মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়: গ্রেট অ্যাট্রাক্টর
মহাবিশ্বকে আমরা খুব সাজানো গোছানো মনে করি। গ্রহ, নক্ষত্র নীহারিকা, গ্যালাক্সি সবকিছু নিজ নিজ কক্ষে ঘুরছে। যেন কোথাও কোন ছন্দপতন নেই। কিন্তু এই শান্ত ছবির আড়ালে লুকিয়ে আছে অদৃশ্য এক মহাজাগতিক টান।
গ্যালাক্সিগুলো শুধু ঘুরছেই না, সেই সাথে তারা ছুটছে এক অদৃশ্য কেন্দ্রের দিকে, যেখানে কোন এক অজানা শক্তি গ্যালাক্সিগুলোকে তার দিকে টেনে নিচ্ছে। সেই রহস্যময় গন্তব্যই হলো, গ্রেট অ্যাট্রাক্টর।
আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি স্রেফ ভেসে নেই। বিজ্ঞানীরা হিসেব করে দেখেছেন, এটি ঘণ্টায় লক্ষ লক্ষ কিলোমিটার গতিতে এক দিকেই ছুটছে। আশ্চর্য ব্যাপার হলো, শুধু আমরা নই। আমাদের প্রতিবেশী অ্যান্ড্রোমেডা, ভার্গো ক্লাস্টার, শত শত গ্যালাক্সি সেই একই দিকে ছুটে চলেছে। এত বিশাল এই প্রবাহকে বলা হয় পেকুলিয়ার মোশন, আর যার দিকে এই স্রোত ছুটে যাচ্ছে সেই অদেখা কেন্দ্রই হলো, গ্রেট অ্যাট্রাক্টর।
সমস্যা হলো এটিকে দেখা যায় না। কারণ গ্রেট অ্যাট্রাক্টর মিল্কিওয়ের এমন এক দিকের আড়ালে, যেখানে মহাজাগতিক ধুলো আর নীহারিকার কুয়াশায় আমাদের টেলিস্কোপের আলো হারিয়ে যায়। এই অঞ্চলকে বলা হয়, জোন অফ অ্যাভয়ডেন্স। মহাবিশ্ব যেন নিজের গোপন রহস্য একটি মহাজগতিক পর্দার আড়ালে লুকিয়ে রেখেছে।
তবুও বিজ্ঞানীরা থেমে নেই। তারা গ্যালাক্সির গতিবেগ, রেডশিফট, আর এক্স-রে সিগনাল বিশ্লেষণ করে বুঝলেন, এই অদৃশ্য অঞ্চলের ভেতরে আছে এক বিরাট গ্যালাক্সির রাজ্য। এর নাম, ল্যানিয়াকেয়া সুপারক্লাস্টার, যার ভর এত বেশি যে তা লাখ লাখ গ্যালাক্সিকে নিজের দিকে টানতে পারে। আমাদের মিল্কিওয়েও সেই বিশাল পরিবারের এক ছোট সদস্য।
কিন্তু চমক এখানেই শেষ নয়। গ্রেট অ্যাট্রাক্টরের ওপারেই আছে আরও বড় মহাজাগতিক দানব, শাপলি সুপারক্লাস্টার। অর্থাৎ, আমরা আসলে বহু স্তরের এক টানের ধারায় ছুটে যাচ্ছি। গ্রেট অ্যাট্রাক্টর হয়তো সেই পথের মাঝের এক বাঁক মাত্র, শেষ গন্তব্য নয়।
এই অদৃশ্য টান আমাদের মনে করিয়ে দেয় মহাবিশ্বের প্রকৃত গভীরতা আমরা এখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। চোখে না দেখলেও তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে কোটি কোটি আলোকবর্ষ জুড়ে। এটা যেন দূর মহাকাশের অজানা কোনও আহ্বান, যেটা গ্যালাক্সিদের সারিবদ্ধ করে একদিকে টেনে নিচ্ছে। হয়তো একদিন এর রহস্য পুরো উন্মোচিত হবে। কিন্তু ততদিন গ্রেট অ্যাট্রাক্টর থেকে যাবে এক নিঃশব্দ মহাজাগতিক ইশারা।
