Homeবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমিথেন যুদ্ধ: জলবায়ু পরিবর্তন রোধে নতুন হাতিয়ার ছত্রাক

মিথেন যুদ্ধ: জলবায়ু পরিবর্তন রোধে নতুন হাতিয়ার ছত্রাক

জলবায়ু পরিবর্তনমিথেন গ্যাসের প্রভাব

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কেবল ভবিষ্যতের কোনো ভীতিকর পূর্বাভাস নয়, বরং আমাদের বর্তমান বাস্তবতা। এর পেছনে দায়ী গ্রীনহাউস গ্যাসগুলোর মধ্যে মিথেনের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মিথেনের উষ্ণতা ধরে রাখার ক্ষমতা কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় অন্তত ৮০ গুণ বেশি। বিশেষ করে গবাদিপশুর হজম প্রক্রিয়া থেকে বিপুল পরিমাণে মিথেন নির্গত হয়, যেটা গবাদিপশু পালনকে জলবায়ু সংকটের অন্যতম বড় উৎসে পরিণত করেছে। এই খাতে মিথেন নির্গমন কমাতে বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এজন্য বিজ্ঞানীরা, Asparagopsis taxiformis নামের এক ধরনের সামুদ্রিক আগাছার গুঁড়ো পশুখাদ্যে মিশিয়ে দেবার কথা বলেছেন। এতে গবাদিপশুর মিথেন নির্গমন কিছুটা কমে যায়। ‌কিন্তু  এ ব্যাপারে আশানুরূপ তেমন কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি।

ড. আবেদ চৌধুরীর যুগান্তকারী আবিষ্কার

এই প্রেক্ষাপটে এক যুগান্তকারী আবিষ্কারের খবর এসেছে অস্ট্রেলিয়া থেকে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান Loam Bio এর বিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী এবং তাঁর গবেষক দল আবিষ্কার করেছেন এক ধরনের বিশেষ প্রাকৃতিক ছত্রাক, যার নাম Curvularia sp. strain 4388, ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, এই বিশেষ ছত্রাকটি সী উইডের চেয়েও অনেক বেশি মাত্রায় কার্যকরী। এর মধ্যে রয়েছে ভ্যানাডিয়াম হ্যালো-পেরোক্সাইড নামের এক রাসায়নিক উপাদান। যেটা গবাদিপশুর হজম প্রক্রিয়ায় মিথেন উৎপাদন প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। এই বিষয়ে Biotechnology Reports জার্নালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে (মার্চ, ২০২৫)।  চমকপ্রদ বিষয় হলো, এই ছত্রাক কোনো জেনেটিক মডিফিকেশন ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে কাজ করে, এবং এটি প্রাণীর স্বাভাবিক স্বাস্থ্য বা হজমের উপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না।

টেকসই সমাধান ও নতুন উদ্যোগ

এই অভিনব আবিষ্কারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে একটি নতুন উদ্যোগ, ROAM Agricultural। এই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য হলো এই প্রযুক্তিকে সহজ, টেকসই এবং কৃষকদের জন্য বাস্তবসম্মত সমাধান হিসেবে তৈরি করা। ছোট আকারের মাইক্রোব্রুয়ারির মতো ইউনিটে এই ছত্রাক উৎপাদন করা সম্ভব হবে, যা অল্প খরচে খামারে খামারে ছড়িয়ে দেওয়া যাবে।

বাস্তব খামারে প্রযুক্তির কার্যকারিতা

পরীক্ষামূলক পর্যায়ে এই প্রযুক্তির ফলাফল অভূতপূর্ব; বাস্তব খামার ব্যবস্থাপনাতেও এর কার্যকারিতা প্রমাণিত হলে, গবাদিপশু পালন খাতের পরিবেশগত প্রভাব ব্যাপকভাবে হ্রাস করা সম্ভব হবে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাধ্যমে পৃথিবী রক্ষা

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবেলায় যেখানে কঠিন সব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি আমরা, সেখানে এই ধরনের গবেষণা সত্যিই নতুন আশার আলো দেখায়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রযুক্তি আর বিজ্ঞানের সহায়তায় মানুষের চেষ্টাই পারে পৃথিবীকে রক্ষা করতে. পরিবেশ সংরক্ষণ আর খাদ্য উৎপাদনের মধ্যে ভারসাম্য আনার জন্য এ ধরনের টেকসই সমাধান ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ও বিজ্ঞানীদের অবদান

ড. আবেদ চৌধুরী ও তাঁর গবেষক দলের এই অর্জন এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত খুলে দিল। আশা করা যায়, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এই ছত্রাকভিত্তিক ফিড অ্যাডিটিভ বিশ্বব্যাপী খামারগুলিতে ছড়িয়ে পড়বে। আর এ ধরনের আবিষ্কারই দেখিয়ে দেয়, বিজ্ঞানের হাত ধরে আমরা এখনো সুস্থ ও সুন্দর পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখার সাহস রাখতে পারি।

সাক্ষাৎকার ও বিস্তারিত তথ্য

এই বিষয়ে সম্প্রতি আমি কথা বলেছি ডঃ আবেদ চৌধুরীর সাথে। তাঁর সঙ্গে  এই সাক্ষাৎকারটি গত ৫ মে ২০২৫ তারিখে ক্যানবেরার বাংলা রেডিও থেকে প্রচারিত হয়েছে। এই রেডিও  অনুষ্ঠানটিতে এ ব্যাপারে আরো অনেক তথ্য আপনারা পাবেন। শোনার আমন্ত্রণ রইলো। অনুষ্ঠানের ইউটিউব লিঙ্ক নিচে দেয়া হলো: https://youtu.be/91qNYlrlmws?si=swik57Ox8za4yJXG

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular