Homeজীবনের বিজ্ঞানজিন না পরিবেশ ?

জিন না পরিবেশ ?

মানুষের জীবনের সব বৈশিষ্ট্যই কি জন্মের মুহূর্তেই ঠিক হয়ে যায়? আমরা কি জন্মের সময়ই এক অলঙ্ঘনীয় নকশার মধ্যে বাঁধা পড়ে গেছি? প্রশ্নটা যতটা সরল মনে হয়, বাস্তবতাটা ততটাই জটিল। কারণ জীবনের শুরুতেই, প্রথম কোষটির ভেতরে লেখা থাকে এক বিশাল ব্লুপ্রিন্ট – আমাদের ডিএনএ। সেই নকশার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আমাদের চোখের রং, ত্বকের রং, উচ্চতার সম্ভাবনা, এমনকি আমাদের আচরণগত প্রবণতার ইঙ্গিত। তাই প্রথম নজরে মনে হতে পারে, সবকিছুই যেন আগে থেকেই নির্ধারিত। কিন্তু একটু গভীরে তাকালেই বোঝা যায়, জীবনের গল্পটা এতটা সরলরৈখিক নয়।

এই জায়গাতেই এসে পড়ে জিন আর পরিবেশের সেই দীর্ঘদিনের বিতর্ক। রিচার্ড ডকিন্স একসময় বলেছিলেন, আমরা আসলে জিনের বাহন।জিনই নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য আমাদের শরীরকে ব্যবহার করে। এই ধারণাটি ‘সেলফিশ জিন’ নামে পরিচিত। কথাটা চমকপ্রদ, এবং আংশিক সত্যও। কারণ জিন আমাদের শরীরের ভিত্তি তৈরি করে, সম্ভাবনার সীমানা নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবে কীভাবে রূপ নেবে, সেটি নির্ধারণ করে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব – আর সেটা হলো পরিবেশ।

একই পরিবারের দুই শিশুকে দেখলেই বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কাছাকাছি জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্ম নিয়েও তারা বড় হতে হতে আলাদা মানুষ হয়ে ওঠে। কেউ হয় শান্ত, কেউ অস্থির; কেউ আত্মবিশ্বাসী, কেউ সংকোচী। এই পার্থক্য তৈরি হয় তাদের বেড়ে ওঠার ভেতরে। শিক্ষা, সম্পর্ক, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর উদাহরণ দেখা যায় আইডেন্টিক্যাল টুইনস বা অভিন্ন যমজদের মধ্যে। তাদের ডিএনএ একেবারেই এক, তবু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি হয়। কারও স্বাস্থ্যে সমস্যা দেখা দেয়, কেউ সুস্থ থাকে; কারও আচরণ বদলে যায়, কেউ আগের মতোই থাকে। এই পার্থক্যের পেছনে কাজ করে এক অদৃশ্য প্রক্রিয়া-  যেটা জিনকে সরাসরি বদলায় না, কিন্তু তার কাজ করার ধরন বদলে দেয়। যেন শরীরের ভেতরে অগণিত সুইচ বসানো আছে, পরিবেশের প্রভাবে যেগুলো কখনো চালু হয়, কখনো নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে যায়।

এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় এপিজেনেটিক্স। সহজভাবে বলতে গেলে, এটি এমন এক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যেটা ডিএনএর অক্ষর না বদলিয়েই তার ব্যবহার বদলে দেয়। ডিএনএর ওপর ছোট ছোট রাসায়নিক “ট্যাগ” বসে, যেমন মিথাইলেশন বা হিস্টোনের পরিবর্তন। যেগুলো ঠিক করে দেয় কোনো জিন কতটা সক্রিয় হবে, বা কখন সক্রিয় হবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পরিবর্তনগুলো স্থির নয়; আমাদের জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ, সবকিছুই ধীরে ধীরে এই সুইচগুলোকে প্রভাবিত করে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সীমিতভাবে দেখা গেছে, এই প্রভাবের ছাপ আংশিকভাবে পরবর্তী প্রজন্মেও পৌঁছাতে পারে।

বাস্তব জীবনে এর প্রভাব খুবই স্পষ্ট। ধরুন, দুজন শিশুর জিনগতভাবে লম্বা হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু একজন যদি পুষ্টিকর খাবার, চিকিৎসা আর যত্ন পায়, আরেকজন যদি অপুষ্টি ও অনিরাপদ পরিবেশে বড় হয়, তাহলে বড় হয়ে তাদের উচ্চতা এক হবে না। একই জিন, কিন্তু ভিন্ন ফল।

একইভাবে, একজন মানুষের শরীরে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বহনকারী জিন থাকতে পারে। কিন্তু নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, সুষম খাদ্য, ব্যায়াম এই ঝুঁকিকে অনেকটাই কমিয়ে রাখতে পারে। আবার অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন সেই সম্ভাবনাকেই বাস্তবে রূপ দিতে পারে।

মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও এই সম্পর্কটি গভীরভাবে কাজ করে। কেউ হয়তো জন্মগতভাবে উদ্বেগ বা বিষণ্নতার দিকে ঝোঁক নিয়ে জন্মায়। কিন্তু সহায়ক পরিবেশ, সুস্থ সম্পর্ক এবং মানসিক নিরাপত্তা সেই প্রবণতাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। বিপরীতে, দীর্ঘদিনের প্রতিকূলতা সেই একই প্রবণতাকে তীব্র করে তুলতে পারে।

তাই ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে, জিন আর পরিবেশ আসলে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং একসাথে কাজ করা দুই সঙ্গী। জিন ছাড়া পরিবেশ কিছু গড়ে তুলতে পারে না, আবার পরিবেশ ছাড়া জিন তার পূর্ণ সম্ভাবনা প্রকাশ করতে পারে না। আমাদের ভেতরে যে গল্পটা লেখা আছে, সেটা কেবল জিনের ভাষায় লেখা নয়; সেখানে সময়, অভিজ্ঞতা আর বাস্তবতার ছোঁয়াও মিশে থাকে। এই অদৃশ্য মিথস্ক্রিয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে মানুষের বৈচিত্র্য। আর সেই কারণেই প্রতিটি মানুষের জীবন হয়ে ওঠে একেবারে অনন্য।
Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular