মানুষের আবেগ বনাম গাছের প্রতিক্রিয়া
মানুষ গান শুনে আবেগে ভাসে, কারণ আমাদের আছে স্নায়ুতন্ত্র, মস্তিষ্ক আর হরমোনের সূক্ষ্ম সমন্বয়। কিন্তু গাছ? গাছের তো ব্রেন নেই, হৃদয় নেই, রক্ত নেই। তবুও গাছ নীরবে সাড়া দেয়। কিন্তু কীভাবে? এই প্রশ্ন নতুন নয়।
এক শতাব্দীরও বেশি আগে প্রখ্যাত বাঙালি বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু তাঁর উদ্ভাবিত ‘ক্রেসকোগ্রাফ’ যন্ত্র দিয়ে গাছের মধ্যে সূক্ষ্মতম পরিবর্তনও রেকর্ড করতে পারতেন। পরীক্ষাগারে তিনি গাছের উপর বিদ্যুৎ, তাপ, গ্যাস কিংবা রাসায়নিক উদ্দীপক প্রয়োগ করে দেখিয়েছিলেন, উদ্ভিদ সেই উদ্দীপনায় প্রতিক্রিয়া জানায়। গাছের সেই প্রতিক্রিয়া স্পষ্টভাবে ধরা পড়তো তাঁর ক্রেসকোগ্রাফে।
অনুভব ও সাড়া প্রদানের সূক্ষ্ম পার্থক্য
আলো, তাপ, স্পর্শ বা রাসায়নিক প্রভাবে উদ্ভিদের কোষে ক্ষীণ বৈদ্যুতিক তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে। এটি প্রাণীর স্নায়ুর ইমপালসের মতো নয়, কিন্তু কাজের দিক থেকে এক ধরনের সংকেত পরিবহন। কোষ থেকে কোষে খবর পৌঁছে দেওয়া।
এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য বলা জরুরি। “অনুভব” আর “সাড়া”, দুটি কিন্তু এক নয়। মানুষ যে দুঃখ-সুখ অনুভব করে, সেটা মস্তিষ্কের জটিল স্নায়বিক প্রক্রিয়ার ফল। উদ্ভিদের সে অর্থে আবেগ আছে, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। কিন্তু পরিবেশের পরিবর্তনে উদ্ভিদ সাড়া দেয়, এ কথা আজ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত।
গাছ কীভাবে সাড়া দেয়? তিনটি প্রধান উপায়
গাছ সাড়া দেয় প্রধানত তিনটি উপায়ে। প্রথমত, কোষীয় বৈদ্যুতিক সংকেত। উদ্ভিদের কোষঝিল্লিতে ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ক্লোরাইডের মতো আয়নের চলাচলে বিভবের পরিবর্তন হয়। কোনো স্পর্শ বা আঘাতে এই বিভব বদলে যায় এবং সেটা পাশের কোষে ছড়ায়। আধুনিক ইলেক্ট্রোফিজিওলজি দেখিয়েছে, উদ্ভিদে ‘অ্যাকশন পোটেনশিয়াল’ ও ‘ভেরিয়েশন পোটেনশিয়াল’ দু’ধরনের বৈদ্যুতিক সংকেতই দেখা যায়। ২০১৮- ২০২৩ সময়কালে বিভিন্ন গবেষণায়, বিশেষত ক্যালসিয়াম-ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখা গেছে, ক্ষত বা তাপের সংকেত পাতা থেকে কাণ্ড হয়ে শেকড় পর্যন্ত তরঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ, স্নায়ু না থাকলেও গাছের অভ্যন্তরীণ বৈদ্যুতিক ভাষা আছে।
দ্বিতীয়ত ফাইটোহরমোন। অক্সিন, জিবারেলিন, ইথিলিন, সাইটোকাইনিন, অ্যাবসিসিক অ্যাসিড, এরা হচ্ছে উদ্ভিদের রাসায়নিক বার্তাবাহক। আলো কোনদিকে, পানির লবণাক্ততা কেমন – এসব তথ্যের ভিত্তিতে গাছের ভেতরে হরমোনের বণ্টন বদলে যায়। গাছের ছায়াযুক্ত অংশে অক্সিন বেশি জমলে সেই পাশের কোষ লম্বা হয়, কাণ্ড তখন আলোর দিকে বাঁকে, এটাই গাছের ফোটোট্রোপিজম। আবার খরা বাড়লে অ্যাবসিসিক অ্যাসিড বেড়ে পত্ররন্ধ্র বন্ধ হয়, পানি সাশ্রয় হয়। এটা এক ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
তৃতীয়ত, জিনগত প্রোগ্রামিং ও পরিবেশ-সংবেদনশীলতা। বীজের সময়মতো অঙ্কুরোদ্গম হওয়া, শেকড় নিচের দিকে বাড়া (জিওট্রপিজম), কিংবা দিনের দৈর্ঘ্য বুঝে ফুল ফোটা (ফটোপিরিয়ডিজম) – এসব ট্রপিক বা দিকনির্ভর চলনের জটিল নকশা লেখা থাকে উদ্ভিদের জিনে। পরিবেশের সংকেত সেই জিনগুলোকে অন-অফ করে। এখানে কোনো একক ‘ব্রেন’ নেই; বরং প্রতিটি কোষই আংশিক তথ্য প্রক্রিয়াকরণে সক্ষম। অর্থাৎ এক ধরনের বিকেন্দ্রীভূত “বুদ্ধিমত্তা”।
ন্যাস্টিক চলন ও মাংসাশী উদ্ভিদ
ট্রপিক চলনের পাশাপাশি গাছের রয়েছে ন্যাস্টিক বা দিক নিরপেক্ষ চলন। এগুলো একেবারে দৃশ্যমান বিস্ময়। লজ্জাবতী গাছ, মাইমোসা পুডিকায় ছোঁয়া লাগলে পাতা মুড়ে ফেলে। স্পর্শে কোষঝিল্লির বিভব বদলে যায়, আয়নের স্রোত পাল্টায়, কোষ থেকে পানি সরে যায়। ফলে কোষের চাপ কমে পাতা ভাঁজ হয়। কয়েক মিনিট পর আবার স্বাভাবিক হয়।
এছাড়াও আছে মাংসাশী উদ্ভিদ, ভেনাস ফ্লাই ট্র্যাপ। এর সংবেদনশীল রোমে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দু’বার স্পর্শ পড়লে বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি হয়, পাতার ফাঁদ মুহূর্তে বন্ধ হয়। এখানে স্পর্শ, বৈদ্যুতিক সাড়া ও কোষীয় চাপ – সবকিছু অতি দ্রুত কাজ করে। এগুলো ন্যাস্টিক চলন, অর্থাৎ দিকনিরপেক্ষ প্রতিক্রিয়া।
গাছ কি সত্যিই গান শোনে?
আজকাল মাঝে মাঝে সংগীতের প্রশ্ন উঠে, গাছ কি গান “শোনে”? গাছ গান শুনে আনন্দ পায় এমন দাবি জনপ্রিয় হলেও প্রমাণ দুর্বল। তবে শব্দ-কম্পনের প্রভাব নিয়ে গবেষণা হয়েছে। ২০১৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার একদল গবেষক দেখান, নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সির শব্দে কিছু উদ্ভিদের জিন প্রকাশের ধরন বদলাতে পারে। ২০১৯- ২০২২ সালে ধান, আরাবিডপসিস ও টমেটো নিয়ে পরীক্ষায় দেখা গেছে, নিম্ন-ফ্রিকোয়েন্সির কম্পন গাছের শেকড়ের বৃদ্ধিতে সামান্য পরিবর্তন আনতে পারে। কিছু গ্রিনহাউস পরীক্ষায় হালকা সুর বা নির্দিষ্ট কম্পনে গাছের বৃদ্ধির হারের সূক্ষ্ম পার্থক্য দেখা গেছে, যদিও পরীক্ষার ফল সবসময় একরকম নয় এবং প্রজাতিভেদে ভিন্ন।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো গাছ সুরের মূর্ছনা বোঝে না। কিন্তু গানের সুর একধরনের কম্পন। সেই কম্পন কোষপ্রাচীর ও ঝিল্লিতে ক্ষুদ্র চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যেটা ক্যালসিয়াম সিগন্যালিং বা হরমোনীয় প্রতিক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এখানে সংগীতের আবেগ নয়, বরং কম্পন সংবেদনশীলতা- এটাই বৈজ্ঞানিকভাবে আলোচ্য বিষয়।
উদ্ভিদের স্মৃতি ও অভিযোজন
আরও একটি আকর্ষণীয় বিষয় হলো উদ্ভিদের স্মৃতি ও অভিযোজন। ২০১৪ সালে এক পরীক্ষায় লজ্জাবতী গাছকে বারবার ঝাঁকানো হলে দেখা যায়, প্রথমে পাতা ভাঁজ হলেও পরে একই উত্তেজনায় কম প্রতিক্রিয়া দেখায়। গাছ যেন শিখে নিয়েছে এটি ক্ষতিকর নয়। উদ্ভিদের স্মৃতি মানুষের স্মৃতির মত নয়; বরং জৈব-রাসায়নিক অভিযোজন ও শক্তি-সংরক্ষণের কৌশল। তবু এতে বোঝা যায়, উদ্ভিদের প্রতিক্রিয়া নিছক যান্ত্রিক নয়, বরং পরিস্থিতি-নির্ভর।
স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর দর্শন ও প্রকৃতির ঐক্য
স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু যখন উদ্ভিদের “প্রাণের” কথা বলেন, তিনি কোনো অলৌকিক শক্তির ইঙ্গিত দেননি। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন, উদ্ভিদ ও প্রাণীর মধ্যে মৌলিক ধারাবাহিকতা আছে। গাছের প্রাণ মানে হৃদস্পন্দন নয়; গাছের প্রাণ মানে বিপাকক্রিয়া, বৃদ্ধি, স্ব-সংগঠন এবং উত্তেজনায় সাড়া দেওয়া। উদ্ভিদের দেহে আয়নের স্রোত, হরমোনের বণ্টন, জিনের অন-অফ, সব মিলিয়ে এক নিরবচ্ছিন্ন সংগীত বয়ে চলে।
গাছ গান শুনে কাঁদে, এমন কোন প্রমাণ নেই। কিন্তু শব্দের কম্পন, আলো, স্পর্শ, তাপ, রাসায়নিক সংকেত, এসবের প্রতি তার সূক্ষ্ম সাড়া আছে।
গাছ তার নিজের ভাষায় কথা বলে। কখনো বৈদ্যুতিক তরঙ্গে, কখনো ক্যালসিয়ামের ঢেউয়ে অথবা হরমোনের স্রোতে। আমরা যাকে নিঃশব্দ জীবন ভাবি, সেখানে নীরবতার ভেতরেও এক জটিল যোগাযোগব্যবস্থা কাজ করে। গাছের স্নায়ু নেই তবু সংকেত আছে। হৃদয় নেই তবু ছন্দ আছে। মস্তিষ্ক নেই তবু তথ্য প্রক্রিয়াকরণ আছে। উদ্ভিদ আমাদের শেখায় জীবন একরৈখিক নয়। মানুষ জীবনের এক রূপ; উদ্ভিদ আরেক রূপ। আর সেই ভিন্নতার মাঝেই লুকিয়ে রয়েছে প্রকৃতির গভীর ঐক্য ।
