Homeজীবনের বিজ্ঞানমানব স্মৃতি: শুরু থেকে শেষ

মানব স্মৃতি: শুরু থেকে শেষ

মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি হলো স্মৃতি। আমরা হাঁটতে শিখেছি, কথা বলতে শিখেছি, প্রথমবার পৃথিবীকে চিনেছি – এসবই ঘটেছে আমাদের জীবনের প্রথম তিন-চার বছরের মধ্যে। অথচ সেই সময়টার কথা আমরা প্রায় কিছুই মনে করতে পারি না। যেন নিজের জীবনের প্রথম অধ্যায়টাই হারিয়ে গেছে। কিন্তু কেন এমন হয়?

শুরুর স্মৃতিহীনতা

এর একটি গালভরা নাম আছে- “ইনফ্যান্টাইল অ্যামনেশিয়া“, সহজ করে বললে, শৈশবের স্মৃতিভ্রংশ। কিন্তু এটি কোনো রোগ নয়, বরং মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। জন্মের পর আমাদের মস্তিষ্ক তখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। বিশেষ করে হিপোক্যাম্পাস, যে অংশটা দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি তৈরি করে, সেই অংশটি তখনও বিকাশমান থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই সময়ে হিপোক্যাম্পাসে নিউরোজেনেসিস অর্থাৎ নতুন নিউরন তৈরির হার অনেক বেশি থাকে, যেটা পুরনো স্মৃতির স্থায়িত্বকে বিঘ্নিত করতে পারে। ফলে ছোটবেলায় আমরা অনেক কিছু দেখলেও, সেগুলো স্থায়ী স্মৃতিতে রূপ নিতে পারে না।

এর সঙ্গে যোগ হয় ভাষার অভাব। আমরা স্মৃতিকে সাধারণত গল্পে গেঁথে রাখি, কিন্তু তখন সেই গল্প বানানোর ভাষাটাই তৈরি হয়নি। তাছাড়া মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স, যেটা স্মৃতিকে সংগঠিত করে এবং সময়ের ধারায় সাজিয়ে রাখে, সেটাও তখন পুরোপুরি পরিণত হয় না। ফলে অভিজ্ঞতাগুলো থাকে, কিন্তু সেগুলো সুসংগঠিত “এপিসোডিক মেমরি” হিসেবে গড়ে ওঠে না।

অদৃশ্য স্মৃতি

তবুও এই সময়ের সবকিছু তথ্য একেবারে হারিয়ে যায় না। বরং তারা থেকে যায় অন্য এক স্তরে – আমাদের অবচেতনে, অনুভূতিতে এবং আচরণে। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয়, “ইমপ্লিসিট মেমরি” বা অবচেতন স্মৃতি। যেমন, কোনো শিশুর মধ্যে নিরাপত্তা বা ভয়ের অনুভূতি, মায়ের স্পর্শের প্রতি সাড়া- এসবই তৈরি হয় জীবনের একেবারে শুরুর দিকেই, যদিও সেগুলো আমরা পরে মনে করতে পারি না। কিন্তু হঠাৎ কোনো পুরনো গন্ধ, কোনো গানের সুর, কিংবা শৈশবের নানাবাড়ির মতো কোনো জায়গা আমাদের মধ্যে অদ্ভুত এক পরিচিত অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে পারে। আমরা যখন বড়দের কাছ থেকে নিজের ছোটবেলার গল্প শুনি বা পুরনো ছবি দেখি, তখন মস্তিষ্ক সেই তথ্য দিয়ে নতুন করে একটা স্মৃতির মতো অনুভূতি তৈরি করে. স্নায়ুবিজ্ঞানে এটাকে বলা হয়, “মেমরি রিকনস্ট্রাকশন”। ফলে আমাদের মনে হয় শৈশবের স্মৃতি মনে পড়ছে, কিন্তু আসলে সেটা পুনর্গঠিত। তাই ছোটবেলার স্মৃতি “ফিরিয়ে আনা” পুরোপুরি সম্ভব নয়, কেবল তার ছায়াটুকু ধরা যায়।

স্মৃতির পূর্ণতা

এরপর জীবনের এক দীর্ঘ সময় জুড়ে আমাদের স্মৃতিশক্তি সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থায় থাকে। মস্তিষ্ক তখন পরিণত। নিউরনের সংযোগ, যাকে বলা হয়, “সিন্যাপটিক কানেক্টিভিটি” স্থিতিশীল হয় এবং বারবার ব্যবহারের ফলে এই সংযোগগুলো আরও শক্তিশালী হয়ে উঠে। ভাষা, অভিজ্ঞতা আর আবেগ – সবকিছু মিলিয়ে আমরা স্মৃতিকে পরিষ্কারভাবে ধরে রাখতে পারি। এই সময়টাই আমাদের জীবনের সেই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যেটা আমরা সবচেয়ে বেশি মনে রাখি। গবেষণায় দেখা যায়, কৈশোর ও তরুণ বয়সে তৈরি হওয়া স্মৃতিগুলো বিশেষভাবে শক্তিশালী হয়, একে বলা হয় “রিমিনিসেন্স বাম্প”, যেখানে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো মস্তিষ্কে গভীরভাবে গেঁথে যায়।

স্মৃতির বিস্মরণ

কিন্তু স্মৃতির এই স্থায়িত্ব চিরকাল থাকে না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের ভেতরে ধীরে ধীরে ক্ষয় শুরু হয়। নিউরনের সংযোগ দুর্বল হতে থাকে, সিন্যাপসের সংখ্যা কমে যায়, এবং নিউরোট্রান্সমিটার – যেমন অ্যাসিটাইলকোলিনের মাত্রাও হ্রাস পেতে থাকে। তখন নতুন স্মৃতি তৈরি করা কঠিন হয়ে যায়, আর পুরনো স্মৃতিগুলোও ধীরে ধীরে ঝাপসা হতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া গিয়ে পৌঁছায় ডিমেনশিয়াতে, যার সবচেয়ে পরিচিত রূপ হচ্ছে আলঝেইমার’স ডিজিজ। এই রোগে মস্তিষ্কে বিটা- অ্যামিলয়েড প্ল্যাক এবং টাউ প্রোটিনের জট তৈরি হয়, যেটা নিউরনের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করে। এর ফলে কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাদের মধ্যে যোগাযোগ ভেঙে পড়ে, এবং স্মৃতি, চিন্তা, এমনকি নিজের পরিচয়ও একসময় হারিয়ে যেতে থাকে।

জীবনের দুই প্রান্ত

মানুষের স্মৃতির গল্পটা আসলে এক অদ্ভুত বৃত্তের মতো। জীবনের শুরুতে আমরা স্মৃতি ধরে রাখতে পারি না, শেষে এসে আবার সেই স্মৃতিই হারাতে থাকি। মাঝখানের সময়টুকুই আমাদের স্মৃতির স্বর্ণযুগ।

কিন্তু এর মধ্যেও একটি গভীর সত্য লুকিয়ে আছে। আমরা হয়তো জীবনের প্রথম দিনগুলোকে মনে রাখতে পারি না, আর শেষের দিকে অনেক কিছুই ভুলে যাই। তবুও জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের ভেতরে থেকে যায়। আমাদের স্নায়বিক সংযোগে, আমাদের আচরণে, আমাদের সত্তায় ছাপ ফেলে যায়। স্মৃতি তাই শুধু মনে রাখার বিষয় নয়। এটা আমাদের মানুষ হয়ে ওঠার নীরব ইতিহাস।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular