Homeমহাকাশ বিজ্ঞানমৃত নক্ষত্রের উপহার

মৃত নক্ষত্রের উপহার

সোনা, প্লাটিনাম বা ইউরেনিয়ামের মতো মৌলগুলো এলো কোথা থেকে?

আপনার হাতে থাকা সোনার আংটি, কম্পিউটারের সার্কিটে থাকা তামা, কিংবা ঘড়ির ভেতরের কলকব্জার রূপা- এসব ধাতুর জন্ম কোথায় জানেন?
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এদের অধিকাংশের জন্ম এই পৃথিবীতে নয়। এমনকি সূর্যেও নয়। এদের জন্ম হয়েছিল মহাকাশের ভয়ংকর সব মহাজাগতিক বিস্ফোরণে।
মহাবিশ্বের শুরুতে, বিগ ব্যাংয়ের পর তৈরি হয়েছিল মূলত হাইড্রোজেন, হিলিয়াম এবং সামান্য কিছু লিথিয়াম। তখন লোহা, সোনা, ইউরেনিয়াম বা সীসার মতো ভারী মৌলগুলোর কোনো অস্তিত্বই ছিল না।
পরবর্তীতে মহাবিশ্বে প্রথম প্রজন্মের তারাগুলোর জন্ম হয়। তাদের কেন্দ্রের প্রচণ্ড তাপ ও চাপে হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়াম, হিলিয়াম থেকে কার্বন, অক্সিজেন, সিলিকন – এভাবে ধাপে ধাপে নতুন মৌল তৈরি হতে থাকে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া সাধারণত লোহা পর্যন্তই যেতে পারে। কারণ লোহার পরে আরও ভারী মৌল তৈরি করতে শক্তি উৎপন্ন হয় না; বরং শক্তি খরচ হয়।

এর উত্তর লুকিয়ে আছে নক্ষত্রের মৃত্যুর মধ্যে

যখন সূর্যের চেয়ে অনেক বেশি ভরসম্পন্ন কোনো নক্ষত্র জীবনের শেষ পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন সেটা প্রচণ্ড এক সুপারনোভা বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়ে যায়। এই বিস্ফোরণের সময় সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে বিপুল সংখ্যক নিউট্রন সৃষ্টি হয়। পরমাণুর কেন্দ্র অত্যন্ত দ্রুত এসব নিউট্রন শোষণ করে একের পর এক ভারী মৌলে রূপান্তরিত হতে থাকে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় র‌্যাপিড নিউট্রন ক্যাপচার বা r-process।
দীর্ঘদিন বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, পৃথিবীর সব ভারী মৌলের প্রধান উৎসই সুপারনোভা। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, গল্পটি আসলে আরও নাটকীয়।
২০১৭ সালে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো দুটি নিউট্রন তারার সংঘর্ষ থেকে আসা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করেন। এই সংঘর্ষে যে বিপুল পরিমাণ পদার্থ মহাকাশে ছিটকে যায়, সেখানে প্রচুর সোনা, প্লাটিনাম এবং অন্যান্য অতি ভারী মৌল তৈরি হয়। অনেক গবেষকের মতে, মহাবিশ্বের সোনার একটি বড় অংশ সম্ভবত সুপারনোভার চেয়ে নিউট্রন তারার সংঘর্ষ থেকেই এসেছে।

মৃত তারাদের উপহার

অর্থাৎ পৃথিবীর মাটিতে থাকা সোনার কণাগুলো একসময় হয়তো দুটি মৃত তারার মহাজাগতিক সংঘর্ষের আগুনে তৈরি হয়েছিল। প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর আগে এমন অসংখ্য বিস্ফোরণ ও সংঘর্ষে তৈরি ধূলিকণা এবং গ্যাস একত্রিত হয়ে সূর্য ও পৃথিবীর জন্ম দেয়। সেই কারণেই আমাদের শরীরের লোহা, দাঁতের ক্যালসিয়াম এবং আঙুলের সোনার আংটি এ সবই অতি প্রাচীন মৃত তারাদের উপহার।
জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগান তাই বলেছিলেন, “We are made of star stuff.”
আসলে সত্যিই তাই। আমরা শুধু পৃথিবীর সন্তান নই; আমরা মৃত নক্ষত্রের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছি।
Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular