ডার্ক ম্যাটার- আধুনিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে রহস্যময় ধাঁধাগুলোর একটি। বিজ্ঞানীরা জানেন এটি আছে, কারণ এর প্রভাব মহাবিশ্ব জুড়েই দেখা যায়। গ্যালাক্সিগুলো এত দ্রুত ঘুরছে যে শুধু দৃশ্যমান পদার্থের মহাকর্ষ দিয়ে তাদের ধরে রাখা সম্ভব নয়। গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের চারপাশে আলোর বেঁকে যাওয়াও হিসেবের চেয়ে অনেক বেশি। এমনকি মহাবিশ্বের বিশাল গ্যালাক্সিগুলোও একসাথে ধরে রাখা সম্ভব হতো না, অদৃশ্য অতিরিক্ত মহাকর্ষ না থাকলে। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই অদৃশ্য “পদার্থ” মহাবিশ্বের প্রায় ২৭ শতাংশ জুড়ে থাকলেও আমরা এখনো জানি না এটি আসলে কী বস্তু।
জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক ও পদার্থবিজ্ঞানী মিচিও কাকু এই রহস্যের একটি চমকপ্রদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, স্ট্রিং থিওরি এবং তার বিস্তৃত সংস্করণ এম-থিওরি অনুযায়ী, আমাদের মহাবিশ্ব হয়তো একটি ত্রিমাত্রিক “মেমব্রেন” বা ব্রেন, যেটা আরও উচ্চমাত্রিক এক মহাজাগতিক পরিসরের মধ্যে ভাসছে। আমাদের চেনা মহাবিশ্বের সমান্তরালে হয়তো আরও অসংখ্য মহাবিশ্ব রয়েছে। খুব কাছেই, অথচ এমন এক মাত্রিক দূরত্বে, যেটা আমরা অনুভবই করতে পারি না। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রকৃতির অন্য সব বলের মতো মহাকর্ষ হয়তো কেবল আমাদের মহাবিশ্বে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মাত্রার সীমানা পেরিয়ে অন্য মহাবিশ্ব থেকেও “লিক” করতে পারে।
যদি সত্যিই সেটা হয়, তাহলে আমরা যাকে ডার্ক ম্যাটার ভাবছি, সেটি হয়তো কোনো পদার্থই নয়। বরং সেটি হতে পারে অন্য এক সমান্তরাল মহাবিশ্বের মহাকর্ষীয় প্রভাব, যেটা অদৃশ্যভাবে আমাদের জগতে এসে পড়ছে। আমরা তার টান অনুভব করছি, কিন্তু উৎসটিকে কখনো দেখতে বা ছুঁতে পারছি না। যেন পাশের ঘরে কেউ হাঁটছে, দরজার ওপাশে তার অস্তিত্ব টের পাচ্ছি, কিন্তু তাকে দেখার কোন উপায় নেই।
কাকুর কথা শুনতে যেন বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর মতো লাগে। কিন্তু সমস্যাটা হলো, ডার্ক ম্যাটারের অন্য ব্যাখ্যাগুলোও এখনো প্রমাণিত হয়নি। কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীরা সম্ভাব্য ডার্ক ম্যাটার কণার খোঁজ করছেন। বিশাল বিশাল ডিটেক্টর বানানো হয়েছে, গভীর ভূগর্ভে পরীক্ষা চলছে, মহাকাশেও অনুসন্ধান করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো নিশ্চিত কণা ধরা পড়েনি।
তাই অদ্ভুত ব্যাখ্যার দরজাও এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। অবশ্যই এটাকে প্রতিষ্ঠিত সত্য বলা যাবে না। স্ট্রিং থিওরি অথবা এম-থিওরি নিজেই এখনো পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণিত হয়নি এবং পদার্থবিজ্ঞানের জগতে এটি নিয়ে তীব্র বিতর্ক রয়েছে।
অতএব, মিচিও কাকুর ধারণাটি মূলধারার সিদ্ধান্ত নয়, বরং বিজ্ঞানের সবচেয়ে কল্পনাপ্রবণ সীমান্তের একটি সম্ভাবনা মাত্র।
মহাবিশ্বের ইতিহাস অবশ্য বারবার আমাদের মনে করিয়ে দেয়- প্রকৃতি সবসময় সহজ অথবা প্রত্যাশিত পথ অনুসরণ করে না। অনেক সময় সত্য এতটাই বিস্ময়কর হয় যে, সেটা মানুষের কল্পনাকেও হার মানিয়ে দেয়।
