রহস্যময় রোগী এবং ফ্রয়েডের নতুন ভাবনা
ভিয়েনা, অস্ট্রিয়া। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ। স্নায়ুরোগ চিকিৎসকের সামনে বসে আছে এক তরুণী। তাঁর হাত-পা অবশ হয়ে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে কথা বলার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলছে। অথচ তার শরীর পরীক্ষা করে কোনো রোগের সন্ধান পাওয়া গেল না। চিকিৎসক হতবুদ্ধি। শরীর সুস্থ, অথচ মানুষটি অসুস্থ। তাহলে সমস্যাটা কোথায়?
এই ধরনের রহস্যময় রোগীই একদিন স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ সিগমুন্ড ফ্রয়েডকে মানুষের মন সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছিল। রোগীদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তিনি বুঝতে শুরু করলেন, মানুষের অনেক কষ্টের উৎস শরীরে নয়, বরং মনের গভীরে লুকিয়ে থাকতে পারে। এমন এক জায়গায়, যেখানে আমাদের সচেতন চিন্তার আলো পৌঁছায় না।
অবচেতন মন: মানুষের মনের অদৃশ্য হিমশৈল
আজ আমরা যখন মনোবিজ্ঞান, কাউন্সেলিং বা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলি, তখন বিষয়গুলো আমাদের পরিচিত বলে মনে হয়। কিন্তু ফ্রয়েডের সময়ে মানুষের মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য জগত নিয়ে এমনভাবে কেউ ভাবেনি। ফ্রয়েডের বিশ্বাস ছিল, মানুষের মনকে আমরা যতটা জানি, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি অংশ আমাদের অজানা।
তিনি মানুষের মনকে তুলনা করেছিলেন একটি হিমশৈলের সঙ্গে। সমুদ্রের ওপরে যে ছোট্ট অংশটি দেখা যায়, সেটি হলো আমাদের সচেতন মন। আমরা যা ভাবি, বুঝি এবং অনুভব করি, তার সবই এখানে অবস্থান করে। কিন্তু হিমশৈলের বিশাল অংশ যেমন পানির নিচে লুকিয়ে থাকে, তেমনি মানুষের মনেরও একটি বিশাল অংশ আমাদের চোখের আড়ালে থাকে। এই অদৃশ্য অংশের নাম, অবচেতন মন।
ফ্রয়েডের মতে, আমাদের ভুলে যাওয়া স্মৃতি, অপূর্ণ ইচ্ছা, ভয়, অপরাধবোধ এবং নানা মানসিক দ্বন্দ্ব এখানেই জমা থাকে। আমরা হয়তো সেগুলো ভুলে যাই, কিন্তু সেগুলো আমাদের ভুলে যায় না। বরং নীরবে আমাদের আচরণ, আবেগ এবং সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে থাকে।
এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই তিনি গড়ে তোলেন মনোবিকলন বা সাইকোঅ্যানালাইসিস। এটা একদিকে মানুষের মনকে ব্যাখ্যা করার একটি তত্ত্ব, অন্যদিকে মানসিক রোগের চিকিৎসার একটি পদ্ধতি।
ইড, ইগো এবং সুপারইগো: মনের তিন শক্তি
ফ্রয়েড মনে করতেন, মানুষের মনের ভেতরে সবসময় তিনটি শক্তি কাজ করে। ইড, ইগো এবং সুপারইগো।
ইড হলো আমাদের আদিম প্রবৃত্তির কণ্ঠস্বর। এটি অপেক্ষা করতে জানে না। যা চায়, সেটা এখনই চায়। অন্যদিকে সুপারইগো হলো আমাদের বিবেক, নৈতিকতা এবং সামাজিক নিয়মের প্রতিনিধি।
আর মাঝখানে থাকে ইগো। তার কাজ হলো দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা করা। একদিকে প্রবৃত্তির দাবি, অন্যদিকে নৈতিকতার চাপ। ফ্রয়েডের মতে, মানুষের অনেক মানসিক অস্থিরতার জন্ম এই অদৃশ্য টানাপোড়েন থেকেই।
দমন, স্বপ্ন এবং ফ্রি অ্যাসোসিয়েশন
তাঁর আরেকটি বিখ্যাত ধারণা ছিল দমন বা রিপ্রেশন। আমাদের কোনো স্মৃতি এতটাই বেদনাদায়ক যে আমরা সেটিকে মনে রাখতে চাই না। তখন মন যেন সেটিকে একটি অন্ধকার ঘরে বন্দি করে রাখে। কিন্তু দরজা বন্ধ করলেই কি স্মৃতিটি হারিয়ে যায়?
ফ্রয়েড বলতেন, না। সেটি তখন অন্য পথ দিয়ে ফিরে আসে। কখনো উদ্বেগ হয়ে, কখনো দুঃস্বপ্ন হয়ে, কখনো অকারণ ভয় কিংবা অস্বাভাবিক আচরণের মাধ্যমে। এই লুকিয়ে থাকা মানসিক দ্বন্দ্ব খুঁজে বের করার জন্য তিনি রোগীদের অবাধে কথা বলতে উৎসাহিত করতেন। মনে যা আসে, তাই বলতে হবে। এই পদ্ধতির নাম ছিল, ফ্রি অ্যাসোসিয়েশন।
স্বপ্নও ছিল তাঁর কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। ফ্রয়েড স্বপ্নকে বলেছিলেন “অবচেতন মনের রাজপথ”। তাঁর ধারণা ছিল, স্বপ্নের বিচিত্র প্রতীকগুলোর মধ্যে লুকিয়ে থাকে মানুষের চাপা পড়ে থাকা ইচ্ছা ও অনুভূতির ছায়া।
ফ্রয়েডের প্রভাব এবং আধুনিক বিজ্ঞান
বিশ শতকের শুরুতে এই ধারণাগুলো এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব সৃষ্টি করেছিল। সাহিত্য, শিল্পকলা, চলচ্চিত্র, এমনকি সমাজবিজ্ঞানেও ফ্রয়েডের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের ভেতরের অদেখা জগৎ হঠাৎ করেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।
তবে আধুনিক বিজ্ঞান ফ্রয়েডের সব ধারণাকে সমর্থন করে না।
তাঁর অনেক তত্ত্ব পরীক্ষাগারে যাচাই করা কঠিন। কিছু ধারণার পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণও নেই। ফলে আজ মনোবিকলনকে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসেবে নয়, বরং মনোবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখা হয়।
তবুও ফ্রয়েডের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। কারণ তিনি হয়তো সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারেননি, কিন্তু তিনি এমন একটি দরজা খুলে দিয়েছিলেন, যার ওপারে ছিল মানুষের মনের অজানা জগৎ।
মানুষ সমুদ্রের গভীরতা মেপেছে, পরমাণুর ভেতরে উঁকি দিয়েছে, দূরবর্তী গ্যালাক্সির ছবি তুলেছে। কিন্তু নিজের মনের রহস্য উন্মোচনের কাজ এখনো শেষ হয়নি। হয়তো মহাবিশ্বের সবচেয়ে জটিল রহস্যটি কোনো দূরবর্তী নক্ষত্রে নয়, আমাদের মাথার ভেতরেই লুকিয়ে রয়েছে।
