পের সাথে। যে গল্পে ভাগ্য বদলানোর চেষ্টা করা হলেও, ঘটনাগুলো এমনভাবে টুইস্ট নেয়, যাতে শেষ পর্যন্ত একই ফলাফল আসে। টোবারের ভাষায়—”আপনি যতই চেষ্টা করুন, সময়ের লুপের মধ্যে কোনো প্যারাডক্স সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। কারণ বাস্তবতা নিজেই নিজেকে সংশোধন করে নেয়।”

নিয়তি ও ভবিষ্যৎ টাইম মেশিন

এই গবেষণা কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিলেও, এটি আবার নতুন করে কিছু প্রশ্নও সামনে এনেছে। যারা অতীতে ফিরে গিয়ে ইতিহাস বদলাতে চায়—হোক সেটা মহামারি ঠেকানো কিংবা কোনো নিষ্ঠুর স্বৈরশাসকের অত্যাচার থামানো, তাদের জন্য এটি কিছুটা হতাশার খবর! কারণ, সময় ভ্রমণ যদি সত্যিই এমন স্ব-নিয়ন্ত্রিত হয়, তাহলে যতই পরিবর্তন করার চেষ্টা হোক না কেন, মূল ঘটনাপ্রবাহ কোনো না কোনোভাবে টিকে থাকবে। অতএব, ভবিষ্যতে যদি টাইম মেশিন আবিষ্কার হয়ও, কিন্তু আমাদের নিয়তি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়!

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular