অতীতের সেই সোনালী দিনগুলো
সোভিয়েত আমলের ‘ভেনেসা’ (Venera) প্রোগ্রাম ছিল বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক বিশাল মাইলফলক। শুক্র গ্রহের অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে—যেখানে বাতাসের চাপ পৃথিবীকে পিষে ফেলার মতো এবং তাপমাত্রা সীসা গলিয়ে দেওয়ার মতো বেশি—সেখানেও তারা একের পর এক রোবট পাঠিয়েছিল। ১৯৭০-৮০র দশকে সোভিয়েত মহাকাশযানগুলোই প্রথম শুক্রের মাটিতে সফলভাবে অবতরণ করে এবং সেখানকার রঙিন ছবি পাঠিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু গত কয়েক দশকে রাশিয়ার মহাকাশ গবেষণা অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছিল। এখন সেই স্থবিরতা কাটিয়ে আবারও বুক ফুলিয়ে দাঁড়াতে চাইছে মস্কো।
২০৩৬ সালের ‘ভেনেসা-ডি’ মিশন
রাশিয়ার বর্তমান পরিকল্পনা হলো ‘ভেনেসা-ডি’ (Venera-D) নামের একটি মিশন। এখানে ‘ডি’ অক্ষরটি এসেছে রুশ শব্দ ‘Dolgovechnaya’ থেকে, যার অর্থ হলো ‘দীর্ঘস্থায়ী’। এই নামটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে তাদের আসল উদ্দেশ্য। এর আগের যানগুলো শুক্রের নরকসম পরিবেশে মাত্র কয়েক ঘণ্টা টিকে ছিল। এবার রাশিয়া এমন এক রোবট পাঠাতে চায় যা অন্তত কয়েক দিন বা সপ্তাহ ধরে তথ্য পাঠাতে পারবে।
এই মিশনে থাকবে:
- একটি কক্ষপথ পরিভ্রমণকারী যান (Orbiter)।
- একটি ল্যান্ডার (Lander), যা শুক্রের মাটিতে নামবে।
- হয়তো একটি ছোট বেলুন বা ড্রোন, যা শুক্রের মেঘের স্তরে ভেসে বেড়াবে।
প্রযুক্তির লড়াই: উত্তপ্ত নরকে টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ
শুক্র গ্রহের উপরিভাগের তাপমাত্রা প্রায় ৪৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই প্রচণ্ড গরমে যেকোনো সাধারণ ইলেকট্রনিক্স কয়েক মিনিটেই গলে যাওয়ার কথা। তাহলে ভেনেসা-ডি কীভাবে টিকে থাকবে?
রাশিয়ান বিজ্ঞানীরা এখানে কিছু বিশেষ কারিগরি কৌশল ব্যবহার করছেন: ১. সিলিকন কার্বাইড ইলেকট্রনিক্স: সাধারণ সিলিকন চিপের বদলে এখানে ব্যবহার করা হবে ‘সিলিকন কার্বাইড’ দিয়ে তৈরি যন্ত্রাংশ, যা উচ্চ তাপমাত্রাতেও অকেজো হয় না। ২. হিট শিল্ড ও ইনসুলেশন: ল্যান্ডারটিকে কয়েক স্তরের বিশেষ খোলস দিয়ে ঢেকে দেওয়া হবে। এর ভেতরে থাকবে এমন এক ধরনের উপাদান যা বাইরের তাপ শুষে নিয়ে ভেতরের যন্ত্রাংশকে ঠান্ডা রাখবে (যাকে বিজ্ঞানীরা ‘ফেজ চেঞ্জ মেটেরিয়াল’ বলেন)। ৩. প্রেশার ভেসেল: শুক্রের বায়ুমণ্ডলের চাপ পৃথিবীর সমুদ্রপৃষ্ঠের চাপের চেয়ে প্রায় ৯০ গুণ বেশি। তাই ল্যান্ডারটিকে তৈরি করা হচ্ছে অত্যন্ত মজবুত টাইটানিয়ামের গোলকের মতো করে, যাতে এটি চ্যাপ্টা হয়ে না যায়।
কেন শুক্র গ্রহ এত গুরুত্বপূর্ণ?
বিজ্ঞানীদের ভাষায় শুক্র হলো পৃথিবীর ‘ভয়ংকর যমজ’। আকার ও উপাদানে মিল থাকলেও পরিবেশের দিক থেকে এটি একেবারেই ভিন্ন। গ্রিনহাউস ইফেক্ট বা জলবায়ু পরিবর্তনের চরম রূপ যদি দেখতে চান, তবে শুক্র গ্রহই তার বড় উদাহরণ। কেন এই গ্রহটি এমন রুক্ষ হয়ে গেল, তা জানতে পারলে আমরা আমাদের পৃথিবীর ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও অনেক কিছু জানতে পারব।
রাশিয়ার চ্যালেঞ্জ এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট
২০৩৬ সাল অনেকটা দূরের সময় বলে মনে হতে পারে। আসলে রাশিয়ার মহাকাশ সংস্থা ‘রসকসমস’ (Roscosmos) গত কয়েক বছর ধরে নানা আর্থিক ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করছে। বিশেষ করে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কমে যাওয়ায় তারা এখন নিজেদের শক্তিতেই এই পথ পাড়ি দিতে চাইছে।
তবে ভেনাসকে নিয়ে কেবল রাশিয়াই আগ্রহী নয়। নাসা (NASA) এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থাও (ESA) আগামী দশকের মধ্যে শুক্র গ্রহে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। ফলে মহাকাশে আবারও এক নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হতে যাচ্ছে।
রাশিয়া কি পারবে তাদের সেই পুরনো ‘ভেনাস জয়ী’ তকমা আবারও ফিরে পেতে? ২০৩৬ সালের সেই মিশনটি সফল হলে তা কেবল রাশিয়ার জন্য নয়, পুরো মানবজাতির জন্য শুক্র গ্রহের রহস্য উন্মোচনের এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।
