Homeবিবিধ বিজ্ঞানরীম্যানের জ্যামিতি: মহাবিশ্বের বক্রতা বোঝার গাণিতিক সূত্র

রীম্যানের জ্যামিতি: মহাবিশ্বের বক্রতা বোঝার গাণিতিক সূত্র

জ্যামিতির ধারণা ও সরলরেখার সীমাবদ্ধতা

ছোটবেলায় স্কুলের জ্যামিতি বইতে পড়েছি দুটি বিন্দুর মাঝে ক্ষুদ্রতম দৈর্ঘ্য হলো একটি সরলরেখা। কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে দুটি বিন্দুর মাঝে ক্ষুদ্রতম দৈর্ঘ্যটি একটি সরলরেখা না হয়ে বক্ররেখাও হতে পারে। দূরপাল্লার বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে এটি লক্ষ্য করা যায়। দূরপাল্লার বিমানের পাইলটরা সব সময় সরলরেখা বরাবর তাঁদের বিমান পরিচালনা করেন না। মাঝে মাঝে তাঁরা বাঁকানো পথেও চলেন। তার কারণ হলো, এই বাঁকানো পথে বিমান চলাচলে তাদের গন্তব্যের দূরত্ব অনেক কম হয়। বাঁকানো পথ ধরে কম সময়ে, কম জ্বালানি খরচ করে, দূরপাল্লার বিমান তার গন্তব্যে পৌঁছে যেতে পারে। আমেরিকা থেকে ইউরোপ অথবা এশিয়ার গন্তব্যে পৌঁছাতে পাইলটরা অনেক সময় উত্তর মেরুর উপর দিয়ে উড়ে যান।

ইউক্লিডীয় জ্যামিতি ও সমতল পৃষ্ঠের নিয়ম

তাহলে স্কুলের জ্যামিতি বইতে আমরা কি ভুল শিখেছি? ব্যাপারটি আসলে তা নয়। স্কুলের বইতে যা লেখা আছে সেটা ঠিকই আছে। তবে এটি শুধু সমতল বা ফ্ল্যাট সারফেসের জন্য প্রযোজ্য। কোন সমতল ক্ষেত্রে দুটো বিন্দুর মাঝে সর্বনিম্ন দূরত্বটি অবশ্যই একটি সরলরেখা হবে। এটি হলো ইউক্লিডীয় জ্যামিতির নিয়ম। দুই হাজার বছরেরও আগে গ্রিক গণিতজ্ঞ ইউক্লিড সমতল জ্যামিতির মৌলিক নিয়মাবলী আবিষ্কার করে গেছেন। এজন্য তাঁকে জ্যামিতির জনক বলা হয়। আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহারিক পরিমাপে ইউক্লিডীয় জ্যামিতি বেশ কাজে লাগে।

পৃথিবীর বক্রতা ও ব্যবহারিক জ্যামিতি

কিন্তু মাঝে মাঝে ইউক্লিডীয় জ্যামিতির বাইরেও মানুষকে চিন্তা ভাবনা করতে হয়। আমাদের এই গোলাকার পৃথিবীর কথাই ধরুন। পৃথিবীর পৃষ্ঠটি আমাদের কাছে সমতল মনে হলেও, আসলে পৃথিবী হলো মহাশূন্যে ভাসমান একটি বিশাল গোলক। পৃথিবীর পৃষ্ঠের আকৃতিটি বাঁকা বা কার্ভড। স্বল্প দূরত্বে এটি বোঝা না গেলেও, দীর্ঘ দূরত্বের ক্ষেত্রে পৃথিবী পৃষ্ঠের বক্রতাটিকে আমলে নিতে হয়। যেমন, দূরপাল্লার বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে পাইলটরা পৃথিবী পৃষ্ঠের বক্রতার হিসেবটি গননায় রাখেন।

রীম্যানের মেট্রিক টেনসর ও বক্র পৃষ্ঠের জ্যামিতি

বক্রপৃষ্ঠে কোন দুটি বিন্দুর মধ্যে ন্যূনতম দূরত্বকে বলা হয়, জিওডেসিক। সমতল পৃষ্ঠে জিওডেসিক একটি সরলরেখার পরিণত হয়। কিন্তু বক্রপৃষ্ঠে জিওডেসিকের পরিমাপের জন্য ইউক্লিডীয় জ্যামিতির পরিবর্তে এক বিশেষ ধরনের জ্যামিতি ব্যবহার করা হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে জার্মান গণিতজ্ঞ জর্জ বার্নাড রীম্যান বক্রপৃষ্ঠের জ্যামিতির বিশদ গাণিতিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। এই গাণিতিক ব্যাখ্যার নাম রীম্যানের মেট্রিক টেনসর। কোন স্থান কতটা বক্র সেটা এই মেট্রিক টেনসরের সাহায্যে বর্ণনা করা যায়। কোন স্থানের মেট্রিক টেনসরের মান যত বাড়বে তার বক্রতার পরিমাণও তত বেশি হবে। এখানে বলে রাখি, রীম্যানের জ্যামিতির উপর ভিত্তি করেই আইনস্টাইন তাঁর আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বে চতুর্মাত্রিক স্থান-কালের বক্রতার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। রীম্যানের মেট্রিক টেনসর দিয়ে যে কোনো উচ্চতর মাত্রার জটিল বক্রতাকে বর্ণনা করা যায়।

ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টির ভিন্নতা

এখানে আরেকটি মজার তথ্য দেই। আমরা জানি ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি দুই সমকোণ বা ১৮০ ডিগ্রি। এটাও আমরা ছোটবেলায় জ্যামিতি বইতে পড়েছি। কিন্তু এখানেও মনে রাখতে হবে, এটা শুধু সমতল‌ পৃষ্ঠের জন্য প্রযোজ্য। পৃথিবীর বাঁকানো পৃষ্ঠে যদি একটি বিশাল ত্রিভুজ কল্পনা করা হয় তাহলে এর তিন কোণের সমষ্টি দুই সমকোণের চেয়ে বেশি হতে পারে। একটি উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করছি। আমরা জানি, শুন্য ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশ রেখাটি লন্ডনের কাছে গ্রীনিচের উপর দিয়ে অতিক্রম করেছে। এই রেখাটি পৃথিবীর বিষুবরেখাকে সমকোণে ছেদ করেছে। একই ভাবে, ৯০ ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশ রেখাটি বাংলাদেশের উপর দিয়ে অতিক্রম করেছে। এই রেখাটিও বিষুবরেখাকে সমকোণে ছেদ করেছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, শুন্য ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশ এবং ৯০ ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশ এই দুই রেখা আবার উত্তর মেরুতে গিয়ে পরস্পরের সাথে সমকোণে মিলিত হয়েছে। এখন বিষুব রেখা, শুন্য ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশ রেখা এবং ৯০ ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশ রেখা এই তিনটি ভৌগলিক রেখার সমন্বয়ে পৃথিবীপৃষ্ঠে একটি বিশাল ত্রিভুজ কল্পনা করুন। এই ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি হবে তিন সমকোণ বা ২৭০ ডিগ্রী। কারণ তিনটি রেখাই পরস্পরের সাথে তিনটি সমকোণ উৎপন্ন করেছে। একই ভাবে অন্যকোন বক্রস্থানে ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি দুই সমকোণের কমও হতে পারে। এটি নির্ভর করবে ওই স্থানটির বক্রতার উপর। এই বক্রতার পরিমাপ রীম্যানের জ্যামিতির সাহায্যে নির্ণয় করা যায়।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular